রপ্তানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ৬৬ ঘাটতি, ঝুঁকিতে আন্তর্জাতিক বাজারের নতুন শর্ত পূরণ

৩৯টি ঘাটতি গুরুতর বা কাঠামোগত; পোশাক, চামড়া, কৃষি-খাদ্য ও মৎস্য খাত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে

বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাতগুলোর সরবরাহ ব্যবস্থায় পণ্যের উৎস ও গতিপথ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ৬৬টি পরিচালনাগত ও নীতিগত ঘাটতি চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৯টি ঘাটতিকে গুরুতর বা কাঠামোগত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব ঘাটতি দ্রুত দূর করা না গেলে তৈরি পোশাক, চামড়া ও পাদুকা, কৃষি-খাদ্য এবং মৎস্যপণ্যের বড় রপ্তানি বাজারগুলোর নতুন শর্ত পূরণে সমস্যা তৈরি হতে পারে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপিত একটি সমন্বিত পর্যালোচনায় এসব ঘাটতি উঠে এসেছে। জার্মান উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা জিআইজেডের সহায়তায় বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড) পর্যালোচনাটি করেছে।

এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মূল সমস্যা সরবরাহ ব্যবস্থায় তথ্য একেবারে না থাকা নয়; বরং শুল্ক কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকা তথ্য বিচ্ছিন্নভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে। তথ্যগুলোর মধ্যে পর্যাপ্ত সংযোগ নেই এবং সেগুলো একই মানে সংরক্ষণ, যাচাই ও পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থাও দুর্বল।

১৮ মাসের মধ্যে ব্যবস্থা প্রয়োজন ১৮ ঘাটতিতে

পর্যালোচনায় চিহ্নিত ৬৬টি ঘাটতির মধ্যে ১৮টিকে গুরুতর হিসেবে চিহ্নিত করে আগামী ১৮ মাসের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

আর ১৩টি কাঠামোগত ঘাটতি ১৮ থেকে ৩৬ মাস এবং আটটি কৌশলগত ঘাটতি ৩৬ থেকে ৬০ মাসের মধ্যে সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ১৪টি ঘাটতি চিহ্নিত হয়েছে প্রযুক্তি ও তথ্যসংক্রান্ত ক্ষেত্রে। এর মধ্যে পাঁচটি গুরুতর।

নীতি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় পাওয়া গেছে আরও ১৪টি ঘাটতি, যার চারটি গুরুতর। প্রাতিষ্ঠানিক ও পরিচালন ব্যবস্থায় ১২টি ঘাটতির মধ্যে তিনটিকে গুরুতর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এ ছাড়া খাতগত কাঠামোয় নয়টি, শিল্পের সক্ষমতায় আটটি এবং আর্থিক ক্ষেত্রে সাতটি ঘাটতি পাওয়া গেছে। আইন প্রয়োগ এবং তথ্য ব্যবস্থাপনায় একটি করে ঘাটতি চিহ্নিত হয়েছে।

রপ্তানিকারক ও শুল্ক কর্তৃপক্ষের তথ্যে সরাসরি সংযোগ নেই

পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার দুই প্রান্তে রপ্তানিকারকের পণ্যের উৎসসংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে শুল্ক কর্তৃপক্ষের তথ্যের তাৎক্ষণিক সংযোগ নেই।

বিদ্যমান তথ্যগুলো পর্যাপ্তভাবে সংযুক্ত, মানসম্মত, পারস্পরিক ব্যবহারযোগ্য ও যাচাইযোগ্য না হওয়ায় প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর নতুন শর্ত পূরণে সমস্যা হচ্ছে।

দেশে ফরেনসিক পরীক্ষার সক্ষমতা সীমিত থাকাও আরেকটি সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে রপ্তানিকারকদের বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পণ্য বা কাঁচামালের তথ্য যাচাই করতে হচ্ছে। এতে ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি পণ্য চালানেও বিলম্ব হতে পারে।

তুলার উৎস শনাক্তেও সমস্যা

তৈরি পোশাক খাতে ব্যবহৃত তুলা ও অন্যান্য কাঁচামালের উৎস শনাক্ত করার ক্ষেত্রেও ঘাটতি পাওয়া গেছে।

বিশেষ করে একাধিক উৎসের তুলা মিশিয়ে ব্যবহার করা হলে মিল পর্যায়ে এর উৎসের তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষিত না থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের জোরপূর্বক শ্রম প্রতিরোধসংক্রান্ত আইনের শর্ত পূরণে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।

