সহায় সংখ্যালঘু ভোট! ভরাডুবির হাত থেকে বাঁচলো তৃণমূল

নিজস্ব প্রতিনিধি: ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে উত্তরবঙ্গে বেশ ভালই সাফল্য পেয়েছিল তৃণমূল। উত্তরের ৫৪টি আসনের মধ্যে ২৪টি আসনে জয়ী হয়েছিল ঘাসফুল। কিন্তু তার ঠিক ৩ বছর পরে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে উত্তরবঙ্গের ৮টি লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে সবকটিতেই হারের মুখ দেখতে হয়েছিল তৃণমূলকে। সেই সময় ৭টি আসনে বিজেপি ও ১টি আসনে কংগ্রেস জয়ী হয়েছিল। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে একুশের ভোটযুদ্ধ ছিল তৃণমূলের কাছে সব থেকে কঠিন যুদ্ধ। সেই যুদ্ধেই কার্যত এবার সসম্মানে উতরে গেল তৃণমূল। সৌজন্যে অবশ্যই সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কের সমর্থন। কার্যত তাঁদের সমর্থনেই তৃণমূল উত্তরবঙ্গে তার হারানো মাটি ফিরে পেতে সক্ষম হয়েছে। বিনয়পন্থী নির্দল বিধায়কের সমর্থনে তৃণমূল ৫ বছর আগেকার সংখ্যাতেই ফের ফিরতে পেরেছে। মানে ২০১৬ সালে উত্তরবঙ্গে তৃণমূল ২৪টি আসন দখল করেছিল, এবারেও সেই সংখ্যাটা ২৪ ছুঁয়ে ফেললো।  

 

২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে উত্তরবঙ্গের জেলাগুলির মধ্যে কোচবিহারে সব থেকে বড় সাফল্য পেয়েছিল তৃণমূল। সেখানকার ৯টি আসনের মধ্যে ৮টি আসনেই জয়ী হয়েছিল ঘাসফুল। লোকসভা নির্বাচনে কিন্তু সেই জেলাতেই ভরাডুবি হয়েছিল তৃণমূলের। সেই সময়ে মাত্র ২টি আসনে লিড তুলতে পেরেছিল তৃণমূল। বাকি ৭টিতে লিড তুলেছিল বিজেপি। এবারেও কার্যত সেই একই ছবি ফিরেছে কোচবিহার জেলায়। ৫ বছর আগে এই জেলায় তৃণমূল যে সব আসন জিতেছিল তাঁদের মধ্যে এবারেও মাথাভাঙা ও সিতাই বিধানসভা কেন্দ্রে জয়ী হয়েছে তৃণমূল। গত লোকসভা নির্বাচনে জেলাতে এই দুই কেন্দ্রেই লিড তুলতে পেরেছিল তৃণমূল। এবারেও সেই কেন্দ্রে জয়ী হয়েছে তৃণমূল। তবে বাকি ছয়টি বিধানসভা কেন্দ্র মাথাভাঙা, শীতলকুচি, দিনহাটা, নাটাবাড়ি, কোচবিহার দক্ষিন ও তুফানগঞ্জে তৃণমূলকে হারতে হয়েছে বিজেপির কাছে। কোচবিহার উত্তর আসনটি গতবারে বামেরা জিতেছিল, এবারে সেই আসন গিয়েছে বিজেপির দখলে। আলিপুরদুয়ার জেলার ৫টি আসনের মধ্যে ২০১৬ সালে তৃণমূল জিতেছিল ৪টি আসনে। কেবলমাত্র মাদারিহাটে জয়ী হয়েছিল বিজেপি। এবারে তাঁরা মাদারিহাট ধরে রাখার পাশাপাশি কুমারগ্রাম, কালচিনি, আলিপুরদুয়ার ও ফালাকাটা আসনটিও তৃণমূলের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে বিজেপি। লোকসভা নির্বাচনেও এই ৫টি আসনে লিড তুলেছিল বিজেপি যা তাঁরা এবারেও ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

 

আবার জলপাইগুড়ি জেলার ৭টি আসনের মধ্যে ২০১৬ সালে তৃণমূল জিতেছিল ৬টি আসন। কেবলমাত্র কংগ্রেস জিতেছিল ১টি আসন। সেই আসনটি হল জলপাইগুড়ি। এবারে সেখানে জয়ী হয়েছে তৃণমূল। রাজগঞ্জ ও মাল বিধানসভা কেন্দ্রে ২০১৬ সালেও জয়ী হয়েছিল তৃণমূল। এবারেও তৃণমূল এই দুই আসন ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু তৃণমূলের দখলে থাকা ধূপগুড়ি, ময়নাগুড়ি, নাগরাকাটা ও ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি আসন চারটি এবার বিজেপি ছিনিয়ে নিয়েছে তাঁদের কাছ থেকে। তবে এরপরেও তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, তাঁরা এই জেলায় ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। কেননা লোকসভা নির্বাচনে এই জেলার সব আসনেই লিড তুলেছিল বিজেপি। সেই জায়গায় ৩টি আসন দখল করা কার্যত হারা মাটি ফেরারই ইঙ্গিত। তৃণমূলকে এবারেও ধাক্কা খেতে হয়েছে দার্জিলিং জেলায়। ২০১৬ সালেও এই জেলায় কোনও আসন পায়নি তৃণমূল। এবারেও সেই একই ছবি বজায় রইল। পাহাড়ে মোর্চার ভোট ভাগ হওয়ায় সেখানে জিতেছে বিজেপি। আর সমতলে কার্যত বাম কংগ্রেস ভোট বিজেপিতে চলে যাওয়ায় সেখানেও জয়ী হয়েছে বিজেপি। দার্জিলিং জেলায় ৫টি আসনেই এবার জয়ী হয়েছে বিজেপি। তবে কালিম্পংয়ে জয়ী হয়েছেন বিনয়পন্থী নির্দল প্রার্থী।

