Skip to content

৯ হাজার বছর কারাবাস

৯ হাজার বছর কারাবাস

টেলিভিশনে স্বল্পবসনা নারীদের মধ্যে বসে তিনি নীতি কথা বলতেন, প্রচার করতেন ধর্মের বাণী। অপরাধী চক্রের নেতৃত্ব দেওয়া, যৌন নির্যাতন, শিক্ষার অধিকার হরণ, মানসিক নির্যাতন, ব্যক্তিস্বাধীনতা খর্ব করা, গুপ্তচরবৃত্তিসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত। তুরস্কের স্বঘোষিত এই আধ্যাত্মিক ধর্মগুরুর নাম আদনান ওকতার। যাকে রেকর্ড ৮ হাজার ৬৫৮ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। লিখেছেন নারসিন শওকত

আদনান ওকতার

আদনান ওকতার। তুরস্কের স্বঘোষিত ধর্মপ্রচারক ও আধ্যাত্মিক গুরু। ধর্মীয় সম্প্রদায়ের একজন যৌন (সেক্স কাল্ট) নেতা, ধর্মপ্রচারক, সৃষ্টিবাদ মতাদর্শের অনুসারী, বিবর্তনবাদবিরোধী ও ষড়যন্ত্রতাত্ত্বিক এবং বিতর্কিত বইয়ের লেখক। ৬৬ বছর বয়সী এই ধর্মগুরু আদনান হোকা বা হারুন ইয়াহিয়া নামেও পরিচিত। ওকতার ফাইন আর্টস নিয়ে পড়াশোনা করার পর ধর্মগুরুর পথ বেছে নেন । ১৯৮০ সালে ধর্মগুরু হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু তার। শুধু তা-ই নয়, হারুন ইয়াহিয়া ছদ্মনামে বইও লিখতেন। ধর্মতত্ত্ব নিয়ে লেখা বিজ্ঞানভিত্তিক সেসব বইয়ের পাঠক কয়েক লাখ। যে বই আবার একাধিক ভাষায় অনূদিতও হয়েছে। নিজস্ব একটি টেলিভিশন চ্যানেলও চালাতেন ওকতার। যেখানে মুসলিম ধর্মপ্রচারক (মুসলিম টেলিভ্যাঞ্জেলিস্ট) হিসেবে নিয়মিত টকশো উপস্থাপন করতেন। জনপ্রিয় ওই শোতে স্বল্পবসনা নারীবেষ্টিত হয়ে নানা ধর্র্মীয় নসিহত করতে দেখা যেত তাকে।

১৯৫৬ সালে তুরস্কের আঙ্কারায় জন্ম নেন আদনান ওকতার। উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা পর্যন্ত সেখানেই বেড়ে ওঠেন তিনি। যেখানে তিনি কুর্দি মুসলিম পণ্ডিত সাইদ নুরসির ইসলামিক মতাদর্শ নিয়ে পড়াশোনা করেন।  মাহদি ওয়ার্স আরমানির তথ্য মতে, ১৯৭৯ সালে ওকতার ইস্তাম্বুলে আসেন। সেখানে মিমার সিনান ফাইন আর্টস বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এই বিশ^বিদ্যালয়েই তিনি ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ধর্মগুরু হিসেবে কাজ করতে গিয়ে ‘আদনানসিলর’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। ভাইস ম্যাগাজিন তাকে ‘তুরস্কের সবচেয়ে কুখ্যাত কাল্ট নেতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। ২০১৮ সালে আদনান ওকতারকে প্রথমবারের মতো গ্রেপ্তার করা হয়। এর এক বছর পর তাকে অভিযুক্ত করা হয়। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০২১ সালে ওকতার ১ হাজার ৭৫ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন নিম্ন আদালতে। এ বছরের ১৭ নভেম্বর ইস্তাম্বুলের উচ্চ আদালত কুখ্যাত ধর্মগুরু ওকতার ও তার ১৩ সহযোগীকে সাড়ে আট হাজার বছরেরও বেশি কারাদণ্ড দিয়েছে।

