Skip to content
,

বেনার নিউজ

মেয়াদ পূর্তির আগেই জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগ করছেন বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সাত সংসদ সদস্য।

শনিবার গোলাপবাগ মাঠে অনুষ্ঠিত দলের ঢাকা বিভাগীয় মহাসমাবেশে এই ঘোষণা দেন বিএনপির সংসদ সদস্যরা।

উল্লেখ্য, ১৯৯৪ সালের শেষের দিকে যে দাবিতে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ এবং জামায়াতে ইসলামীসহ মোট ১৪৭ সংসদ সদস্য বিএনপির নেতৃত্বাধীন সংসদ থেকে মেয়াদ পূর্তির আগে একযোগে পদত্যাগ করেন, সেই দাবিতেই এবার পদত্যাগ করছেন বর্তমান বিরোধী দল বিএনপির সংসদ সদস্যরা।

সেবার নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সংবিধান সংশোধনের দাবিতে রাস্তার আন্দোলনের পাশাপাশি পদত্যাগ করেন বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা। এর ফলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সংসদ বৈধতা হারায়। এরপর শুরু হয় গভীর রাজনৈতিক সংকট। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাশের মাধ্যমে সেই সংকটের সমাধান হয়।

শনিবারের সমাবেশে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, ই-মেইলে জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর তাঁদের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠানো হয়েছে।

তবে সংসদে কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্যকে পদত্যাগ করতে হলে স্বহস্তে লিখিত পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছে পৌঁছাতে হবে। অন্যথায় স্পিকার পদত্যাগপত্র গ্রহণ নাও করতে পারেন।

তবে রুমিন ফারহানা বলেন, রোববার স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র হস্তান্তর করে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করবেন তাঁরা।

বর্তমান সংসদকে ‘অবৈধ’ দাবি করে তা ভেঙ্গে দেয়াসহ সরকারের পদত্যাগ দাবি করা হয় গোলাপবাগে বিএনপির মহাসমাবেশ থেকে। একইসঙ্গে ২০১১ সালের ৩০ জুন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সংসদে বাতিল হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে ফিরিয়ে আনার দাবি জানানো হয়।

বিদ্যমান নির্বাচন কমিশন বাতিল করে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন, বিএনপি প্রধান বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল এবং সন্ত্রাস দমন আইন-২০০৯ বাতিলসহ মোট ১০ দফা দাবি ঘোষণা করা হয় সমাবেশ থেকে।

মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অনুপস্থিতিতে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন দলের স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন।

বিএনপি মিডিয়া সেলের প্রধান জহির উদ্দিন স্বপন বেনারকে বলেন, “আমরা যখন বলছি সংসদ অবৈধ তখন সেই সংসদে থাকার কোনো মানে নেই। তাই আমাদের সংসদ সদস্যরা পদত্যাগ করেছেন।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, বিএনপির সংসদ সদস্যদের পদত্যাগ করায় বৈধতা সংকটে পড়বে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জাতীয় সংসদ।

এদিকে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের শনিবার সভারে এক দলীয় জনসভায় বলেছেন, বিএনপির সাত এমপি পদত্যাগ করায় সংসদের কাজে কোনো অসুবিধা হবে না। কোনো সংকট সৃষ্টি হবে না।

জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদের (জানিপপ) প্রধান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ বেনারকে বলেন, “সংখ্যার দিক থেকে সংসদে বিএনপির সদস্য সংখ্যা নগণ্য। কিন্তু রাজনৈতিক জনসমর্থন প্রায় আওয়ামী লীগের সমান। বিএনপির দশটি গণসমাবেশে যেভাবে মানুষ দলে দলে যোগ দিয়েছে তাতে এ কথা নি:সন্দেহে বলা যায়।”

