কলকাতায় চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাংলাদেশিদের জন্য নতুন সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে থাকার জায়গা। গত মাসে একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর অগ্নিনিরাপত্তা ও লাইসেন্সের নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগে শহরের বহু সাশ্রয়ী হোটেল ও গেস্টহাউস বন্ধ করে দেওয়ায় রোগী ও তাদের স্বজনেরা আবাসন পেতে হিমশিম খাচ্ছেন।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কোনো কোনো বাংলাদেশি রোগী ও তাদের সঙ্গে যাওয়া স্বজনকে লাগেজ নিয়ে ফুটপাতেও রাত কাটাতে হয়েছে বলে জানা গেছে।
এই পরিস্থিতিতে কলকাতায় বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন চিকিৎসা বা অন্য কাজে ভারতে যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশিদের ভ্রমণের আগেই হোটেল বুকিং নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছে।
বিশেষ করে বুকিং করা হোটেল বর্তমানে চালু আছে কি না, সেখানে কক্ষ পাওয়া যাচ্ছে কি না এবং হোটেলটির অবস্থান কোথায়—এসব বিষয় যাচাই করে তবেই কলকাতা যেতে বলা হয়েছে।
নিউ মার্কেটের সাশ্রয়ী হোটেলগুলোতে বড় ধাক্কা
দীর্ঘদিন ধরে কলকাতার নিউ মার্কেট, মার্কুইস স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট এবং আশপাশের এলাকা বাংলাদেশি রোগী, পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের কাছে জনপ্রিয়।
তুলনামূলক কম খরচে থাকার ব্যবস্থা, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সহজে যাতায়াত, কাছাকাছি ওষুধের দোকান, খাবারের ব্যবস্থা এবং পরিবহন সুবিধার কারণে চিকিৎসার জন্য যাওয়া বাংলাদেশিদের বড় অংশ এসব এলাকায় অবস্থান করেন।
কিন্তু সাম্প্রতিক অভিযানে বহু হোটেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি বদলে গেছে।
অনেক বাংলাদেশি পরিবার এখন হাসপাতাল থেকে দূরের এলাকায় হোটেল খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে। আবার যেসব হোটেলে কক্ষ পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে আগের তুলনায় বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। কেউ কেউ থাকার জায়গাই পাচ্ছেন না।
ক্যানসার রোগীদের দুর্ভোগ বেশি
আবাসন সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা নিতে কলকাতায় যাওয়া রোগীদের ওপর।
বিশেষ করে ক্যানসার রোগীদের অনেককে কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি এবং নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শের জন্য কয়েক সপ্তাহ কিংবা আরও বেশি সময় কলকাতায় থাকতে হয়।
এসব রোগীর জন্য হাসপাতালের কাছাকাছি কম খরচের আবাসন শুধু সুবিধার বিষয় নয়, চিকিৎসার অংশ হিসেবেই গুরুত্বপূর্ণ।
সীমিত বাজেট নিয়ে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে দূরের হোটেলে বেশি ভাড়া দিয়ে থাকা এবং প্রতিদিন হাসপাতালে যাতায়াতের অতিরিক্ত খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
যে অগ্নিকাণ্ডের পর শুরু অভিযান
এই সংকটের সূত্রপাত ১৯ আগস্ট কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের শিখা ইন হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর।
আগুনে নয়জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের সাতজন ছিলেন বাংলাদেশি, যাদের মধ্যে একটি শিশুও ছিল। বাকি দুজন ছিলেন ভারতীয় নাগরিক।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিষাক্ত ধোঁয়ার মধ্যে আটকা পড়ে শ্বাসরোধে অধিকাংশ মানুষের মৃত্যু হয়।
এই ঘটনার পর কলকাতার হোটেল ও গেস্টহাউসগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন ওঠে।
শতাধিক হোটেল বন্ধ বা বন্ধের মুখে
অগ্নিকাণ্ডের পর কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন, দমকল বিভাগ ও পুলিশ যৌথভাবে হোটেল এবং গেস্টহাউসে ব্যাপক পরিদর্শন শুরু করে।
