সীমান্ত হত্যা: অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে দায়ী করলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

বেনার নিউজ

সীমান্ত হত্যার পেছনে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে মূল কারণ উল্লেখ করে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেছেন, দুই দেশের যৌথ লক্ষ্য সীমান্তে “অপরাধ নয়, মৃত্যুও নয়” এ নীতির ওপর জোর দেয়া।

বৃহস্পতিবার ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি।

যে কোনো মৃত্যুই অনুশোচনীয়—এ কথা উল্লেখ করে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমাদের নিজেদের জিজ্ঞেস করতে হবে, সমস্যাটি কেন হচ্ছে এবং আমরা জানি সমস্যাটি কী? সমস্যা হচ্ছে অপরাধ।”

“সুতরাং আমাদের যৌথ উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ‘অপরাধহীন ও মৃত্যুহীন’ সীমান্ত। আমি নিশ্চিত, আমরা যদি এটা করতে পারি, অপরাধহীন ও মৃত্যুহীন সীমান্ত, তাহলে একসাথে এই সমস্যার সমাধান করতে পারব,” বলেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন বেনারকে বলেন, “এর অর্থ দাঁড়ায় তারা (ভারত) সীমান্ত হত্যা বন্ধ করবে না, এটা চলতে থাকবে।”

“পৃথিবীর এমন কোনো সীমান্ত নেই, যেখানে অপরাধ হয় না। আবার একটু কিছু অপরাধ হলেই মানুষ হত্যা করা হবে, এটাও পৃথিবীর কোথাও নেই,” বলেন তৌহিদ হোসেন।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এর আগে তারা সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার কথা বললেও হত্যা থেমে থাকেনি। সুতরাং তারা তখনও এটা মিন করেনি, এখনো মিন করছে না।”

ভারতের মানবাধিকার কর্মী বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চের (মাসুম) সাধারণ সম্পাদক কিরীটি রায় বেনারকে বলেন, “সীমান্তে অপরাধ রয়েছে ঠিকই। সরকার দেখাতে চাইছে গরু পাচার, মানুষ পাচার, মাদক পাচারের মতো অপরাধই সীমান্তে প্রাণক্ষয়ের জন্য দায়ী।”

সীমান্তে এই সব অপরাধ ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ করাচ্ছে—এ কথা দাবি করে তিনি বলেন, “আগে দুর্নীতিগ্রস্ত এই বাহিনীকে সংশোধন করা দরকার।”

কিরীটি রায় বলেন, “অপরাধ মোকাবেলার জন্য আইন রয়েছে। শাস্তির জন্য আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার পথে না গিয়ে হত্যার মতো অমানবিক পথ নেওয়া হচ্ছে।”

নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে ভারতের সীমান্তে অপরাধ ও হত্যার মতো অভিযোগ নেই জানিয়ে কিরীটি রায় বলেন, “এই দুটি দেশের সীমান্তে বিএসএফ নেই। সেখানে সীমান্ত প্রহরা দেয় সীমান্ত সুরক্ষা বল (এসএসবি)। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার সুযোগ নেই। কিন্তু বিএসএফের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অসংখ্য।”

ভারত বাংলাদেশ সীমান্তেও এসএসবিকে নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের প্রস্তুতি হিসেবে সোমবার একদিনের ঢাকা সফর করেন এস জয়শঙ্কর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে আগামী ২৬ মার্চ দু দিনের সফরে ঢাকা আসার কথা আছে নরেন্দ্র মোদির।

বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তিতে দুই দেশের মধ্যকার সংযোগ উন্নয়নেই নয়াদিল্লী গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান তিনি।

প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে পানি বণ্টন, বাণিজ্য সংযোগ, বিদ্যুৎ ও করোনা-পরবর্তী পরিস্থিতি উন্নয়নে সমঝোতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয় বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন।

সংযোগ উন্নয়নে গুরুত্ব ভারতের

সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সম্পর্কের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যা নিয়ে বর্তমানে দুই দেশ কাজ করছে না।

তিনি বলেন, “পঞ্চাশ বছরের সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় যোগাযোগকে বড় পরিসরে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। কানেক্টিভিটির (সংযোগ উন্নয়ন) এই জায়গাকে আমরা বড়ো লক্ষ্য হিসাবে ধরে এগোতে পারি।”

জয়শঙ্কর মনে করেন, “দুই দেশে কানেক্টিভিটির জায়গায় ঠিকমতো কাজ করতে পারলে পুরো অঞ্চলই বদলে যাবে; বঙ্গোপসাগরীয় এলাকাকে তখন অন্যরকম মনে হবে। আমরা দুই পক্ষই বিশ্বাস করি এটা সম্ভব।”

আজকের বৈঠকের বড়ো অংশজুড়ে এই বিষয়ে আলোচনা হয়েছে উল্লেখ করে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমরা চাইলে এক্ষেত্রে তৃতীয় কোনো দেশকেও এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে পারি।”

এক্ষেত্রে জাপানের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমাদের (বাংলাদেশ-ভারত) দুই দেশের সাথে জাপানের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। বঙ্গোপসাগরীয় এলাকায় জাপান অনেক কানেক্টিভিটি প্রকল্পে যুক্ত।”

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ এবং ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির প্রাসঙ্গিকতার মধ্যেই নিহিত উল্লেখ করে জয়শঙ্কর বলেন, “আমরা বাংলাদেশকে কেবল দক্ষিণ এশিয়াতেই নয়, বিস্তৃত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলেও একটি মূল প্রতিবেশী এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করি।”

এ কারণেই নিরাপত্তা, বাণিজ্য, পরিবহন ও সংযোগ, সংস্কৃতি, মানুষে-মানুষে সম্পর্ক থেকে শুরু করে জ্বালানি ও অভিন্ন সম্পদ এবং প্রতিরক্ষা সম্পর্কের যৌথ বিকাশসহ সব ধরনের ক্ষেত্রে অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণে কাজ চলছে বলে জানান তিনি।

যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এক্ষেত্রে ভারত সরকারের অবস্থান এখনো পরিবর্তন হয়নি।

“বৈঠকে আমরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। খুব শিগগির আমাদের সচিবদের বৈঠক রয়েছে। আমি নিশ্চিত, তারা এ বিষয়ে পরবর্তী আলোচনা চালিয়ে নেবেন,” বলেন তিনি।

বাংলাদেশে আসছেন মোদি

বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন।

তিনি বলেন, “এই মাসের শেষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর আমাদের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।”

“আমরা আনন্দিত, তিনি মুজিববর্ষ এবং স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী এবং ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ৫০ বছর পূর্তির আয়োজনে অংশ নেবেন,” বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেন, “কোভিড শুরু হওয়ার পর, এটি হবে প্রধানমন্ত্রী মোদির প্রথম বিদেশ সফর এবং বাংলাদেশে দ্বিতীয়।”

বৈঠক বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফর নিয়ে মূল আলোচনা হয়েছে।

এ সময় ভ্যাকসিন সরবরাহের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে মোমেন বলেন, এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।

দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “দুই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন কলকাতা থেকে পরিতোষ পাল।

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email