Skip to content

,

,

বেনার নিউজ

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে একটি সমালোচনামূলক তথ্যচিত্র প্রচারের কয়েক সপ্তাহ পর মঙ্গলবার দিল্লি ও মুম্বাইয়ে বিবিসির দুটি কার্যালয়ে তল্লাশি চালিয়েছে ভারতের আয়কর বিভাগ।

এই ঘটনা পুরো ভারতজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করছে। সমালোচনা শুরু হয়েছে বাংলাদেশেও।

বিবিসির তৈরি তথ্যচিত্র ‘ইন্ডিয়া: দ্য মোদি কোয়েশ্চন’ সামনে আসার পর থেকে ভারতজুড়ে জোর বিতর্ক শুরু হয়। ভারত সরকারের নির্দেশে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম থেকে মুছে ফেলা হয় তথ্যচিত্রটি।

গত ২০ জানুয়ারি দুই পর্বের এই তথ্যচিত্রটির প্রথম পর্ব সম্প্রচারিত হওয়ার পরেই সরকারি পর্যায়ে এটির সম্প্রচার বন্ধের তৎপরতা দেখা যায়।

গত ২১ জানুয়ারি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা কাঞ্চন গুপ্ত টুইটারে বলেন, মন্ত্রকের পক্ষ থেকে ইউটিউব ও টুইটারকে বিবিসির তথ্যচিত্রটির সমস্ত লিঙ্ক বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

“ভারতের ঐক্য, সার্বভৌমত্ব এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে খারাপ প্রভাব ফেলবে এই তথ্যচিত্র,” বলা হয় টুইট বার্তায়।

বিবিসি বাংলার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুজরাটে ২০০২ সালে মুসলিম-বিরোধী দাঙ্গায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভূমিকা ঘিরে ওই তথ্যচিত্রটি তৈরি করা হয়েছিল। তখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নরেন্দ্র মোদি।

কার্যালয়ে তল্লাশির পর বিবিসি জানিয়েছে, তারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ‘পূর্ণ সহযোগিতা’ করছে।

“আমরা আশা করছি, যত দ্রুত সম্ভব এই পরিস্থিতির সমাধান হয়ে যাবে,” সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে বলেছে বিবিসি।

ওই তথ্যচিত্রটি শুধুমাত্র যুক্তরাজ্যের টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয়েছে জানিয়ে বিবিসি বলছে, “ভারতে সেটির অনলাইনে প্রচার বা শেয়ারিং বন্ধ করতে পদক্ষেপ নিয়েছে দেশটির সরকার। ভারত সরকারের বক্তব্য, তথ্যচিত্রটি ‘ঔপনিবেশিক মানসিকতায়’ তৈরি ‘ ভারত-বিরোধী প্রোপাগান্ডা ও আবর্জনা।”

সরকারের ‘স্বৈরাচারী মনোভাবকে প্রকট করে তুলেছে

ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোতে খবর বেরিয়েছে ওই তথ্যচিত্রটি দেখার জন্য জড়ো হওয়া একদল শিক্ষার্থীকে গত মাসে আটক করেছিল দিল্লি পুলিশ।

বিবিসি কার্যালয়ে অভিযানের ঘটনায় বিরোধীরা ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সরকারের এই মনোভাবের তীব্র সমালোচনা করছে।

ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি রাহুল গান্ধী নরেন্দ্র মোদি সরকারের প্রবল সমালোচনা করেন। সমালোচনায় সরব হয়েছেন সাংবাদিক, আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীরাও।

মঙ্গলবার অভিযানের ঘটনায় দিল্লি-ভিত্তিক বিশিষ্ট সাংবাদিক পরঞ্জয় গুহ ঠাকুরতা বেনারকে বলেন, “আজকের এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে কোনো তথ্যচিত্র বা বই নিষিদ্ধ করে আটকানো সম্ভব নয়। যারা দেখার তারা দেখবেই।”

তিনি বলেন, “বিবিসির তথ্যচিত্রকে নিষিদ্ধ করে এবং তাদের দিল্লি অফিসে আয়কর দপ্তর অভিযান সংগঠিত করে ভারত সরকার বোকামি করছে।”

তাঁর প্রশ্ন, “সরকার কি ১৯৭০-র দশকের ইন্দিরা গান্ধীর আমলের মতো জরুরি ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনছে?”

মানবাধিকার কর্মী কিরীটি রায় বেনারকে বলেন, “স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার সংবিধানে স্বীকৃত। তাই বিরোধী মত থাকতেই পারে। অথচ সেই সব মতকে আটকানো হচ্ছে। সরকার রাজনৈতিকভাবে আক্রমণ করছে।”

তিনি বলেন, “বিবিসির তথ্যচিত্রকে নিষিদ্ধ করা এবং তাদের দপ্তরে আয়কর বিভাগের হানা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ছাড়া আর কিছু নয়।”

তিনি মনে করেন, “গণতন্ত্রে ন্যূনতম আস্থা না থাকলে যা হয় তাই হচ্ছে। এটা নিন্দনীয়।”

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগের সিনিয়র অধ্যাপক অঞ্জন বেরা বেনারকে বলেন, “বিবিসির তথ্যচিত্র দেখতে বাধা দেওয়া এবং বিবিসিকে হয়রানি করা এই সরকারের স্বৈরাচারী মনোভাবকে প্রকট করে তুলেছে।”

