Skip to content
:

বেনার নিউজ

পার্বত্য জেলা বান্দরবানের লামা উপজেলায় আট মাসের ব্যবধানে ক্ষুদ্র ম্রো জাতিগোষ্ঠীর ওপর একই রাবার কোম্পানির দ্বিতীয় দফা আক্রমণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। ঘটনা তদন্তে কমিশন বুধবার একটি উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন দলকে ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছে।

কমিশন বলছে, গত বছর ২৬ এপ্রিল চালানো আক্রমণের পর যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হলে এমন ঘটনা আবার ঘটত না।

ওই আক্রমণের নিন্দা জানিয়ে যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সিএইচটি কমিশন বিবৃতি দেওয়ার পরদিনই জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পক্ষ থেকে তদন্ত দল পাঠানো হলো।

ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা বেনারকে জানিয়েছেন, তাঁদের ওপর আক্রমণের উদ্দেশ্য হলো ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর এসব মানুষকে জমি থেকে উচ্ছেদ করে রাবার চাষ করা।

কার্যকর ব্যবস্থার অভাবে ‘এসব ঘটনা ঘটে চলেছে’

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ বুধবার বেনারকে বলেন, “বান্দরবানে ম্রো জাতিসত্তার মানুষের ওপর এ ধরনের আক্রমণ কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়। এর আগে গত বছরের ২৬ এপ্রিল সেখানে ম্রো সম্প্রদায়ের বাসিন্দাদের ওপর আক্রমণ চালানো হয়।”

“ওই আক্রমণের পর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পক্ষ থেকে বান্দরবানের জেলা প্রশাসককে বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা বলা হয়। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেই প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে আরও কিছু বিষয় যুক্ত করে ৩১ জানুয়ারির মধ্যে তা আবার দাখিল করতে বলা হয়েছিল,” জানান কমিশনের চেয়ারম্যান।

এছাড়া তাঁদের পুনর্বাসন এবং সেখান সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবকে অনুরোধ করা হয়েছিল বলে তিনি জানান।

“আগের আক্রমণের ওপর প্রতিবেদন শেষ হওয়ার আগেই আরেকবার আক্রমণ হওয়ার বিষয়টি খুবই দুঃখজনক,” বলেন কামাল উদ্দিন আহমেদ।

“বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে আমরা সরকারের প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা না করে কমিশনের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সদস্য কংজরী চৌধুরীর নেতৃত্বে পরিচালক মো. আশরাফুল আলমসহ চার সদস্যের একটি তদন্ত দল সেখানে পাঠিয়েছি। তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে,” যোগ করেন তিনি।

চেয়ারম্যান বলেন, কমিশন মনে করে, কার্যকর প্রশাসনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় ধারাবাহিকভাবে এসব ঘটনা ঘটে চলেছে এবং ম্রো সম্প্রদায়ের মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে।

এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা প্রতিহত করতে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে দ্রুততার সঙ্গে নিরপেক্ষ তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি।

‘এখন আমাদের বাড়ি-ঘর নেই’

আক্রমণের শিকার রেঙ্গেন ম্রো কারবারি (৬৮) বুধবার বেনারকে বলেন, সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে ছয়টি ট্রাকে করে প্রায় তিনশ মানুষ লাঠি, দা, বন্দুক নিয়ে দীঘিছড়া, নতুন দীঘিছড়া পাড়া, রেঙ্গেন কারবারিপাড়ায় আক্রমণ করে।

“আক্রমণকারীরা আমাদের তিনটি বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। সেগুলো পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। পাঁচটি (কাঠের) বাড়ি দা দিয়ে কেটে টুকরা টুকরা করে দিয়েছে,” বলেন তিনি।

তাঁদের পাড়ায় মোট ৬৮ জন মানুষ বাস করতেন জানিয়ে তিনি বলেন, “সবাই প্রাণভয়ে জঙ্গলে পালিয়ে যাই। এখন আমাদের বাড়ি-ঘর নেই।”

