Skip to content

,

,

বেনার নিউজ

তিন সপ্তাহ ধরে আন্দামান সাগরে ভেসে থাকা দেড় শতাধিক রোহিঙ্গা ও বাঙালির মধ্যে অন্তত ২০ জন অনাহারে এবং পানির তৃষ্ণায় মারা গেছেন বলে তথ্য পেয়েছে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন আরাকান প্রোজেক্ট।

“মঙ্গলবার পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছিলেন ওই নৌকার কাপ্তান। এরপর মারা যাওয়া অন্তত দুইজনের পরিবারের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়েছে। সুস্পষ্টভাবে জানতে না পারলেও আমরা ধারণা করছি মৃতের সংখ্যা এখন ২০ জন,” থাইল্যান্ড থেকে বেনারকে জানিয়েছেন রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘আরাকান প্রোজেক্টে’র পরিচালক ক্রিস লিউয়া।

“বর্তমানে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মাঝামাঝি সাগরে ভাসমান নৌকাটি থেকে হতভাগা মানুষগুলোকে উদ্ধারে কোনো দেশ তৎপর হয়নি, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক,” প্রথমে ইমেইল বার্তায় এবং পরে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় টেলিফোনে বেনারকে বলেন তিনি।

আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের সহায়তায় বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন শরণার্থী শিবির থেকে পালিয়ে সাগর পথে শতাধিক রোহিঙ্গা মালয়েশিয়া যাচ্ছিলেন। তাদের সঙ্গে যোগ দেন টেকনাফের স্থানীয় প্রায় ৫০ যুবক। নভেম্বরের শেষ দিকে ইঞ্জিন বিকল হয়ে ট্রলারটি সাগরে ভাসতে থাকে।

বেনারের পক্ষ থেকে সরেজমিন অনুসন্ধান করে টেকনাফ থেকে ৫০ যুবকের পরিচয় পাওয়া গেছে, যাদের প্রায় সবাই একই এলাকার বাসিন্দা।

আটকে থাকা রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশিদের কয়েক ডজন ফোন কলের রেকর্ডকৃত অডিও বার্তা তাদের হাতে আছে উল্লেখ করে ক্রিস বেনারকে বলেন, “উদ্ধার না করলেও ভারতীয় নৌবাহিনীর সদস্যরা তাদের খাদ্য ও পানি সরবরাহ করেছে বলে আমরা ধারণা করছি। মঙ্গলবার পর্যন্ত তাদের সঙ্গে ফোন কলে কথা বলার সময় কন্ঠগুলো ছিল দুর্বল ও ম্রিয়মাণ। তারা কথাও বলতে পারছিল না, মৃতপ্রায় মানুষের কন্ঠস্বর মনে হচ্ছিল। তবে এখন তাদের কন্ঠে কিছুটা সুস্থতার লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে।”

তাদের উদ্ধার করা জলসীমার নিকটবর্তী দেশগুলোর মানবিক দায়িত্ব উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমরা মালয়েশিয়া সরকারকে অনুরোধ করেছি, তারা যাতে ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে তাদের উদ্ধারের বিষয়ে কথা বলে। কারণ ট্রলারটি ইন্দোনেশিয়ার স্থলভাগের নিকটবর্তী হওয়ায় উদ্ধার করা তাদের জন্য সহজ হবে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, উদ্ধারের পর তাদের কোন দেশে নেওয়া হবে। আমরা মনে করি ইন্দোনেশিয়া সরকার উদ্ধার করে তাদের মালয়েশিয়ার কাছে হস্তান্তর করতে পারে, কারণ তারা সম্ভবত মালয়েশিয়ার জলসীমায় রয়েছে এবং সেখানে যাওয়ার জন্যই তারা রওনা দিয়েছিল।”

নৌকায় থাকা মানুষগুলোর বর্তমান অবস্থা বর্ণনা করে তিনি বলেন, “আমরা যাত্রীদের আত্মীয়দের মাধ্যমে নৌকা থেকে কয়েক ডজন অডিও বার্তা পেয়েছি, যা খুবই সংক্ষিপ্ত, ৩০ সেকেন্ডেরও কম। এগুলো শোনা হৃদয়বিদায়ক, কারণ বেশিরভাগ বার্তায় নারী ও পুরুষরা কান্নাকাটি করেছে এবং তাদের উদ্ধার করার জন্য আহ্বান জানানো হচ্ছে। তারা বলছিল তাদের পানি এবং খাবার শেষ হয়ে যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ সাগরের পানি পান করে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলেও জানান।”