এক কাল্ট নেতার উত্থান

আদনান ওকতার তার কিছু অন্ধ অনুসারী তৈরি করেছিলেন, যা তাকে কাল্ট নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা এনে দেয়। ৯০-এর দশকে ওকতার দুটি সংগঠন গড়ে তোলেন। বিলিম আরাস্তির্মা ভাকফি বা বিএভি (সায়েন্স রিসার্চ ফাউন্ডেশন)। ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনের মাধ্যমে ওকতার সৃষ্টিবাদের মতাদর্শ প্রচার করতেন। সায়েন্স রিসার্চ ফাউন্ডেশন প্রথমে পোশাক নিয়ে গবেষণার কাজ শুরু করে। পরে নারীদের জন্য আধুনিক ও ছোট পোশাক বানিয়ে ব্যবসায়ও নামে। ওকতারের অন্য সংগঠনটির নাম মিলি দেগারলেরি কোরুমা ভাকফি (জাতীয় মূল্যবোধ সংরক্ষণ)। ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠন বিভিন্ন নৈতিক বিষয় নিয়ে দেশীয় রীতিতে কাজ করে। ওকতার ২০০০ সালে পশ্চিমাদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করার জন্য ‘বড় ধরনের একটি প্রচারণা’ চালান। আদনান ওকতার সৃষ্টিবাদের মতাদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করতে ‘অ্যাটলাস অব ক্রিয়েশন’ নামে একটি বই লেখেন। হারুন ইয়াহিয়া ছদ্মনামে বিবর্তনবাদকে অস্বীকার করে লেখা বইটির হাজারো কপি তিনি পশ্চিমে পাঠান, যা তাকে পশ্চিমে দ্রুত পরিচিতি এনে দেয়।

বিবর্তনবাদের ঘোরবিরোধী ও বড় নিন্দুক ওকতার। আবার মুসলিম চিন্তাবিদ হিসেবে তিনিই প্রথম খ্রিস্টান ধর্মের বাণী-সংক্রান্ত সৃষ্টিবাদকে ইসলামে অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছেন, যা তাকে বিশ^ব্যাপী খ্যাতি এনে দিয়েছিল। ৮০-এর দশকে একজন জ¦ালাময়ী বক্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তখন ইহুদি, ফ্রিম্যাসনস ও চার্লস ডারউইনবিরোধী মতবাদ প্রচারে সোচ্চার ভূমিকায় দেখা গেছে তাকে। ৯০-এর দশকেই আরেকটি বিষয়ে ওকতারকে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখা যায়। তিনি আন্তঃধর্মীয় সংলাপে তৎপর হয়ে ওঠেন। ডারউইনবিরোধী ধর্মযুদ্ধের অংশ হিসেবে সৃষ্টিবাদী মতাদর্শের খ্রিস্টানদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তবে ২০২১ সালের দিকে ডানপন্থি ইসরায়েলিদের সঙ্গে তার সখ্য সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করেছিল সবাইকে। ১৯৯৬ সালে তার সংগঠন বিএভি থেকে প্রকাশিত হয় ‘দ্য হলোকাস্ট ডিসেপশন’। এই বইয়ে ওকতার দাবি করেন নাৎসিদের হলোকাস্ট মূলত ১৯৮০-এর দশকে তার ইহুদিবিরোধী ষড়যন্ত্রতত্ত্বের ধারাবাহিকতা ছিল।

নারী কেলেঙ্কারি

ওকতার তুর্কি টেলিভিশনে টকশো উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। ২০১১ সালে তিনি তার টেলিভিশন স্টেশন ‘এ৯’ প্রতিষ্ঠা করেন। যেখানে নিয়মিতভাবে তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ওপর নির্মিত তথ্যচিত্র সম্প্রচার করা হতো। শেষ বছরগুলোতে ‘এ৯’-এ তার ভাষায় ‘সত্যিকারের ইসলাম’ প্রচার করতে দেখা যায় আধ্যাত্মিক এই ধর্মগুরুকে। ২০১৮ সালে ওকতার গ্রেপ্তার হওয়ার পর ‘এ৯’ চ্যানেলটি বন্ধ করে দেয় পুলিশ। ইসলামি নীতি নিয়ে আলোচনার টকশোগুলোতে ওকতারকে ব্লিচ করা সব স্বর্ণকেশী স্বল্পবসনা নারীবেষ্টিত থাকতে দেখা যেত। যেখানে ওই তরুণীদের বর্তমান ও ধর্মীয় বিষয় নিয়ে ওকতারের সঙ্গে আলোচনা করতে যেমন দেখা যেত, তেমনি পপসংগীতের তালে তালে নাচতেও দেখা যেত। ইসলামি টকশোর জগতে এমন উপস্থাপন নজিরবিহীন।

