Skip to content

৩৫ বছরের লালদুর্গ জঙ্গিপুর এখন সবুজে সবুজ, সংখ্যালঘু ভোট কাটাকাটিতে কি ফুটবে পদ্ম?

শাহজাদ হোসেন, জঙ্গিপুর: আটের দশক থেকে লালদুর্গ হিসেবে পরিচিত মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর লোকসভা কেন্দ্র। বিড়ি শ্রমিক ও সংখ্যালঘু অধ্যুষিতএই লালদুর্গে ফাটল ধরিয়েছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। কাস্তে-হাতুড়ি-তারা ছেড়ে হাত ধরেছিল এলাকার বাসিন্দা। তার পর ভাগীরথী দিয়ে অনেক জল বয়ে গিয়েছে। ভাঙনপ্রবণ এলাকার মাটিতে ফুটেছে জোড়াফুল। লোকসভা কেন্দ্র জুড়ে মা-মাটি-মানুষেরই রমরমা। তবে এবার সংখ্যালঘু প্রার্থী দিয়ে চমক দিয়েছে কংগ্রেসেও। আর দুই সংখ্যালঘু প্রার্থীর ভোট কাটাকাটিতে কি সুবিধা পাবে বিজেপি?

লোকসভা পরিচয়
মুর্শিদাবাদ জেলায় তিনটি লোকসভা-জঙ্গিপুর, মুর্শিদাবাদ ও বহরমপুর। ২০০৪ সালে আসন পুনর্বিন্যাসের জেরে জঙ্গিপুর লোকসভা থেকে বাদ পড়ে ফরাক্কা ও সামশেরগঞ্জ বিধানসভা। দুই বিধানসভা যুক্ত হয় দক্ষিণ মালদহ লোকসভায়। নয়া জঙ্গিপুর লোকসভা কেন্দ্র গঠিত হয় সুতি, জঙ্গিপুর, রঘুনাথগঞ্জ, লালগোলা, সাগরদিঘি, নবগ্রাম ও খড়গ্রাম বিধানসভা নিয়ে।

[আরও পড়ুন: জয়ের মাঝে কাঁটা! চেন্নাইকে হারিয়েও কড়া শাস্তির মুখে ঋষভ]

জনবিন্যাস
জঙ্গিপুর লোকসভার মোট ভোটার ১৬ লক্ষ ১৪ হাজার ৮১ জন। তার মধ্যে পুরুষ ভোটার ৮ লক্ষ ২৪ হাজার ১১৯ ও মহিলা ৭ লক্ষ ৮৯ হাজার ৯২১ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন মাত্র ৪১ জন। বুথ কেন্দ্র রয়েছে ১ হাজার ৭৬২টি। মোট ভোটারের ৬৩ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটার। ভোটারের মধ্যে ৩৭ শতাংশ হিন্দু (সাধারণ, তফসিলি ও আদিবাসী) এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ভোটার।

ইতিহাস
১৯৬৭ সালে জঙ্গিপুর লোকসভা গঠিত হয়। স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘদিন কংগ্রেসের দখলে ছিল এই লোকসভা। ১৯৬৭ সালে এই কেন্দ্র থেকে প্রথমবার সাংসদ নির্বাচিত হন কংগ্রেস প্রার্থী লুৎফল হক। ১৯৭২ সালেও তিনি জয়ী হন। ১৯৭৭ সালে সাংসদ হন কংগ্রেসের শশাঙ্ক সরকার সান্যাল।

১৯৮০ সাল থেকে পর পর সাতবার জয়ী হয়েছিল সিপিএম। প্রথম বার জয়লাভ করেন সিপিএম প্রার্থী জয়নাল আবেদীন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস প্রার্থী মহম্মদ ইদ্রিস আলির কাছে পরাজিত হন বাম প্রার্থী জয়নাল আবেদীন। সাংসদ ইদ্রিশ আলির অকাল প্রয়াণে উপনির্বাচনে এই কেন্দ্রে জয়ী হন সিপিএমের আবুল হাসনাৎ খান। ১৯৯৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে দ্বিতীয়বার সাংসদ হন আবুল হাসনাৎ খান।

২০০৪ সালে প্রণব মুখোপাধ্যায় সেই লালদুর্গে হানা দিয়ে কংগ্রেসের হাত প্রতীককে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। ২০০৯ সালে দ্বিতীয়বারের জন্য এই কেন্দ্র থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন তিনি। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই প্রণব মুখোপাধ্যায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় তিনি সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দেন। উপনির্বাচনে কংগ্রেস প্রার্থী করে প্রণবপুত্র অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়কে। ২০১২ সালের কংগ্রেস প্রার্থী অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় ২ হাজার ৩৩৬ ভোটে বামপ্রার্থী মোজাফফর হোসেনকে পরাজিত করে সাংসদ নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে দ্বিতীয়বার প্রার্থী হয়ে সাংসদ নির্বাচিত হন অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়। যদিও ২০১৯ সালের নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন তিনি। জয়লাভ করেন তৃণমূল প্রার্থী খলিলুর রহমান। দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে বিজেপির মাফুজা খাতুন। কংগ্রেস প্রার্থী অভিজিৎ তৃতীয় স্থানে নেমে আসেন। ২০১৯ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী খলিলুর রহমানের প্রাপ্ত ভোট ছিল ৫ লক্ষ ৬২ হাজার ৮৩৮, বিজেপি প্রার্থী মাফুজা খাতুন পেয়েছিলেন ৩ লক্ষ ১৭ হাজার ৫৬ টি ভোট। অপরদিকে কংগ্রেস প্রার্থী অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়ের প্রাপ্ত ভোট ছিল ২ লক্ষ ৫৫ হাজার ৮৩৬ টি। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী খলিলুর রহমানের জয়ের ব্যবধান ২ লক্ষ ৪৫ হাজার ৭৮২।