ক্রিস বলেন, “দুই-তিন দিন আগে, এক ব্যক্তি বলেছিলেন তিনজন মহিলা আর সহ্য করতে না পেরে নৌকা থেকে সাগরে লাফ দিয়েছিলেন। আমার জন্য সবচেয়ে হৃদয়বিদারক হল, একজন নৌকায় থাকা চারটি ছোট বাচ্চার ছবি পাঠিয়েছেন। কেউ তাদের উদ্ধার করতে না গেলে তারা অবশ্যই মারা যাবে। নৌকা থেকে অন্তত একজন রাগান্বিত হয়ে আর কল না করার জন্য বলেছে, যেহেতু তাদের বাঁচানোর জন্য কিছুই করতে পারছি না।”

“সুতরাং আপনি বুঝতে পাচ্ছেন, পরিস্থিতির একটি পরিষ্কার চিত্র পাওয়া কঠিন। আমরা কেবল অনুমান করতে পারি যে ইতিমধ্যে ২০ জনের মতো মারা গেছে। বাস্তবতা হল আমরা সত্যিই জানি না ঘটনার ভয়াবহতা,” বেনারকে বলেন ক্রিস।

জাতিসংঘের আহ্বান

সাগরে আটকে থাকা এই মানুষদের উদ্ধারে ওই সাগরের নিকটবর্তী দেশগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে তৎপর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন।
সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন (ইউএনএইচসিআর) এশিয়ার মুখপাত্র বাবর বালোচ ভারত ও শ্রীলঙ্কা উভয় দেশকেই জাহাজে থাকা ব্যক্তিদের উদ্ধারে সহায়তা করার আহ্বান জানিয়েছেন।

“জীবন বাঁচাতে এবং আরও মৃত্যু এড়াতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। জীবন বাঁচাতে দেশগুলির নিষ্ক্রিয়তার ফলে একেক দিন অতিবাহিত হওয়ার সাথে আরও বেশি মানবিক দুর্দশা এবং বিয়োগান্তক ঘটনা ঘটছে,” বলেন বালোচ।

পার্লামেন্টারিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস-এর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় আইন প্রণেতাদের একটি দল প্রতিবেশী দেশগুলোকে নৌকাটি জরুরী উদ্ধার করার জন্য আহ্বান জানিয়েছে।

মঙ্গলবার জাকার্তাভিত্তিক সংগঠনটির বোর্ড সদস্য ও ইন্দোনেশিয়ার প্রতিনিধি পরিষদের সাবেক সদস্য ইভা সুন্দরী সংগঠনের পক্ষে এই আহ্বান জানান।

জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর গত ৮ ডিসেম্বর সাগরে আটকে পড়া হতভাগা ব্যক্তিদের উদ্ধার করার আহ্বান জানালেও আসিয়ান সদস্য রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড এবং ভারত সরকারের পক্ষ থেকে এখনও উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

সংস্থাটির আশঙ্কা, ইতোমধ্যে হয়তো অনেক ব্যক্তি খাদ্য ও পানীয় না পেয়ে প্রাণ হারিয়েছেন এবং যাঁরা বেঁচে আছেন তাঁরা চরম অনাহারে রয়েছেন।

বাংলাদেশ কিছুই জানে না

বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গা ও বাঙালিদের বহন করা নৌকা সাগরে আটকে পড়ার বিষয়ে তেমন কিছু অবহিত নয় বলে জানিয়েছে।
জানতে চাইলে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বৃহস্পতিবার বেনারকে বলেন, “সাগরে শরণার্থী বহনকারী ট্রলার ভাসছে বলে আমিও শুনেছি। কিন্তু তাঁরা কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির থেকে গেছেন এমন কোনও প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। আমরা যতটুকু জেনেছি মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গারা সাগরপথে মালয়েশিয়া পাড়ি জমাচ্ছে।”

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কামরুজ্জামান বেনারকে বলেন, “সাগরে ভাসমান মালয়েশিয়াগামী ট্রলারে বেশ কিছু বাংলাদেশি রয়েছে এমন খবর স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ তাদের পরিবারের কাছ থেকে শুনেছি। বিষয়টি অবহিত হওয়ার পর বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডকে অবহিত করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ট্রলারটি কোন জায়গায় রয়েছে সেটি জানা সম্ভব হয়নি।”

আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যানিটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মেদ জুবায়ের বেনারকে বলেন, “কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরের বেশকিছু রোহিঙ্গা সাগরে ভাসমান ট্রলারে থাকার কথা শুনেছি। মূলত সাগরপথে মালয়েশিয়া পাড়ি দিতে তারা ক্যাম্প ছেড়েছে। কীভাবে তারা সেখানে পৌছেঁছে সে বিষয়ে আমি অবগত নই।