সাকিবকে হত্যার হুমকী: একটা বড় ব্যাধির ছোট উপসর্গ

ক্রিকেট অলরাউন্ডার সাকিবকে হত্যার হুমকিদাতা গ্রেপ্তার
ইমতিয়াজ মাহমুদ: (১) সাকিব আল হাসান মুসলমানের ঘরে জন্ম নিয়েছে, নিজে পারফর্মিং মুসলমান, হজ্বও করেছে। এখন সাকিব যদি কালি পূজা করে সেটা কি অপরাধ? আইনের চোখে তো সেটা কোন অপরাধ নয়। সাকিবের যদি ইচ্ছা হয় যে সে ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খৃস্ট ধর্ম গ্রহণ করে সেটা কি তার অপরাধ হবে? না, সেটা তার কোন অপরাধ হবে না। এই সবকিছুই খুবই সাধারণ কথা স্বাভাবিক বুদ্ধির কথা। এই কথাটা বুঝানোর জন্যে তো কোন জটিল তর্কের দরকার নাই। একজন মানুষ তার ব্যক্তিগত জীবনে ধর্ম বিষয়ে বা ইচ্ছা তাই করতে পারে- যে কোন ধর্মের অনুষ্ঠানে যেতে পারে, ইচ্ছে হলে নাও যেতে পারে, নিজ ধর্ম ত্যাগ করতে পারে, ভিন্ন ধর্ম গ্রহণ করতে পারে বা সকল ধর্ম ত্যাগ করে ধর্মহীন হতে পারে। এগুলি সবই ব্যক্তিগত বিষয়।
তাইলে মহসিন তালুকদার এতো ক্ষেপে গেল কেন? মহসিন তালুকদার কেনই বা তাকে হত্যার হুমকি দিতে গেল? কেন এই লোকটি সাকিব আল হাসানকে এইভাবে গালাগালি করতে গেল? এইটা কি কেবল মহসিন তালুকদারের ব্যক্তিগত অপরাধ প্রবণতা? এই ঘটনাটি কি কেবল একজন মহসিন তালুকদারের ঘটানো একটি অপরাধ মাত্র? নাকি এটা একটা বড় ব্যাধির ছোট উপসর্গ? এইগুলি একটু ভাববেন না আপনারা?
শুধু মহসিন তালুকদারই নয়, বাংলাদেশের একটা বড় অংশের মানুষই তো এইভাবেই আচরণ করেন। সকলে ঐরকম লম্বা দেশী অস্ত্র নিয়ে হুমকি দেয় না। কেউ কেউ অবিরাম অনলাইনে গালাগালি করতে থাকে। মেয়েদের ফটোর নিচে মন্তব্য করে, এই ইয়ে তোর হিজাব কই? অনলাইনে খবরের নিচে কমেন্ট করে, ইহুদী নাসারার দালাল, ভারতের দালাল, নাস্তিকদের কল্লা চাই, হিন্দুদেরকে দেশ থেকে বের করে দিতে হবে- এইরকম কতো কিছু। আমি কেবল শোভন ধরনের মন্তব্যগুলির কথা বললাম। কিন্তু এদের বেশীরভাগ মন্তব্যই অশ্লীল অপাঠ্য ও উচ্চারণের অযোগ্য। এইগুলি তো আপনারা দেখেছেন। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে সাম্প্রতিক হুমকি ও ধমক এইসবের কথা আপনারা জানেন।
(২)
এই যে বিপুল সংখ্যক লোক প্রতিদিন সমাজের সর্বত্র ওদের ধর্মবিরোধী আচরণ খুঁজতে থাকে আর সেরকম কিছু দেখলেই অনুভূতিতে আঘাত প্রাপ্ত হয়ে লোকজনকে গালাগালি করতে শুরু করে আর কখনো কখনো শারীরিকভাবে হামলা করে বা কখনো কখনো বিশাল বিশাল মিটিং মিছিল বা বিক্ষোভ কর্মসূচী শুরু করে- এদের বিপরীতে আমাদের রাষ্ট্র আমাদের রাজনীতিবিদগণ, আমাদের পণ্ডিতগণ, আমাদের সোশ্যাল ইন্টেলেকচুয়ালরা এরা কি বলেন? কি করেন?