ওকতারের ধর্মীয় সংগঠন আদনানসিলে সবার সামনে চলত ঠাট্টা-বিদ্রƒপ। কিন্তু তার অন্দরে ছিল যৌন নির্যাতন ও ধর্মীয় বিশ^াসচর্চার নামে জবরদস্তির এক অশুভ জগৎ। তার আশপাশে সব সময় সুন্দরী নারীদের ঘিরে থাকতে দেখা যেত। আদালতে স্বীকারোক্তিতে ওকতার বলেন, তার এক বা দুই নয়, এক হাজার ‘গার্লফ্রেন্ড’ রয়েছে। যাদের তিনি ‘বিড়ালছানা’ বলে ডাকতেন। অস্ট্রেলীয় সংবাদমাধ্যম টাউন্সভিলের প্রতিবেদন বলা হয়, সংগঠন চালানোর নামে ওকতার ১০০০ তরুণীকে জোর করে যৌনদাসী বানিয়ে তাদের ওপর অত্যাচার চালাতেন। এমনকি তার বিরুদ্ধে নারীদের জোরপূর্বক গর্ভনিরোধক ওষুধ খাওয়ানোর অভিযোগও ওঠে। তার রাজনৈতিক প্রভাব ছিল যথেষ্ট। ফলে সংগঠন ছেড়ে পালিয়ে কেউ রেহাই পেতেন না। তুরস্কের ধর্মীয় পণ্ডিত ও আন্দোলনকর্মী এডিপ ইউকসেল। যিনি ৮০-এর দশকে ওকতারের সহকর্মী ছিলেন। ভণ্ড এই ধর্মীয় গুরুর দীর্ঘ সাজাপ্রাপ্ত প্রসঙ্গে এডিপ ইউকসেল বলেন, কয়েক দশকের ‘উন্মাদ ধর্মচর্চা’র অপরাধের জন্য এমন শাস্তি তার পাওনাই ছিল। সংবাদমাধ্যম মিডলইস্ট আইকে তিনি বলেন, তিনি একজন দুষ্ট মানুষ। যিনি অসংখ্য সম্ভাবনাময় ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের অনেক তরুণের জীবন ধ্বংস করেছেন।’

চলচ্চিত্রকেও হার মানায়

ওকতারের সংগঠন আদনানসিলের সাবেক অনেক সদস্যই বারবার যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছিলেন। যাদেরকে সংস্থাটি ছেড়ে আসার পরও ধারাবাহিক নানা হয়রানি ও অবমাননার শিকার হতে হয়েছিল। আদনানসিলের সাবেক সদস্য ইবরু সিমসেক, যিনি যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার দাবি করেছিলেন। ২০২১ সালের মামলায় ওকতার সাজা পাওয়ার তুরস্কের টেলিভিশন পোস্তাকে সিমসেক বলেন, এই সাজার মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়ায় তিনি খুশি। ভণ্ড এই ধর্মীয় গুরুর সঙ্গে নিজের পরিচয়ের ঘটনা পোস্তার কাছে তুলে ধরেন ইবরু। ওকতারের সঙ্গে তার প্রথম পরিচয় ১৯৯৪ সালে। টেলিভিশনের একটি সুন্দরী প্রতিযোগিতায় তখন অংশ নিয়েছিলেন ইবরু। প্রতিযোগিতায় ইবরুকে দেখে ওকতারই তার কাছে প্রথম আসেন। তিনি বলেন, ‘পর্দায় আমাকে দেখে আদনান ওকতার যেন পাগল হয়ে গেলেন। তখন তিনি আমাকে বলেছিলেন, আমি তোমাকে পত্রিকায়, টেলিভিশনে দেখেছি। আমার খুব ভালো লেগেছিল। তুমি তোমার বাক্স-পেট্টা গুছিয়ে নাও। চলো আমার সঙ্গে আমার অসম্ভব সুন্দর প্রাসাদে থাকবে।’ ইবরু বলে চলেন, ওকতার তখন তাকে আরও বলেছিলেন, ‘আমার কাছে চলে আসো, আমি তোমাকে সবচেয়ে ভালো জীবনযাপনের ব্যবস্থা করে দেব। তুমি সবচেয়ে দামি ব্র্যান্ডের পোশাক পরতে পারবে, বিলাসবহুল জীবনও পাবে তুমি। সেখানে গিয়ে আমি বুঝতে পেরেছিলাম, তিনি যা করছেন তার সঙ্গে ধর্মের কোনোই সম্পর্ক নেই।’ পরে ওকতারের দল ছেড়ে দেন ইবরু। এরপরই তার বিরুদ্ধে ৩০০টিরও মানহানির মামলা করেন ওকতার। ওকতার তার প্রতি ‘মগ্ন’ ছিলেন বলে দাবি করেন ইবরু। যে কারণে তার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন ওকতার। একপর্যায়ে ইবরুর পেশাগত ও সামাজিক জীবন হুমকির মুখে পড়ে। তখন এই হয়রানি থেকে বাঁচতে বাধ্য হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান তিনি। নিজরে জীবনের সেই অগ্নিপরীক্ষার দিনগুলোর কথা জানিয়ে ইবরু বলেন, আপনি যদি এ ঘটনাকে চলচ্চিত্রে রূপ দেন, তবে তারা বলবে এটি অতিরঞ্জিত, তাই তারা দেখবে না হয়তো সেটা।