পরিদর্শনে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমন পথ, ভবনের অনুমোদন, ট্রেড লাইসেন্স এবং অন্যান্য আইনি শর্ত পূরণ করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
ত্রুটি পাওয়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ ও বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়।
২২ আগস্টের মধ্যেই নিউ মার্কেট এলাকায় অন্তত ৫২টি হোটেল বন্ধ হয়ে যায়। পরে অভিযান বিস্তৃত হলে কলকাতাজুড়ে শতাধিক হোটেল ও গেস্টহাউস বন্ধ হয়ে যায় অথবা বন্ধের মুখে পড়ে।
ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই শহরে কম খরচের আবাসনের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
হাসপাতালপাড়াতেও চাপ
সংকট শুধু নিউ মার্কেট বা মধ্য কলকাতাতেই সীমাবদ্ধ নেই।
দক্ষিণ কলকাতার বিভিন্ন বড় হাসপাতালের আশপাশ এবং মুকুন্দপুরেও আবাসন প্রতিষ্ঠানের অগ্নিনিরাপত্তা ও লাইসেন্স পরীক্ষা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে নিউ মার্কেট এলাকার হোটেল বন্ধ হওয়ায় অনেক রোগী হাসপাতালসংলগ্ন দক্ষিণ কলকাতা ও ইএম বাইপাস এলাকার হোটেল-গেস্টহাউসে চলে যাচ্ছেন। এতে সেখানেও কক্ষের চাহিদা বেড়েছে।
কিছু বেসরকারি হাসপাতাল বাংলাদেশ থেকে আসা রোগীদের সফরের সময়সূচি আগাম জানাতে বলছে, যাতে প্রয়োজন হলে তাদের আবাসন খুঁজে পেতে সহায়তা করা যায়।
শুধু বাংলাদেশিরাই নন
হোটেল বন্ধের কারণে তৈরি আবাসন সংকটে শুধু বাংলাদেশি রোগীরাই ভুগছেন না।
পশ্চিমবঙ্গের দূরবর্তী জেলা থেকে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসা নিম্ন আয়ের ভারতীয় রোগী ও তাদের স্বজনেরাও একই ধরনের সমস্যায় পড়ছেন।
কম খরচের হোটেল ও লজের ওপর এসব পরিবারের নির্ভরতা বেশি হওয়ায় একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব তাদের ওপরও পড়েছে।
নিরাপত্তা জরুরি, কিন্তু বিকল্প কোথায়
শিখা ইন অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির পর ঝুঁকিপূর্ণ হোটেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন নেই। বিশেষ করে জরুরি বহির্গমন পথ ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকা হোটেল অতিথিদের জন্য বড় ঝুঁকি।
কিন্তু একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক সাশ্রয়ী হোটেল বন্ধ করে দেওয়ার পর রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা না থাকায় মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে।
কলকাতার কয়েকটি হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান আটকে পড়া রোগীদের থাকার জায়গা খুঁজে দিতে উদ্যোগ নিয়েছে। তবে চাহিদার তুলনায় সেই ব্যবস্থা এখনো সীমিত।
কলকাতা যাওয়ার আগে যা নিশ্চিত করতে বলেছে উপ-হাইকমিশন
পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনের পরামর্শ হলো, শুধু অনলাইনে হোটেলের নাম দেখে বা পুরোনো পরিচিত কোনো হোটেলের ওপর নির্ভর করে কলকাতার উদ্দেশে রওনা না হওয়া।
যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট হোটেলের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেটি বর্তমানে চালু আছে কি না, বুকিং নিশ্চিত হয়েছে কি না, প্রয়োজনীয় দিনগুলোতে কক্ষ পাওয়া যাবে কি না এবং হোটেলটির সঠিক অবস্থান কোথায়—এসব নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে চিকিৎসার জন্য যাদের দীর্ঘদিন কলকাতায় থাকতে হবে, তাদের ক্ষেত্রে হাসপাতালের কাছাকাছি আবাসনের ব্যবস্থা আগেই নিশ্চিত করা এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কলকাতায় চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাংলাদেশিদের জন্য নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করার প্রশ্নটি তাই এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ—একদিকে অগ্নিনিরাপত্তার নিয়ম কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, অন্যদিকে অসুস্থ ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী বিকল্প থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।