দেখেন, দেশে একদল লোক আছে যারা ক্রমাগত বলতেই থাকেন যে ওদের বিশ্বাসের সাথে মিলে না এমন কোন আচরণ এই দেশে করা যাবে না। ওরা বলতে থাকে ওদের বিশ্বাসের সাথে মিলে না এমন আচরণ করলে ওরা মানুষকে মারবে, কাটবে, দেশ থেকে তাড়িয়ে দিবে এইরকম কতকিছু। এইসব কথা যারা বলেন তারা যে একজন দুইজন মানুষ সেটা তো নয়- অসংখ্য মানুষ এই প্রচার করে যাচ্ছে। করুক। ওদের মতামত ওরা বলবে, কেন বলবে না। বলুক। কিন্তু এর বিপরীতে যারা বলবে যে না, মতের ভিন্নতার জন্যে কাউকে আক্রমণ করা যাবে না, বলতে যে মানুষের বিশ্বাস ও বিশ্বাসভিত্তিক আচার আচরণ এগুলি ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়, ব্যক্তিগত মতামতের বিষয় সেখানে জোর জবরদস্তি করা যাবে না- ওরা কি সেই কথাগুলি বলছেন? বলতে পারছেন?
না। সেই কথাটা তো কেউ বলছেন না। অল্প কিছু লোক হয়তো বলেন, ওদের কণ্ঠ চাপা পড়ে যায় সংখ্যাগরিষ্ঠের উৎকট চীৎকার ও হুঙ্কারের নিচে।
কিন্তু এইসব কথা তো আমাদের স্কুলে মাদ্রাসায় ছেলেমেয়েদেরকে প্রতিদিন শেখানোর কথা। শিশুদেরকে তো শেখানোর কথা যে কেবল মাত্র ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে কেউ বড় হয় না বা ছোট হয় না। শেখানোর কথা ছিল যে সবারই অধিকার আছে তার পছন্দমত ধর্ম পালন করার বা একদম কোন ধর্মই পালন না করার। শিশুদের তো শেখানোর কথা ছিল যে একজন ধর্মীয় বিশ্বাস বা অবিশ্বাস বা তার ধর্মীয় আচরণ বা আচার সেসব আমার পছন্দ নাও হতে পারে, কিন্তু আমার কোন অধিকার নাই তাকে জোর করে কোন আচার পালন করতে বাঁধা দেওয়ার। এইসব কথা তো আমরা আমাদের স্কুলে কলেজে মাদ্রাসায় ছেল্মেয়েদেরকে শেখাচ্ছি না।
(৩)
কিন্তু অপরদিকে একদল লোক তো প্রতিদিনই বাচ্চাদের কানে বলে যাচ্ছে যে, আমার ভরমে অনুমোদন করে না এরকম আচরণ করলে তাকে মারতে হবে, কেউ অবিশ্বাস করলে তাকে হত্যা করা ওয়াজিব হয়ে গেছে। ওরা তো বলে যাচ্ছে যে বাংলাদেশে থাকতে হলে সবাইকে একটা বিশেষ বিশ্বাসকে সম্মান করে চলতে হবে নাইলে এই দেশে থাকতে দেওয়া হবে না।
স্কুল কলেজে মাদ্রাসায় তো আমরা বাচ্চাদেরকে ন্যুনতম গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বা সহনশীলতা তো শিখাচ্ছিই না, উল্টো যারা ঘৃণা ও অসহিষ্ণুতা শেখাচ্ছে ওদেরকেও প্রশ্রয় দিচ্ছি। ওরা যখন কাউকে আক্রমণ করে বা হুমকি দেয় তখন আমাদের নেতৃস্থানীয় লোকজন কি বলে লক্ষ্য করেছেন? ওরা তখন ডিফেন্সিভ ধরনের কথা বলে, ভাবোখানা যেন আক্রমণ বা হুমকি দেওয়া মন্দ কাজ নয়। এই যে বুড়িমারিতে একটা লোককে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পিটিয়ে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছে সেখানকার লোকজন। এরপর সরকারি বেসরকারি লোকজনের প্রতিক্রিয়া দেখেছেন? বলে কিনা যে, না, সেই লোক তো ধর্ম গ্রন্থ অবমাননা করেননি, বা না, লোকটা তো ইমানদার মুসলমান ছিল ইত্যাদি।
কাউকে বলতে শুনেছেন যে, না, সে যদি ধর্ম অবমাননা করেও থাকে তবুও তাকে হত্যা করা যাবে অন্যায়? আমি শুনিনি। এর মানে কি? এই যে সাকিব আল হাসানের উপর হুমকিটা দিয়েছে এই লোকটা, আপনি বিশিষ্ট কাউকে বলতে শুনেছেন যে না, সাকিব যদি কালি পূজা উদ্বোধন করেও বা সাকিব যদি কালি পূজা করে সেটা ওর ইচ্ছা, এটার জন্যে তাকে হুমকি দেওয়া অপরাধ? বলেছে কেউ? আমি শুনিনি। যদি কেউ বলেও থাকেন ওদের সংখ্যা নগণ্য। এর মানে কি?