বর্তমানে বিভিন্ন কারখানায় ডিজিটাল পদ্ধতিতে পণ্যের উৎস ও গতিপথ শনাক্ত করার উদ্যোগ থাকলেও সেগুলোর অধিকাংশই সংশ্লিষ্ট কারখানা বা পরীক্ষামূলক প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ। পুরো খাতের জন্য এখনো অভিন্ন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে চার রপ্তানি খাত

আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন বিধিবিধান ও সেগুলো কার্যকরের সময়সীমা বিবেচনায় তৈরি পোশাক ও বস্ত্র, চামড়া ও পাদুকা, কৃষি-খাদ্য এবং মৎস্য ও চিংড়ি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখা হয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে পণ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ের তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। পোশাক ও বস্ত্রপণ্যের জন্য ডিজিটাল পণ্য পাসপোর্ট চালুর প্রস্তুতিও চলছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বন উজাড়বিরোধী বিধির আওতায় বড় ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর থেকে সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদনস্থলের ভৌগোলিক অবস্থানের তথ্যসহ নির্ধারিত শর্ত কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।

এ ছাড়া জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে নিষিদ্ধ করার বিধান ২০২৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে।

চামড়া খাতে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের শর্ত অনুযায়ী ২০২৮ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে পশু জবাইয়ের স্থান পর্যন্ত পণ্যের উৎস শনাক্ত করার ব্যবস্থা পর্যায়ক্রমে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।

জাতীয় ব্যবস্থা গড়ার উদ্যোগ

আন্তর্জাতিক বাজারের এসব পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে সার্কুলারিটি ও ট্রেসেবিলিটিবিষয়ক নীতি সমন্বয় ইউনিট এবং আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় কমিটি গঠন করেছে।

সরকার জাতীয় ট্রেসেবিলিটি কৌশল, পরিবেশগত-সামাজিক-সুশাসন কাঠামো এবং দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক আচরণবিষয়ক নির্দেশিকা তৈরির কাজও করছে।

পর্যালোচনায় নতুন আরেকটি স্বতন্ত্র তথ্যভান্ডার তৈরির পরিবর্তে পারস্পরিকভাবে তথ্য বিনিময়ে সক্ষম একটি জাতীয় ট্রেসেবিলিটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় অভিন্ন তথ্যমান, প্রতিটি পণ্য বা চালানের স্বতন্ত্র পরিচিতি এবং বিভিন্ন রপ্তানি খাতের সঙ্গে শুল্ক ব্যবস্থার তাৎক্ষণিক তথ্য বিনিময়ের সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে।

ডিজিটাল পণ্য পাসপোর্টের ওপর জোর

বাণিজ্যমন্ত্রী আবদুল মুকতাদির বলেছেন, সরকার রপ্তানি ও দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার—উভয়ের জন্য খাতভিত্তিক পণ্যের উৎস ও গতিপথ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তার মতে, পণ্যের উৎস ও সরবরাহ ব্যবস্থা শনাক্ত করা গেলে খাদ্যে ভেজাল এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্যসংক্রান্ত সমস্যার সমাধানেও তা কাজে আসবে।

বিল্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌস আরা বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্য এ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রথম পর্যায়ে রপ্তানি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্রেতার শর্ত পূরণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে যুক্ত করে ডিজিটাল পণ্য পাসপোর্ট চালু এবং জাতীয় ট্রেসেবিলিটি প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু

বেসরকারি খাতেও ইতোমধ্যে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উর্মি গ্রুপ, এপিলিয়ন ও ফতুল্লা অ্যাপারেলসে ডিজিটাল পণ্য পাসপোর্টের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

চামড়া খাতের একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্পে ১৬টি ট্যানারি এবং চিংড়ির উৎস শনাক্তকরণ কার্যক্রমে প্রায় ৪০০ খামারি যুক্ত রয়েছেন।

উর্মি গ্রুপের টেকসই উন্নয়ন বিভাগের প্রধান এ বি এম ফখরুল আলম আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে এ প্রক্রিয়ায় জ্বালানি মন্ত্রণালয়কেও যুক্ত করার কথা বলেছেন।

spot_img
spot_img

অধিক পঠিত

Related Articles