মুম্বাই থেকে বাংলাদেশি বহিষ্কার দুই বছরে ছয় গুণের বেশি

২০২৬ সালের আট মাসেই ১,০৬৬ জনকে ফেরত পাঠানোর দাবি মুম্বাই পুলিশের; ২০২৪ সালে সংখ্যা ছিল ১৬৪

ভারতের মুম্বাই থেকে বাংলাদেশি নাগরিক বহিষ্কারের সংখ্যা দুই বছরের ব্যবধানে ছয় গুণেরও বেশি বেড়েছে। মুম্বাই পুলিশের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ১ হাজার ৬৬ জন বাংলাদেশিকে ‘অবৈধভাবে অবস্থানকারী’ হিসেবে দেশটি থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

২০২৪ সালে একই ধরনের বহিষ্কারের সংখ্যা ছিল ১৬৪। আর ২০২৫ সালে বহিষ্কার করা হয়েছিল ১ হাজার ৬১ জনকে।

অর্থাৎ ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসেই বহিষ্কারের সংখ্যা আগের পুরো বছরের মোট সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। ভারতের প্রভাবশালী পত্রিকা দি হিন্দু’র এক প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

তিন বছরে ২,২৯১ জন বহিষ্কার

মুম্বাই পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত মোট ২ হাজার ২৯১ বাংলাদেশি নাগরিককে বহিষ্কার করা হয়েছে।

এই সময়ে ‘অবৈধভাবে অবস্থানের’ অভিযোগে ৬৫৮টি মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে এবং ৯৯৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, অভিযানে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকে বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা বা বসবাসের অনুমতিপত্র দেখাতে পারেননি।

ভুয়া ভারতীয় পরিচয়পত্র নিয়েও উদ্বেগ

মহারাষ্ট্র কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক অভিযানে শুধু বৈধ কাগজপত্র ছাড়া অবস্থানের বিষয় নয়, ভুয়া ভারতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহারের অভিযোগও গুরুত্ব পাচ্ছে।

বিভিন্ন মামলায় জাল বা ভুয়া আধার কার্ড, প্যান কার্ড এবং ভোটার পরিচয়পত্র ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।

এ নিয়ে চলতি বছরের জুলাইয়ে বোম্বে হাইকোর্টও উদ্বেগ প্রকাশ করে। আদালত বিদেশি নাগরিকদের পরিচয় শনাক্ত, যাচাই এবং প্রয়োজন হলে বহিষ্কারের ক্ষেত্রে মহারাষ্ট্র সরকার ও ভারতের কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোর মধ্যে আরও সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়।

আদালতে এসেছে বাংলাদেশি নাগরিকদের মামলাও

বোম্বে হাইকোর্টে চলতি বছর একাধিক মামলায় বাংলাদেশি নাগরিকদের আটক ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার বিষয় উঠে এসেছে।

জুনে দেওয়া একটি রায়ে আদালত এমন এক বাংলাদেশি নারীর মামলার নথি পর্যালোচনা করে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মুম্বাইয়ে বিশেষ অভিযানে তাকে আটক করা হয়েছিল।

পরবর্তীতে বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন তার জন্য ট্রাভেল পারমিট ইস্যু করে এবং সেখানে তার জাতীয়তা বাংলাদেশি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

আদালত ওই মামলায় কর্তৃপক্ষের অনুসৃত প্রক্রিয়ায় অবৈধতা খুঁজে পায়নি এবং আবেদনটি খারিজ করে দেয়।

জোরদার হয়েছে বিশেষ অভিযান

২০২৬ সালে মুম্বাই ও আশপাশে নথিহীন বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান জোরদার করা হয়েছে।

এপ্রিলের মধ্যেই মুম্বাই পুলিশ প্রায় ৪৫০ বাংলাদেশি নাগরিককে আটক করেছিল বলে স্থানীয় গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। তাদের মধ্যে দুই শতাধিককে সে সময়ই বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছিল।

জুলাইয়ে আরেক বিশেষ অভিযানে ৩৭ বাংলাদেশি নাগরিককে আটক করার কথা জানায় মুম্বাই ক্রাইম ব্রাঞ্চ। পুলিশ বলেছিল, আটক ব্যক্তিদের পরিচয়, জাতীয়তা, ভারতে প্রবেশের পথ এবং ব্যবহৃত কাগজপত্র যাচাইয়ের পর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।

ডিটেনশন সেন্টারেও চাপ

অভিযান বাড়ার প্রভাব পড়েছে আটক বিদেশিদের জন্য তৈরি ডিটেনশন সেন্টারেও।

মহারাষ্ট্রের প্রথম ডিটেনশন সেন্টারটি চলতি বছরের মার্চে মুম্বাইয়ের ভোইওয়াড়া এলাকায় চালু হয়। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেখানে জায়গার সংকট দেখা দেয়।

স্থানীয় প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশি নাগরিকসহ বিভিন্ন বিদেশি নাগরিককে বহিষ্কারের আগে সাময়িকভাবে রাখার জন্য কেন্দ্রটি ব্যবহার করা হচ্ছে।

প্রত্যাবাসনের প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়ায় সময় লাগায় সেখানে আটক ব্যক্তির সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যায়।

জন্মসনদ নিয়েও অভিযান

মহারাষ্ট্রে কথিত ভুয়া নথি ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে গত বছর থেকেই ব্যাপক অভিযান চলছে।

২০২৫ সালে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, অবৈধভাবে অবস্থানকারী বাংলাদেশিদের নামে ইস্যু করা ৪২ হাজারের বেশি জন্মসনদ বাতিল করা হয়েছে।

এই ধরনের সনদ কীভাবে ইস্যু হয়েছিল তা তদন্তে বিশেষ টাস্কফোর্স ও তদন্ত দলও গঠন করা হয়।

নাগরিকত্ব যাচাইয়ে সতর্কতা জরুরি

ভারতে বাংলাদেশি নাগরিকদের ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে শনাক্ত ও বহিষ্কারের অভিযান রাজনৈতিক ও মানবাধিকার—দুই দিক থেকেই সংবেদনশীল বিষয়।

কোনো ব্যক্তিকে শুধু ভাষা, পোশাক, ধর্ম, নাম বা আঞ্চলিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। নাগরিকত্ব ও বৈধ অবস্থানের বিষয়টি যথাযথ নথি, তদন্ত এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

ভারতের আদালতগুলোর সাম্প্রতিক মামলাগুলোতেও পরিচয় যাচাই, যথাযথ নথিপত্র এবং প্রত্যাবাসনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার গুরুত্ব উঠে এসেছে।

তবে মুম্বাই পুলিশের সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, ২০২৪ সালের তুলনায় নথিহীন বাংলাদেশি নাগরিক শনাক্ত ও বহিষ্কারের অভিযান এখন অনেক বেশি তীব্র।

তথ্য সূত্র:দি হিন্দু (Original article)

 

spot_img
spot_img

অধিক পঠিত

Related Articles