এর মানে কি এই যে এটা এখন আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতি হয়ে গেছে যে কেউ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে কথা বললে তাকে হুমকি দেওয়া বা হত্যা করা জায়েজ? আমাদের নীতি কি তবে এই যে, সংখ্যাগরিষ্ঠের পছন্দ নয় এমন আচরন করলে তাকে গালাগালি করা হুমকি দেওয়া বা হত্যা করা জায়েজ?
(৪)
ধর্মে বিশ্বাস আর সাম্প্রদায়িকতার মধ্যে পার্থক্য কি? ধর্মে বিশ্বাস যার যার নিজের ব্যাপার, কিন্তু যখন আপনি আরেকজনের টুঁটি চেপে ধরে বলবেন যে আমার ধর্মই শ্রেষ্ঠ এর বিপরীতে কিছু বলা যাবে না- এটা সাম্প্রদায়িকতা। আপনি আপনার বিশ্বাসকে শ্রেষ্ঠ ও সঠিক মনে করেন, সেটা আপনার ইচ্ছা। কিন্তু আপনি যখন সেটা জোর করে অপরের উপর চাপাতে চাইবেন সেটাই সাম্প্রদায়িকতা। সাম্প্রদায়িকতা মন্দ জিনিস। এইজন্যে রাষ্ট্রকে বিশ্বাসসমূহের ঊর্ধ্বে থাকতে হয়। বঙ্গবন্ধু সেই নীতির কথা বলেছিলেন- ঠিকমতো বাস্তবায়ন হয়তো করতে পারেননি- কিন্তু নীতিগতভাবে তিনি একটা রাষ্ট্র গড়তে চেয়েছিলেন যেখানে সরকার ও রাষ্ট্র ধর্মসমূহের কোনটার পক্ষ নিবে না।
হুমকি দিয়েছে যে লোকটা, মহসিন তালুকদার, ওর বক্তৃতাটা শুনেছেন? আমি শুনেছেন। লোকটা পাকিস্তানের খেলোয়াড়দের উদাহরণ দিয়েছে। পাকিস্তানএর খেলোয়াড়দেরকে ওর পছন্দ- সাকিব কেন ওদের মত নয় এটা ওর রাগ। লোকটা মামুনুল হক ও আজহারি নামের দুজন মৌলানা সাহেবের কথা উল্লেখ করেছে। ওদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ওরা যেন সাকিবের মত আচরণ যাতে কেউ না করে সেটা দেখেন। লক্ষ্য করুন, এই লোকটা কাদের কাছ থেকে এই ‘আদর্শ’ পেয়েছে যে কোন মুসলমান যদি হিন্দুদের পূজায় যায় তাকে শাস্তি দিতে হবে। বিশেষ করে সেই পূজা যখন হচ্ছে ইন্ডিয়ায়। গালাগালি ও হুমকির ফাঁকে ফাঁকে যতটুকুই সে বলেছে, সেখানে দেখবেন একটা স্পষ্ট রাজনৈতিক লাইন।
সাকিব কেন ক্ষমা চেয়েছে। অনুমান করি সাকিব বুঝতে পেরেছে যে এইটাই আমার দেশের নীতি এইটাই আমাদের রাজনৈতিক লাইন এইটাই আমাদের সরকারেরও নীতি। সাকিব রাজনীতিতে আওয়ামীপন্থী, গত নির্বাচনে নমিনেশনও চেয়েছিল। আওয়ামী লীগ যেরকম প্রতিদিন হলফ করে বলে যে ওরা তাহাজ্জুত পড়া মুসলমানের দল, সাকিবও তাই করেছে- মাফ টাফ চেয়ে হলফ করে বলেছে সে ইমানদার মুসলমান, ভুল হয়ে গেছে, মাফ চাই ইত্যাদি।
(৫)
এইরকম একেকটা ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা যাবে? না, এইগুলি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এইগুলি হচ্ছে একটা বড় ব্যাধির ছোট ছোট উপসর্গ মাত্র। ব্যাধিটা আপনি চেনেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।