Skip to content

সঙ্গীতের কিংবদন্তি লতা মঙ্গেশকর

সঙ্গীতের কিংবদন্তি লতা মঙ্গেশকর

ভারত উপমহাদেশের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী লতা মঙ্গেশকর। মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে রবিবার সকালে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। সুর ও গানের ভুবনে প্রায় ছয় দশকের বেশি সময় ধরে তিনি একাই রাজত্ব করেছেন। প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে স্বতন্ত্র কন্ঠস্বর তাকে নিয়ে গেছে জনপ্রিয়তা ও খ্যাতির শীর্ষে। দুই হাজারেরও বেশি ভারতীয় চলচ্চিত্রে লতা মঙ্গেশকর গান করেছেন। এ ছাড়াও ভারতের ৩৬টি আঞ্চলিক ভাষায় ও বিদেশি ভাষায় গান গাওয়ার রেকর্ড আছে তার। ত্রিশ হাজারেরও বেশি গান গাইবার বিশ্ব রেকর্ডও রয়েছে তার ঝুলিতে।

লতা মঙ্গেশকর ১৯২৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ইন্দোর রাজ্যের (বর্তমানে মধ্যপ্রদেশ) রাজধানী ইন্দোরে এক মারাঠি পরিবারে জন্ম নেন। বাবা দীননাথ মঙ্গেশকর একজন বিখ্যাত শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী ও নাট্য অভিনেতা ছিলেন। প্রথমে লতার নাম রাখা হয় হেমা। হেমার জন্মের পাঁচ বছর পর দীননাথ অভিনীত এক নাটকের প্রিয় চরিত্র লতিকার নামানুসারে নাম বদলে রাখা হয় লতা। মা শেবন্তী একজন গুজরাতি নারী। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে লতা বড়। তার বাকি ভাইবোনেরা হলেন আশা ভোঁসলে, ঊষা মঙ্গেশকর, মীনা মঙ্গেশকর ও হৃদয়নাথ মঙ্গেশকর।

শৈশবে বাড়িতে থাকাকালে কে এল সায়গল ছাড়া আর কিছু গাইবার অনুমতি ছিল না লতার। তার বাবা চাইতেন লতা শুধু ধ্রপদী গান নিয়েই থাকুক। লতা পাঁচ বছর বয়সে বাবার কাছে ধ্রুপদী ঘরানার গানের তালিম নেন। পরবর্তীতে ওস্তাদ আমান আলী খান ও ওস্তাদ আমানত খানের মতো গুণী ব্যক্তিদের কাছেও তিনি তালিম নিয়েছেন।

লতা মাত্র ১৩ বছর বয়সেই তার ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন ১৯৪২ সালে, মারাঠি গান গেয়ে। মারাঠি ছবি “কিতি হাসাল”-এর জন্য। দুঃখজনক ঘটনা হলো, চূড়ান্ত সম্পাদনায় গানটি বাদ দেওয়া হয়।

১৯৪৬ সালে তিনি প্রথম হিন্দি সিনেমার জন্য গান করেন। বসন্ত জোগলেকরের “আপ কি সেবা মে” ছবিতে তিনি “পা লাগু কার জোড়ি” গানটি গেয়েছিলেন। দুই বছর পর সুরকার গুলাম হায়দার তাকে প্রথম বড় সুযোগ দেন।

চল্লিশের দশকে হিন্দি চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তিনি যখন সংগ্রাম শুরু করেন, সে সময়টায় ইন্ডাস্ট্রি দাপিয়ে বেড়াচ্ছিলেন শামসাদ বেগম ও নুরজাহানের মতো বিখ্যাত গায়িকারা।

১৯৪৯ সালে “আন্দাজ” সিনেমার জন্য গাওয়া গান তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। নার্গিস, ওয়াহিদা রেহমান থেকে শুরু করে কাজল, প্রীতি জিনতাসহ এ প্রজন্মের অনেক নায়িকার জন্যও গান গেয়েছেন লতা মঙ্গেশকর।