তিনি আরও বলেন, “বাক স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা যেভাবে খর্ব করা হচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রবলভাবে সমালোচিত হচ্ছে। এর ফলে গোটা বিশ্বের কাছে ভারতের মর্যাদা হানি হচ্ছে।”

তাঁর মতে, সরকার বাক স্বাধীনতা খর্ব করার পাশাপাশি মানবাধিকার সংগঠনগুলির ওপরও আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশেও সমালোচনা, উদ্বেগ

ভারতের দিল্লি ও মুম্বাইয়ে বিবিসির কার্যালয়ে ভারত সরকারের আয়কর বিভাগের তল্লাশি সম্পর্কে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সাবেক সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল বেনারকে বলেন, “গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে আমরা নানা ধরনের নিপীড়নের ঘটনা দেখি, যার একটা বড়ো অংশ হচ্ছে রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যবহার।”

ভারতে বিবিসি’র দুটি কার্যালয়ে আয়কর কর্তৃপক্ষের অভিযান স্পষ্টতই স্বাধীন গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভয়াবহ ব্যবহার। এই ঘটনার মাধ্যমে বিবিসির বিরুদ্ধে ভারত সরকারের রোষানল স্পষ্ট হলো।

“ভারতের মতো উদার গণতান্ত্রিক হিসেবে দুনিয়াজুড়ে খ্যাতি থাকা একটি দেশে এই ধরনের ঘটনা আমাদের মতো দেশগুলোর সরকারদের জন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করে। সেটা আমাদের জন্য খুবই উদ্বেগের কারণ,” বলেন বুলবুল।

যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন আর্টিকেল নাইনটিনের দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক পরিচালক ফারুক ফয়সাল বেনারকে বলেন, “যে কোনো মৌলবাদী বা কর্তৃত্ববাদী সরকারের জন্য সত্য মেনে নেয়া কঠিন। ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকার বিবিসি’র ওপর নিপীড়ন চালানোর মাধ্যমে প্রমাণ করেছে তার বিরুদ্ধে প্রচারিত তথ্যচিত্রটি সত্য।”

“সাধারণত এই ধরনের সরকার স্থানীয় গণমাধ্যমকে চাপে রাখে, কিন্তু যখনি স্বাধীন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে খবর প্রকাশ হয় তখন তারা তাদের আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নানা নিপীড়ন চালাতে শুরু করে,” বলেন ফারুক।

এই ধরনের ন্যাক্কারজনক হামলা একটি দেশকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সমালোচিত করে তোলে দাবি করে তিনি বলেন, “ভারতের ঘটনা থেকে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের সতর্ক হওয়া উচিত। দেশগুলোর এমন কোনো কাজ করা উচিত নয় যা তাদের বহির্বিশ্বে নিন্দিত করে।”

ওভারসিজ করেসপনডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ওকাব) সদস্যসচিব নজরুল ইসলাম মিঠু বেনারকে বলেন, “বিবিসির কার্যালয়ে এই অভিযান স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য ভয়াবহ হুমকি। এর দায় অবশ্যই ভারত সরকারকে নিতে হবে।”

স্বাধীন সাংবাদিকতার ক্ষেত্র ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে দাবি করে তিনি বলেন, “এই ধরনের অভিযান বা অভিযানের নামে হামলা অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত।”

যা আছে ওই তথ্যচিত্রে

বিবিসি বাংলা প্রচারিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিবিসির ওই তথ্যচিত্রে দেখানো হয়েছিল যে, মোদি কীভাবে রাজনীতিতে এসেছিলেন এবং ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) কীভাবে ক্রমান্বয়ে উপরে উঠে পশ্চিমাঞ্চলের রাজ্য গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন।

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে বিবিসির সংগ্রহ করা একটি অপ্রকাশিত প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়েছিল ধর্মীয় দাঙ্গা চলার সময় মোদির কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা প্রশ্ন।

হিন্দু তীর্থযাত্রীদের বহনকারী একটি রেলে আগুন লাগানোর পর অনেক মানুষ হতাহত হলে ওই দাঙ্গা শুরু হয়। এরপর কয়েকদিনের সহিংসতায় এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন, যাদের বেশিরভাগ ছিলেন মুসলমান।

বিবিসির অনুসন্ধান বলছে, যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, মোদি সেই সময় ‘দায়মুক্তির পরিবেশ’ তৈরি করার জন্য ‘সরাসরি দায়ী’ ছিলেন, যা সহিংসতাকে উস্কে দেয়।

তখনকার ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাক স্ট্রর নির্দেশে করা একটি তদন্তের অংশ হিসাবে ওই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে বলা হয়, ‘সহিংসতার মাত্রা প্রকাশিত খবরের চেয়ে অনেক বেশি ছিল’ এবং ‘দাঙ্গার লক্ষ্য ছিল হিন্দু এলাকাগুলো থেকে মুসলমানদের নির্মূল করা’।

“মোদি দীর্ঘদিন ধরেই তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছেন এবং দাঙ্গার জন্য কখনো ক্ষমা চাননি। ২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের একটি প্যানেলও বলেছে, তার বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি,” বলা হয় বিবিসির প্রতিবেদনে।