তিনি বলেন, “জনসমর্থনের কথা বিবেচনায় নিলে সংসদ থেকে বিএনপি সংসদ সদস্যদের পদত্যাগ একটি বিরাট ঘটনা। বিএনপির এই সাত সংসদ-সদস্য থাকার কারণেই কিন্তু জনগণের কাছে বর্তমান সংসদের বৈধতা (লেজিটিমেসি) রয়েছে।”

ড. কলিমুল্লাহ বলেন, “বিএনপির সংসদ-সদস্যরা অনেক ক্ষেত্রেই সরকারের খুব কড়া ও গঠনমূলক সমালোচনা করতেন। তাঁদের পদত্যাগের ফলে সেই বৈধতা চলে যাবে। সংসদে বিতর্ক থাকবে না।”

তিনি বলেন, “সংসদের লেজিটিমেসি চলে গেলে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমরা হয়তো বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছি।”

ড. কলিমউল্লাহ বলেন, “সংসদ থেকে পদত্যাগের কারণে বিএনপির সামনে আলোচনার পথ সংকুচিত হয়ে আসবে। তাদের রাস্তার আন্দোলনেই থাকতে হবে। আবার আওয়ামী লীগকেও রাস্তায় থাকতে হবে। সুতরাং আমরা রাজনৈতিক সংঘাত ও সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছি, যা দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়।”

বিএনপির এমপিদের পদত্যাগের বিষয়ে আওয়ামী লীগ দলীয় হুইপ ইকবালুর রহিম বেনারকে বলেন, “এটা তাঁদের একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তবে সংসদ থেকে পদত্যাগ করা উচিত নয়। কারণ সংসদ হলো জনগণের আশা আকাঙ্খা প্রতিফলনের জায়গা।”

তাঁর মতে, “এই পদত্যাগের ফলে সংসদের বৈধতার কোনো সমস্যা হবে না। কারণ, বিএনপি তো প্রধান বিরোধীদল নয়।”

শনিবারের সমাবেশ থেকে বিএনপি জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগ করার জন্য জাতীয় পার্টির প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

সংসদে সংখ্যার দিক থেকে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির মহাসচিব ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু শনিবার বেনারকে বলেন, “বিএনপি সংসদ থেকে পদত্যাগ করায় সংসদের কাজে কোনো সমস্যা হবে না। কারণ, আমরা বিএনপির মতো বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করি না। আমাদের সংসদ সদস্যরা বিল পাসসহ বিভিন্ন কাজে গঠনগমূলক সমালোচনা করে থাকি।”

চুন্নু বলেন, “তবে এই পদত্যাগের ফলে দেশ সংঘাতের দিকে ধাবিত হবে। কারণ আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি দুই দলই ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মরিয়া। তাদের কাছে জনগণের কোনো মূল্য নেই। তাদের আক্রমনাত্মক আচরণের কারণে আগামী দিনগুলোতে সহিংসতা, সন্ত্রাস শুরু হওয়ার আশংকা রয়েছে।”

জাতীয় সংসদের ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৫০ আসনের জাতীয় সংসদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও এর শরিক দলের আসন সংখ্যা ৩১১ টি।  এসব আসনের মধ্যে সরাসরি নির্বাচিত ও সংরক্ষিত মিলিয়ে আওয়ামী লীগের আসন সংখ্যা ৩০১ টি।

আওয়ামী লীগের শরিক দলের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (চার আসন), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (দুই আসন), বিকল্প ধারা (দুই আসন), বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন (এক আসন) এবং আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জাতীয় পার্টি (জেপি) (এক আসন)।

সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিক থেকে বিরোধী দল হিসেবে রয়েছে সাবেক স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের জাতীয় পার্টি। এই দলের আসন সংখ্যা ২৬ টি।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) আসন সংখ্যা রয়েছে সাতটি। এ ছাড়া গণফোরামের দুইটি এবং স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রয়েছেন তিনজন।

এখন গাইবান্ধার একটি আসন শূন্য রয়েছে, যেটির উপনির্বাচন অনিয়মের কারণে স্থগিত রেখেছে নির্বাচন কমিশন।