কাশ্মীরে চার মাসে ৯০ জন নিহত, নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে পরিবারের হাহাকার

নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও বেআইনি আটকের অভিযোগ; প্রতিটি মৃত্যুর স্বাধীন তদন্ত দাবি মানবাধিকার সংগঠনের

পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে স্থানীয় নির্বাচন ও রাজনৈতিক আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় চার মাসে অন্তত ৯০ জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের অনেকের মৃত্যুর পরিস্থিতি এখনো স্পষ্ট নয়। নিখোঁজ হওয়ার পর স্বজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া, মরদেহ হস্তান্তরে বাধা এবং বেআইনি আটকের অভিযোগে উদ্বেগ বাড়ছে অঞ্চলটিতে। নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলে প্রতিটি ঘটনার স্বাধীন তদন্ত দাবি করেছে একটি মানবাধিকার সংগঠন।

যুক্তরাজ্য-নিবন্ধিত জম্মু কাশ্মীর হিউম্যান রাইটস অবজারভেটরি (জেকেএইচআরও) প্রকাশিত ৪৭ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে গত ৫ জুন থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত নিহত ৯০ জনের পরিচয় ও মৃত্যুর পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটির ভিত্তিতে বিস্তারিত সংবাদ প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইনডিপেনডেন্ট।

মানবাধিকার সংগঠনটি জানিয়েছে, সব মৃত্যুর কারণ কিংবা দায়ী ব্যক্তি একই—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। তবে প্রতিটি ঘটনার স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

রক্ত দিতে গিয়ে নিখোঁজ, পরে মৃত্যুর খবর

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ২৬ বছর বয়সী ফাহাদ বারকাতের ঘটনা। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৭ জুন রাতে রাওয়ালাকোটের একটি সামরিক হাসপাতালে রক্ত দিতে গিয়েছিলেন তিনি। রাত ১১টা ৩১ মিনিটে বোনকে শেষ বার্তা পাঠানোর পর আর বাড়ি ফেরেননি।

ফাহাদের বোনের দাবি, হাসপাতালের ফটকে প্রবেশের সময় রাত ১টার কিছু আগে তাঁর গলায় গুলি লাগে। তবে কে গুলি চালিয়েছিল, তা নিশ্চিত করতে পারেনি মানবাধিকার সংগঠনটি।

পরিবারের সদস্যরা দুই মাসের বেশি সময় ধরে মনে করেছিলেন, ফাহাদ পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। পরে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডনে প্রকাশিত নিহত বেসামরিক ব্যক্তিদের তালিকায় তাঁর নাম দেখতে পান তাঁরা।

জেকেএইচআরওর অভিযোগ, মরদেহ হস্তান্তরের আগে ফাহাদকে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে উল্লেখ করে একটি বিবৃতিতে পরিবারকে স্বাক্ষর করতে বলা হয়েছিল।

সংগঠনটি ঘটনার তদন্তে হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ, রক্তদাতাদের নথি, ময়নাতদন্ত ও দাফনের তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছে।

নির্বাচন বয়কট থেকে সংঘাত

পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন পরে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও সাংবিধানিক কাঠামো পরিবর্তনের দাবিতে বিস্তৃত হয়।

আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা যৌথ আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি) ২৭ জুলাই থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত কয়েক ধাপে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচন বয়কটের আহ্বান জানায়।

সংগঠনটি আঞ্চলিক আইনসভার ৪৫ আসনের মধ্যে শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসন বাতিলের দাবি তোলে। পাকিস্তান সরকার জানায়, আসনগুলো সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত এবং কাশ্মীর নিয়ে দেশটির দীর্ঘদিনের অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত।

পরবর্তী সময়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে জেএএসিকে নিষিদ্ধ করা হয় এবং কয়েকজন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ১৯ জুন পর্যন্ত সহিংসতায় বেসামরিক নাগরিক ও পুলিশসহ অন্তত ২৪ জন নিহত এবং পাঁচ শতাধিক মানুষ আটক হয়েছিলেন। পরে জেএএসি শতাধিক মানুষের মৃত্যুর দাবি করে। তবে জেকেএইচআরও তাদের প্রতিবেদনে ৯০ জনের পরিচয় ও ঘটনার বিবরণ নথিভুক্ত করেছে।

কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সশস্ত্র ব্যক্তিরাও সহিংসতায় অংশ নিয়েছিলেন। আন্দোলনকারী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব অভিযোগ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে।

নিখোঁজের অভিযোগ, মরদেহ নিয়েও বিরোধ

জেকেএইচআরওর প্রতিবেদনে শওকত নওয়াজ মীরের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও রয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, ৩০ জুন ধিরকোট থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলেও কোথায় রাখা হয়েছে, তা জানানো হয়নি।

তাঁর বোন ইয়ামিন মীর জুলাইয়ে আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর হাইকোর্টে আবেদন করে ভাইয়ের অবস্থান জানানো এবং তাঁকে আদালতে হাজির করার দাবি জানান।

অন্যদিকে, ৫ সেপ্টেম্বর চিত্রা টোপি গ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর পাল্টা গুলিতে জাবির মুমতাজ নামে একজন নিহত হন বলে পুলিশ জানায়। পরিবারের দাবি, মৃত্যুর আগে প্রায় দুই সপ্তাহ তিনি নিখোঁজ ছিলেন।

মানবাধিকার সংগঠনটির অভিযোগ, জাবিরকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে উল্লেখ করে বিবৃতিতে স্বাক্ষর করতে পরিবার অস্বীকৃতি জানালে কর্তৃপক্ষ তাঁর দাফন সম্পন্ন করে।

এ ছাড়া রাওয়ালাকোটে নিজের মহিষের খামারে অবস্থানকালে সংঘর্ষের গুলিতে ২৯ বছর বয়সী নাকাশ জারদাদ নিহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্বাধীন তদন্তের দাবি

সহিংসতার মধ্যে ইন্টারনেট বন্ধ ও বিদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রবেশে বিধিনিষেধ থাকায় অঞ্চলটির পরিস্থিতি সম্পর্কে স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে।

জেকেএইচআরওর পরিচালক আজর আহমেদ বলেন, আটক, চিকিৎসা, মর্গ ও দাফনের নথি প্রকাশ করা হলে অনেক মৃত্যুর প্রকৃত পরিস্থিতি জানা সম্ভব হবে। তথ্য গোপন রাখায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দুর্ভোগ বাড়ছে।

সংগঠনটি জুন থেকে সংঘটিত সম্ভাব্য বেআইনি মৃত্যু ও গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনাগুলোর দ্রুত, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের সরকার, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে দ্য ইনডিপেনডেন্ট। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

spot_img
spot_img

অধিক পঠিত

Related Articles