তিনি বলেন, “আক্রমণকারীরা লামা রাবার কোম্পানির লোক। ওরা আমাদের উচ্ছেদ করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গত বছর ২৬ এপ্রিল ম্রো সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর তারা আক্রমণ করেছিল।”

বুধবার সকালে লামা উপজেলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এসে তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেছেন বলে জানান তিনি।

তবে লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ফেডারেশন অব চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন বুধবার রাতে বেনারকে জানান, তাঁর কোম্পানি এই আক্রমণের সঙ্গে জড়িত না।

“১৯৮২ সালে সরকার লামায় ওসব জমি লিজ দেয়,” জানিয়ে তিনি বলেন, লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের মোট ১ হাজার ৬০০ একর জমির মধ্যে ৬৪ জন অংশীদার রয়েছে।

মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, “আমাদের যখন জমি দেওয়া হয় তখন সেখানে যাওয়া যেত না। প্রত্যন্ত অঞ্চল ছিল। আমরা সেখানে রাবারসহ ফলের চাষ করছি। আমরা কোনো প্রকার অবৈধ কাজ করছি না।”

তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে সেখান রাস্তাঘাট হয়েছে, জমির দাম বেড়েছে। সেখানে একটি কায়েমি স্বার্থগোষ্ঠী রয়েছে, যারা আমাদের জমি দখল করতে চায়।”

“ওই কায়েমি গোষ্ঠী স্থানীয় মানুষকে দিয়ে এসব বাড়ি ভেঙে আমাদের ওপর দোষ চাপাচ্ছে,” বলেন তিনি।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলাসহ দেশে মোট ৫০টি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ বসবাস করেন। এসব ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মধ্যে একটি হলো ম্রো। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশে ৫২ হাজারের কিছু বেশি ম্রো জনগোষ্ঠীর মানুষ রয়েছেন।

ম্রো সম্প্রদায়ের মানুষ মূলত বান্দরবান জেলার প্রত্যন্ত দুর্গম এলাকায় বসবাস করেন। তাঁরা উঁচু কাঠের বাড়ি নির্মাণ করে বাস করেন।

৪২ মানবাধিকার কর্মীর নিন্দা

লামা উপজেলার রেঙ্গেনপাড়ায় ম্রোদের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়েছেন দেশের ৪২ মানবাধিকারকর্মী।

তাঁরা বলছেন, গত এক বছর ধরে লামায় ম্রো জনগোষ্ঠীদের উচ্ছেদের লক্ষ্যে নির্যাতন চালানো হচ্ছে। সর্বশেষ হামলার ঘটনাটি অমানবিক ও বর্বরোচিত।

গতকাল বুধবার গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে ম্রোদের বাড়িতে হামলা, লুটপাট ও আগুন দেওয়ার ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে বিচারের দাবি জানানো হয়।

বিশিষ্ট নাগরিকেরা বলেন, “হামলার আগে সন্ধ্যায় লামা থানার একজন উপপরিদর্শক ম্রোদের শাসিয়ে যান। এরপর রাতে ম্রো পাড়ায় হামলা চালানো হয়।”

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ ক্ষতিপূরণ প্রদান, হামলাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করা এবং ওই এলাকায় রাবার কোম্পানিগুলোর ইজারা বাতিল করার দাবি জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মীরা।

বিবৃতি দিয়েছেন; জাফরুল্লাহ চৌধুরী, হামিদা হোসেন, সুলতানা কামাল, ওয়াহিদউদ্দিন আহমেদ, খুশী কবির, মেঘনা গুহঠাকুরতা, জেড আই খান পান্না, আবুল বারকাত, ইফতেখারুজ্জামান, রাণা দাশগুপ্ত, শামসুল হুদা, শিরিন হক, আসিফ নজরুল, সেলিম সামাদ, সারা হোসেন, সঞ্জীব দ্রং, শহিদুল আলম, শাহীন আনাম, জাকির হোসেন, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, দীপায়ন খীসা, স্বপন আদনান, রোবায়েত ফেরদৌস প্রমুখ।