‘স্বাধীনতা তুমি’ অমর কাব্যের রচয়িতা কবিপ্রধান শামসুর রাহমান প্রয়াণ দিবস আজ

অর্চনা ঘটক ** ” স্বাধীনতা তুমি রবি ঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান / স্বাধীনতা তুমি কাজী নজরুল, ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো মহান পুরুষ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কাঁপা-/ স্বাধীনতা তুমি শহীদ মিনারে অমর একুশে ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল সভা ”

কিংবা

” তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা,/ সাকিনা বিবির কপাল ভাঙলো,/ সিঁথির সিঁদুর মুছে গেল হরিদাসীর।/ তুমি আসবে বলে হে স্বাধীনতা,/ শহরের বুকে জলপাই রঙের ট্যাঙ্ক এলো/ দানবের মত চিৎকার করতে করতে…”। – কবিপ্রধান শামসুর রাহমান-এর অমর কাব্যের গাঁথা থেকে উৎকীর্ণ এই প্রিয় পঙতিমালা।

বাংলার মাটিকে মানুষের সুখের ঠিকানায় রূপান্তরের রাজনীতির মহাকবি, বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘অসম্ভব হলেও’ অকৃতার্থ-    মীরজাফরের দল আমাদের থেকে দূরে ঠেলে দেয়ার অপচেষ্টা চালিয়েছে অনেকদিন । একথা সত্য, মেধায়-মননে- বুকে সতত বহমান হলেও মুজিব আজ ৪৬ বছর রক্ত-মাংসের শরীর নিয়ে আমাদের মাঝে নেই।

অনেক আগেই চলে গেছেন রবীন্দ্রনাথ, নেই নজরুল, সুকান্ত কিংবা সৈয়দ শামসুলও। ১৫ বছর আগে হারিয়ে গেছেন কবিপ্রধান শামসুর রাহমান।

শেষোক্তদের চলে যাওয়া প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে হলেও পিতা শেখ মুজিবকে হারানোর বেদনা আমাদের ভিন্নতরো। কিন্তু এঁদের প্রস্হানের শূন্যতা সেও-কি পূরণ হওয়ার ? না হয়েছে? এমনভাবে মাটি-মানুষের স্বাধীনতাকে আর ক’জন ভাবতে  পারছি বা পেরেছেন ?

আগস্টের ১৭ তারিখ  আজকের এই দিনটিও আমাদের বেদনায় নীল হওয়ার। কারণ, আজ  সমসাময়িককালের ‘স্বাধীনতাপ্রিয় প্রধান কবি শামসুর রাহমান-এর প্রয়াণ দিবস । জাতির জনকের শাহাদাৎ বরণের শোকাবহ এই আগস্টেই তিনিও দেশের অজস্র মানুষকে অশ্রুসিক্ত করে ধরাধামের প্রীতি ছিন্ন করেন। কিন্তু স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষ কি তাঁকে ভুলতে পারে? না, ভোলেনি। তিনি তাঁর কাব্যপ্রতিভা দিয়েই স্বাধীনচেতা মানুষের মননে আজো স্বমহিমায় বিরাজমান। বাঙালি যতদিন থাকবে, সবুজবীথি-শ্যামলতা যতদিন,  ততদিন শামসুর রাহমান বিবর্ণ হবার নন ।

সমকালে বাংলাদেশ ও আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রধান কবি তিনি। জীবদ্দশাতেই শামসুর রাহমান  বাংলাদেশের প্রধান কবি হিসেবে মর্যাদালাভ করেছিলেন। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগ, তথা পঞ্চাশের দশকে তিনি আধুনিক কবি হিসেবে বাংলা কবিতায় আবির্ভূত হন। এবং অল্প সময়ের ভেতরেই দুই বাংলায় কবি হিসেবে পরিচিতি পান।

বাংলা সাহিত্যের  প্রধান এই কবি ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে মারা যান।

করোনা পরিস্থিতির কারণে দিবসটিতে আনুষ্ঠানিক কোনো আয়োজন নেই। তবে কবির পরিবার ও অনুরাগীরা তার কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।

১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর পুরান ঢাকার মাহুতটুলীতে জন্ম শামসুর রাহমানের। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পর তিনি পাঠকমহলে আলোচিত হন। তার লেখা ‘আসাদের শার্ট’ কবিতায় ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান যেন সচিত্র রূপ পায়।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে শামসুর রাহমান সপরিবারে তাদের পৈতৃক বাড়ি নরসিংদীর পাড়াতলী গ্রামে চলে যান। এপ্রিলের প্রথম দিকে তিনি লেখেন ‘স্বাধীনতা তুমি’ ও ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা’সহ বেশ কিছু কবিতা।

শামসুর রাহমানের ৬০টিরও বেশি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। কবি হিসেবে তাঁর পরিচয়ের পরিধি ব্যাপক হলেও শিশুতোষ, অনুবাদ, ছোটগল্প, উপন্যাস, আত্মস্মৃতি, প্রবন্ধ-নিবন্ধের গ্রন্থকার হিসেবেও তিনি ছিলেন অনন্য সাধারণ ।

সাংবাদিক হিসেবে কবি শামসুর রাহমান ১৯৫৭ সালে কর্মজীবন শুরু করেন দৈনিক মর্নিং নিউজ- পত্রিকায় । ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৮৭ সালে সামরিক সরকারের শাসনামলে তাঁকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। এরপর তিনি অধুনা নামের একটি মাসিক সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

শামসুর রাহমান আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, স্বাধীনতা পদকসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার পেয়েছেন।

১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর ঢাকার মাহুতটুলিতে জন্ম নেয়া এই কবিকে তার ইচ্ছানুযায়ী ঢাকার বনানী কবরস্থানে, মায়ের কবরের পাশে সমাহিত করা হয়।

*লেখক অর্চনা ঘটক, এশিয়া বার্তার লালমনিরহাট প্রতিনিধি এবং জছির উদ্দিন বিদ্যা নিকেতন-এর শিক্ষিকা *

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

সর্বাধিক পঠিত

সর্বশেষ সংবাদ