১৯৫৯ সালেই সপ্তাহে গড়ে ৩০টি করে গান রেকর্ড করতে হয়েছে তাকে। ১৯৭১ সালের মধ্যে ১ হাজার ৮০০ সিনেমার জন্য লতা মঙ্গেশকর রেকর্ড করেন প্রায় পঁচিশ হাজার গান। মহল (১৯৪৯), বারাসাত (১৯৪৯), সত্যম শিবম সুন্দারম (১৯৭৮) এবং ম্যায়নে পেয়ার কিয়া (১৯৮৯) চলচ্চিত্রগুলোকে বিশাল বাণিজ্যিক সাফল্য এনে দিয়েছিল লতার গাওয়া গান। এক অনুষ্ঠানে লতার গাওয়া দেশাত্ববোধক গান “এ্যায় মেরি ওয়াতান কি লোগ” ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহর লাল নেহেরুর চোখে পানি এনেছিল।

শুধু ভারতেরই নয়, কণ্ঠের জাদুতে তিনি জয় করেছেন সারা বিশ্বের সংগীতপ্রেমীদের মন। ভারতের অসংখ্য মানুষের কাছে এই শিল্পী রীতিমতো পূজনীয়। সাত দশকের বেশি সময় ধরে গানের সঙ্গে ছিলেন তিনি। ৩৬টি ভাষায় গান করেছেন লতা মঙ্গেশকর। এর মধ্যে আছে বাংলাও। “প্রেম একবার এসেছিল নীরবে”, “আষাঢ় শ্রাবণ মানে না তো মন”, “ও মোর ময়না গো”, “ও পলাশ ও শিমুল”, “আকাশপ্রদীপ জ্বেলে”সহ আরও অনেক বিখ্যাত বাংলা গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি।

আকাশছোঁয়া খ্যাতির পাশাপাশি অজস্র পুরস্কার, সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন লতা মঙ্গেশকর। পেয়েছেন অগণিত মানুষের ভালোবাসা। ভারতের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডক্টরেট খেতাব পেয়েছেন। ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ভারতরত্ন (২০০১), দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মবিভূষণ (১৯৯৯), তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মভূষণে (১৯৬৯) ভূষিত হয়েছেন। ২৩ বার শ্রেষ্ঠ প্লে–ব্যাক সিঙ্গার পুরস্কার অর্জন করেছেন।

মধ্যপ্রদেশ সরকার তাকে “তানসেন পুরস্কার” প্রদান করে। ভারত সরকার চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সম্মান “দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার (১৯৮৯)” প্রদান করে। শ্রেষ্ঠ নারী নেপথ্য কন্ঠশিল্পী বিভাগে তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন। তিনি শ্রেষ্ঠ নারী নেপথ্য কন্ঠশিল্পী বিভাগে ১৯৫৯ সালে থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত একটানা ফিল্মফেয়ার পুরস্কার অর্জন করেছেন। ১৯৭০ সালে নতুন প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে শ্রেষ্ঠ নারী নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী বিভাগে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন। পরবর্তীকালে ১৯৯৩ সালে ফিল্মফেয়ার আজীবন সম্মাননা পুরস্কার এবং ১৯৯৪ ও ২০০৪ সালে দুবার ফিল্মফেয়ার বিশেষ পুরস্কার অর্জন করেন। এই সংগীতশিল্পীকে ২০০৭ সালে ফ্রান্স সরকার তাদের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা লেজিওঁ দনরের অফিসার খেতাব প্রদান করে।

জানা যায়, কিংবদন্তি গায়িকা লতা মঙ্গেশকরের চিরকুমারী থেকে যাওয়ার পেছনে দুটি প্রধান কারণ রয়েছে। ১৯৪২ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর লতা ভাইবোনদের মানুষ করার কাজে এতটাই ব্রতী ছিলেন নিজের কথা ভাববার সময় কখনো পাননি। তারপরেও ভাই হৃদয়নাথ মঙ্গেশকরের বন্ধু রাজ সিং এসেছিলেন লতার জীবনে। রাজ সিং ছিলেন বোর্ড অফ কন্ট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়ার (বিসিসিআই) প্রাক্তন সভাপতি এবং প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটার। তারা ভালো বন্ধু ছিলেন। রাজ লতাকে মিঠু বলে ডাকতেন। বিয়ের পরিকল্পনাও করেছিলেন তারা। কিন্তু রাজ সিং রাজ পরিবারের সদস্য হওয়ায় সাধারণ ঘরের লতাকে বিয়ে করার ক্ষেত্রে রাজের বাবা বাঁধ সাধেন। রাজ তার বাবার সিদ্ধান্তকে মেনে নেন কিন্তু কখনো বিয়ে করেননি। লতা মঙ্গেশকরও রাজ সিংয়ের সিদ্ধান্তকে সম্মান করেছিলেন। তিনিও আর বিয়ে করেননি। ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর রাজ সিং মুম্বাইতে মারা যান। রাজ সিংয়ের মৃত্যু পর্যন্ত তারা দুজন বন্ধুত্ব বজায় রেখেছিলেন।