 দ্য মাহদি ওয়ার্স আরমানি

ওকতার ও তার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এ পর্যন্ত একটি মাত্র গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। যার নাম ‘দ্য মাহদি ওয়ার্স আরমানি : অ্যান এনালিসিস অব দ্য হারুন ইয়াহিয়া এন্টারপ্রাইজ’। সুইডেনের সদারটন বিশ^বিদ্যালয়ের পিএইচডি শিক্ষার্থী ও গবেষক অ্যান রোজ সোলবার্গ গবেষণাটি করেছেন। দ্য মাহদি ওয়ার্স আরমানির তথ্য মতে, ৭০-এর দশকে তুরস্কের অপেক্ষাকৃত ধনী ধর্মনিরপেক্ষ এক পরিবারে বেড়ে ওঠেন আদনান ওকতার। ১৯৭৯ সালে ইস্তাম্বুলের ফাইন আর্টস অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হন। মূলত সে সময় থেকেই তিনি ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। এই বিশ^বিদ্যালয়টিতেই একটি ছোট ধর্মীয় গোষ্ঠী বা দল গড়ে তোলেন ওকতার। যারা তাকে নেতা হিসেবে প্রথম অনুসরণও করতে শুরু করেন। মূলত ইসলামের পরিপূর্ণ একটি ব্র্যান্ড হিসেবে দলটি গঠন করেছিলেন ওকতার। সেজন্য তখন তিনি ইস্তাম্বুলের সবচেয়ে ধনী ও প্রভাবশালী তরুণদের তার মতাদর্শে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেন। ওই ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেকে ইহুদিবিরোধী, ফ্রিম্যাসনসরিবিরোধী, কমিউনিস্টবিরোধী ও ষড়যন্ত্রতত্ত্বনির্ভর এক আদর্শের বক্তা হিসেবে লিখে নিজের নামও প্রতিষ্ঠা করেন।

৮০-ওই দশকে ওকতার তার ভক্তদের নিয়ে যে দলটি গঠন করেন তার নাম আদনানসিলার (আদনানিস্ট)। যারা প্রভাবশালী কুর্দি মুসলিম পণ্ডিত সাইদ নুরসির অনুসারী ছিলেন। নুরসি এক পর্যায়ে তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের ইসলামি পুনরুজ্জীবন আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন। নুরসির সবচেয়ে প্রভাবশালী অনুসারী ছিলেন তুরস্কের আরেক ধর্মগুরু ফেতুল্লাহ গুলেন। ওকতার নিজেও পণ্ডিত সাইদ নুরসির ইসলামের আধুনিক চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়েছিলেন। ‘দ্য মাহদি ওয়ার্স আরমানি’তে বলা হয়েছে, ‘ওকতার সব সময় ঐতিহ্যবাহী সুন্নি ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করেছেন। কিন্তু তুরস্কে তাকে কখনোই একজন মুসলিম কর্র্তৃপক্ষ হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি। তাকে একজন ইন্টেরিয়র ডিজাইনার হিসেবেই দেখা হয়ে থাকে, যার আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় কোনো প্রশিক্ষণ নেই।’ ১৯৮৬ সালে ‘জাতীয় অনুভূতিকে দুর্বল বা ধ্বংস করার অভিযোগে ওকতারকে একবার গ্রেপ্তারও করা হয়।