[আরও পড়ুন: ‘১৮ মাস অপেক্ষা করেছি’, এক হাতে ছক্কা হাঁকিয়ে তৃপ্ত ‘কামব্যাকের’ পন্থ]

গত এক দশকের রাজনৈতিক পরিস্থিতি

২০০৯ সালের লোকসভায় তৃণমূল জয়ের ধারা ঘাস শিবিরকে স্বস্তিতে রেখেছে। পঞ্চায়েত নির্বাচনে বড়সড় সাফল্য। বিধানসভার সাতটি কেন্দ্রে তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে। যদিও সাগরদিঘি বিধানসভা বিধায়ক মন্ত্রী সুব্রত সাহার অকাল প্রয়ানে উপনির্বাচনে বাম- কংগ্রেসের কাছে বড়সড় ধাক্কা খায় তৃণমূল। জোটের প্রার্থী বায়রন বিশ্বাস জয়লাভ করেন। যদিও তিনি বর্তমানে দলবদল করে শাসক শিবিরে। তৃণমূল কংগ্রেসের সংগঠন শক্তিশালী। বিরোধী কংগ্রেস, বাম ও বিজেপির সংগঠন সেই তুলনায় দুর্বল। এই কেন্দ্রে প্রায় ৪ লক্ষ ভোটার বিড়ি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। জঙ্গিপুর সাংগঠনিক জেলা তৃণমূলের সভাপতি বিদায়ী সাংসদ খলিলুর রহমান বিড়ি শিল্পপতি। জঙ্গিপুরের বিধায়ক জাকির হোসেন, সুতির বিধায়ক ইমানি বিশ্বাস, সাগরদিঘি বিধায়ক বায়রন বিশ্বাস বিড়ি শিল্পপতি। ফলে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত একটা বড় অংশের উপর শাসকদল সহজেই প্রভাব বিস্তার করতে পারছে বলে ওয়াকিবহাল মহলের মত।

খলিলুর রহমান,তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী। নিজস্ব চিত্র।

হালফিলের হালহকিকত

২০১৬ সালের পর জঙ্গিপুরের শাসকদলের সংগঠনের কাছে বিরোধীরা ধুলিসাৎ হয়ে যায়। বিরোধী শিবিরের একের পর নেতৃত্ব, জনপ্রতিনিধি ও কর্মী শাসক শিবিরের যোগ দিয়েছে। একদিকে তৃণমূলের জনমুখী উন্নয়ন। অপরদিকে বিরোধী শিবিরের সাংগঠনিক দুর্বলতা স্বস্তিতে কিছুটা শাসক শিবির। যদিও শাসক দলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, কাটমানি ও দীর্ঘদিন ধরে বিড়ি শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি না হওয়ায় ক্ষোভ রয়েছে জনমানসে। সেই ক্ষোভকে কাজে লাগাতে আসরে নেমেছে বিরোধীরা।

কংগ্রেস প্রার্থী মর্তুজা হোসেন বকুল। নিজস্ব চিত্র।

কেন্দ্রের প্রার্থী

জঙ্গিপুর লোকসভায় এবারও প্রার্থী করেছে তৃণমূল কংগ্রেস খলিলুর রহমানকে। তিনি জঙ্গিপুর সাংগঠনিক জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি। বর্তমানে বিদায়ী সাংসদ। বিড়ি শিল্পপতি। অপরদিকে বিজেপি প্রার্থী করেছে উত্তর মুর্শিদাবাদ সাংগঠনিক জেলার সভাপতি ধনঞ্জয় ঘোষকে। তিনি এবার নতুন মুখ। সক্রিয় আরএসএস কর্মী। এবার বিজেপি টিকিট দেননি মাফুজা খাতুনকে। অপরদিকে গত লোকসভার কংগ্রেস প্রার্থী প্রণবপুত্র অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় দলবদল করে তৃণমূলের সদস্য। কংগ্রেস এবার প্রার্থী করেছে লালবাগ মহকুমা কংগ্রেসের সভাপতি মর্তুজা হোসেন বকুলকে। তিনি প্রয়াত কৃষিমন্ত্রী আবদুর সাত্তারের নাতি। লালগোলার ছ’বারের প্রাক্তন বিধায়ক তথা মুর্শিদাবাদ জেলা কংগ্রেসের সভাপতি আবু হেনার ভাইপো।

ধনঞ্জয় ঘোষ, বিজেপি প্রার্থী। নিজস্ব চিত্র।

সম্ভাবনা
গত বিধানসভা ও পঞ্চায়েত নির্বাচনের ফলাফলের নিরিখে এগিয়ে রয়েছে তৃণমূল। লোকসভায় ৬৩ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোট রয়েছে। পাশাপাশি বিড়ি শ্রমিক ভোটার প্রায় চার লক্ষ। কংগ্রেস প্রার্থী সংখ্যালঘু হওয়ায় ভোট ভাগাভাগির ফলে বিজেপি এই কেন্দ্রে জয়ের স্বপ্নে বিভোর।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ



বার্তা সূত্র