 

সেই হিসাবে দেখতে গেলে ২০১৬ সালের তুলনায় কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি জেলাতে এবারে ভরাডুবি হয়েছে তৃণমূলের। কিন্তু তাঁদের সেই ভরাডুবির পরেও উত্তরবঙ্গের বুকে তাঁদের মুখরক্ষা করেছেন দুই দিনাজপুর ও মালদা। উত্তর দিনাজপুর জেলায় ২০১৬ সালে তৃণমূল জিতেছিল ৪টি আসন। এবারে সেই ৪টি আসন ধরে রেখে তৃণমূল ইসলামপুর, চাকুলিয়া ও হেমতাবাদ আসনটি জিতে নিয়েছে বিজেপিকে হারিয়ে। অথচ ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই সব আসনে এগিয়ে ছিল বিজেপি। দক্ষিন দিনাজপুর জেলায় ২০১৬ সালে তৃণমূল পেয়েছিল মাত্র ২টি আসন। এবারে তা বেড়ে হয়েছে ৩। বাকি ৩টি গিয়েছে বিজেপির দখলে। কুমারগঞ্জ আসনটি তৃণমূল নিজেদের দখলে ধরে রেখে বামেদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে কুষমণ্ডি ও হরিরামপুর। কিন্তু তপন, গঙ্গারামপুর ও বালুরঘাট আসন তিনটিতে জয়ী হয়েছে বিজেপি। এর মধ্যে তপন ছিল তৃণমূলের দখলে। লোকসভায় অবশ্য এই ৬টি আসনেই লিড তুলেছিল বিজেপি।

 

মালদা বরাবরই তৃণমূল বিরোধী। তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকে মালদা তৃণমূলের বিরুদ্ধে রায় দিয়ে এসেছে। ২০১৬ সালে এই জেলা থেকে কোনও আসনই জেতেনি তৃণমূল। সব আসন গিয়েছিল বাম-কংগ্রেস জোটের ঝুলিতে। খালি একটি আসনে জিতেছিল বিজেপি। ২০১৯ সালের লোকসভাতেও মালদাবাসী ঘুরেও তাকায়নি তৃণমূলের দিকে। এক আসনে তাঁরা জিতিয়েছিল বিজেপিকে, অন্যটিতে কংগ্রেসকে। এবারে কিন্তু সেই ছবি বদলেছে। মালদাবাসী বিশেষ করে সংখ্যালঘুরা ঢেলে ভোট দিয়েছে তৃণমূলকে। আর তার জেরেই জেলার ৮টি আসনে জয়ী হয়েছে তৃণমূল। চাঁচোল, হরিশ্চন্দ্রপুর, রতুয়া, মালতিপুর, মানিকচক, মোথাবাড়ি, সুজাপুর ও বৈষ্ণবনগরে বাজিমাত করেছে তৃণমূল। বিজেপি জিতেছে ইংরেজবাজার, মালদা, গাজোল ও হব্বিবপুরে।

 

উত্তরবঙ্গের এই ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি ও শিলিগুড়ি মহকুমায় বিজেপির ভাল ফলের পিছনে কাজ করেছে রাজবংশীদের সমর্থন। তাঁরা ঢেলে ভোট দিয়েছেন বিজেপিকে। ডুয়ার্স এবং মালদার আদিবাসী ভোটও গিয়েছে বিজেপির পক্ষে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার চা-বাগান শ্রমিকদের উন্নয়নের জন্য, রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষের উন্নয়নের জন্য যা যা কিছু করেছেন তার কোনও প্রভাবই পড়েনি এবারের বিধানসভা নির্বাচনে। আবার উত্তরবঙ্গের সংখ্যালঘু ভোট গিয়েছে পুরো তৃণমূলের দখলে। যার জেরেই উত্তর দিনাজপুর ও মালদায় বাজিমাত করেছে তৃণমূল। তবে পাহাড়ে গুরুংয়ের ধাক্কা ও মোর্চা ভোট বিভাজনের জেরে ধাক্কা খেয়েছে তৃণমূলও। নাহলে পাহাড়ের বাকি দুটি আসনেও মোর্চাই জিততো যার লাভ পেত তৃণমূল। কার্যত সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কই এবার উত্তরবঙ্গে তৃণমূলকে অক্সিজেন যুগিয়ে বাঁচিয়ে দিয়েছে। নাহলে ভরাডুবির হাত থেকে তৃণমূলকে উত্তরবঙ্গে অন্তত কেউ বাঁচাতে পারতো না।



বার্তা সূত্র

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email