দীর্ঘতম কারাবাস

আদনান ওকতারের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে চলতে থাকে বিতর্ক ও সমালোচনা। বিশেষ করে তার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন তুরস্কের ধর্মীয় নেতারা। ১৯৯৯ সালে ওকতার ও তার কয়েকজন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় তাদের বিরুদ্ধে অপরাধী সংগঠন ‘বিএভি’ তৈরির চেষ্টা করার অভিযোগ আনা হয়েছিল। যে সংগঠনের মাধ্যমে তারা ব্ল্যাকমেইল ও যৌন ফাঁদ পাততে চেষ্টা করে। ওকতার ও বিএভির বিরুদ্ধে দুই বছর আইনি প্রক্রিয়া চলে। ২০১৬ সালে গোপন সূত্রে তুর্কি পুলিশ জানতে পারে, সংগঠনের আড়ালে ওকতার অসামাজিক কর্মকাণ্ডের এক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। এরপরই ওকতারের বাংলো ও সংগঠনের দপ্তরে তল্লাশি চালায় পুলিশ। কিন্তু সেখানে কোনো কিছু না পাওয়ায় সেবার ব্যর্থ হতে হয় তাদের। পরের বছর ২০১৭ সালেও পুলিশের তল্লাশি চলে তার ডেরায়। তখন কোনো রকমে তিনি পুলিশের হাত থেকে পালিয়ে যান। তার সন্ধানে তল্লাশি জারি রাখে পুলিশ। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালে পালানোর সময় কয়েকশ অনুগামীসহ ওকতারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অপরাধী সংগঠন চালানো, নাবালিকাদের যৌন শোষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তার বাড়িতে চলে পুলিশের অভিযান। যে অভিযানে তল্লাশিতে বেরিয়ে আসে, ধর্মগুরুর ছদ্মবেশে আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র পরিচালনা করতেন ওকতার। এরপর তার অনলাইন ‘এ৯’ টিভি চ্যানেলও বন্ধ করে দেওয়া হয়। তিন বছর চলে শুনানি।  ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ১০টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন ওকতার। ওই অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল অপরাধী চক্রের নেতৃত্ব দেওয়া, জালিয়াতি, সামরিক ও রাজনৈতিক চরবৃত্তি ও শিশুদের ওপর যৌন নিগ্রহ। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে তুরস্কের নির্বাসিত ধর্মগুরু ফেতুল্লাহ গুলেনকে সহায়তার অভিযোগও রয়েছে। নিম্ন আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে প্রথমে ১ হাজার ৭৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু উচ্চ আদালতে সেই রায় খারিজ করে। আবার নতুন করে শুরু হয় বিচার। অবশেষে অবিশ্বাস্য এক শাস্তির ঘোষণা আসে ওকতারের বিরুদ্ধে। এ বছরের ১৭ নভেম্বর ইস্তাম্বুলের হাই-ক্রিমিনাল কোর্ট আদনান ওকতারকে ৮ হাজার ৬৫৮ বছর কারাদণ্ড দেয়।

আনাদোলু এজেন্সির তথ্য মতে, ওকতারের বিরুদ্ধে ওঠা অপরাধী সংগঠনের নেতৃত্ব দেওয়া, যৌন নির্যাতন, শিক্ষার অধিকার হরণ, মানসিক নির্যাতন, ব্যক্তিস্বাধীনতা খর্ব করা, কারও ব্যক্তিগত তথ্য রেকর্ড করাসহ একাধিক অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। এ অপরাধগুলোতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় তাকে একাই ৮৯১ বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়। অপরাধগুলো সংঘটনের সময় ওকতার তার সংগঠনে ব্যবস্থাপকের দায়িত্বে ছিলেন। তাই তাকে অন্য আসামিদের অপরাধের জন্যও দায়ী করা হয়েছে। তাই সব মিলিয়ে বিতর্কিত ধর্মগুরু ওকতারের সাজার মেয়াদ বেড়ে দাঁড়ায় রেকর্ড ৮৬৫৮ বছর, যা তুরস্কের কারাদন্ডের ইতিহাসে দীর্ঘতম রীতিমতো বিস্ময়কর। এই শাস্তির মধ্য দিয়ে ধর্মপ্রচারক, টেলিভিশন উপস্থাপক, লেখক ও একজন চলচ্চিত্র নির্মাতার একটি দীর্ঘ, বিকৃত ও বিতর্কিত জীবনের সমাপ্তির আভাস পাওয়া যাচ্ছে।



বার্তা সূত্র