লতা মঙ্গেশকর সম্পর্কে কিছু চমকপ্রদ তথ্য

লতা মঙ্গেশকরের প্রথম উপার্জন ছিল ২৫ রুপি। প্রথমবার মঞ্চে গাওয়ার জন্য লতা ২৫ রুপি উপার্জন করেছিলেন।

যতীন মিশ্রের “লতা সুর গাথা” গ্রন্থে লতাজি বলেছেন, “প্রায়ই রেকর্ডিং করতে করতে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়তাম আমি আর ভীষণ খিদে পেত আমার। তখন রেকর্ডিং স্টুডিওতে ক্যানটিন থাকত, তবে নানা রকম খাবার পাওয়া যেত কি না সে বিষয়ে আমার মনে নেই। চা-বিস্কুট খুঁজে পাওয়া যেত তা বেশ মনে আছে। সারাদিনে এক কাপ চা আর দু–চারটে বিস্কুট খেয়েই সারাদিন কেটে যেত। এমনো দিন গেছে যে দিন শুধু জল খেয়ে সারাদিন রেকর্ডিং করছি, কাজের ফাঁকে মনেই আসেনি যে ক্যানটিনে গিয়ে কিছু খাবার খেয়ে আসতে পারি। সারাক্ষণ মাথায় এটাই ঘুরত যেভাবে হোক নিজের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে হবে আমাকে।”

এই গ্রন্থে আরেক স্থানে লতা বলেছেন, তাকে ভেবে “সত্যম শিবম সুন্দরমের” চিত্রনাট্য লিখেছিলেন রাজ কাপুর। “অনেক আগে উনি চেয়েছিলেন মুখ্য ভূমিকায় আমি অভিনয় করি। আমার ইচ্ছে না থাকায় আমি না করে দিয়েছিলাম ওই প্রস্তাবে। যদি ছবি তৈরিতে কোনো বাধা হয়নি। অনেক পরে ৮০র দশকে যখন আবার ছবিটি বানাবার কথা ভাবেন তখন জিনাত আমানকে নেন ছবিতে।”

১৯৫৮ সালে বিমল রায়ের “মধুমতী” ছবির জন্য সেরা গায়িকা নির্বাচিত হন লতা। অর্জন করেন ফিল্মফেয়ার পুরস্কার। কিন্তু স্টেজে উঠে পুরস্কার গ্রহণ করতে তিনি অস্বীকার করেন। কারণ ট্রফিটি দেখতে ছিল একজন নগ্ন নারীর মতো। তখন আয়োজকেরা রুমাল দিয়ে সেই ব্ল্যাক লেডিকে ঢেকে দিলে লতা পুরস্কারটি গ্রহণ করেন।

লতা মঙ্গেশকরকে একবার হত্যার চেষ্টাও করা হয়েছিল। ১৯৬২ সালে লতা মঙ্গেশকরকে বিষ খাইয়ে ধীরে ধীরে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে গিয়েছিলেন। ভারতের বর্ষীয়ান লেখিকা পদ্মা সাচদেবের “লতা মঙ্গেশকর: অ্যায়সা কাহা সে লাঁয়ু” বইয়ে লতার জীবনের এই মারাত্মক ঘটনার কিছু অংশ বর্ণনা করা হয়েছে।

পদ্মা সাচদেব তার বইয়ে লিখেছেন, “লতাজি আমাকে এই ঘটনা বলেছিলেন। ১৯৬২ সালে একদিন খুব সকালে তিনি প্রচণ্ড পেটব্যথা অনুভব করেন এবং বেশ কয়েকবার বমি করেন। তার ব্যথা এত তীব্র ছিল যে, তিনি হাত-পা নাড়াতে পর্যন্ত পারছিলেন না। তার বয়স তখন ৩৩ বছর।” সে সময় চিকিৎসক জানান কেউ সম্ভবত বিষপ্রয়োগ করে লতা মঙ্গেশকরকে হত্যার চেষ্টা করছেন। এরপর অনেক দিন গায়িকা গরম খাবার খেতে পারতেন না। বরফের টুকরা মেশানো তরল খাবার তাকে খেতে হতো।

সূত্র: ভয়েজ অব আমেরিকা