Skip to content

সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা ৫ দিন নাকি ৩৬৫ দিন?

সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা ৫ দিন নাকি ৩৬৫ দিন?

এ বছর পহেলা অক্টোবর থেকে ৫ অক্টোবর, পাঁচ দিন দুর্গাপূজা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ ১১ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে শারদীয় দুর্গাপূজার পাঁচ দিন দেশের পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রাসঙ্গিক বিষয়ে এক সভা করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সভায় আমন্ত্রিত হয়ে উপস্থিত ছিলেন প্রশাসন ও সরকারের সব নিরাপত্তা বিভাগের সর্বোচ্চ কর্মকর্তারা। লক্ষ্য- দুর্গাপূজার পাঁচ দিন নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বিধান। দুস্কৃৃতকারী বা বিশেষ কোনো গোষ্ঠী যেন নূ্যনতম সুযোগও নিতে না পারে। সভায় পূজা পরিষদের নেতাদেরও আমন্ত্রণ জানিয়ে একদিকে তাঁদের পরামর্শ জানতে চাওয়া হয়, অন্যদিকে পূজার পাঁচ দিনের নিরাপত্তা বিধানে পূজা কমিটির করণীয় ও সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়।
আবহমানকাল থেকে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের বারো মাসে তেরো পার্বণের প্রধান ধর্মীয় পার্বণ শারদীয় দুর্গাপূজা।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ। সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে রাষ্ট্র কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করবে না। এটি সংবিধানের মৌলিক বিধান। রাষ্ট্র ও সরকার সাংবিধানিক এই বিধান লালন-পালনে শুধু আন্তরিকই হবে না; প্রয়োজনে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করবে সব অপশক্তি দমন ও নিধনে। আমাদের রাষ্ট্র ও সরকারও জনগণের শক্তিতেই দশভুজা। তবে সরকারের দশ শুধু নয়; শত সহস্র হাত এবং প্রতিটি হাতই আইন দ্বারা সুসজ্জিত। এই হাত সমাজের রল্প্রেব্দ রল্প্রেব্দ ঘাপটি মেরে থাকা বা প্রকাশ্যে দাপিয়ে বেড়ানো এবং প্রায়শ তা থেকেও দুর্ধর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের বলে বলীয়ান ও তাদের ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা সব অশুভ শক্তি ও গোষ্ঠীকে দমনে রাখবে। প্রয়োজনে বিনাশ করে সমাজ ও জনগণকে নিরাপদে রাখবে- এটাই প্রত্যাশা।
কিন্তু এই হাত কখনও যদি হয় মনোজাগতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ অথবা পক্ষপাতদুষ্ট কিংবা নীরব দর্শক, তবে তা অশুভ শক্তিকে শুধু উৎসাহিতই করে না; সমাজের প্রতিটি স্তরে সেই অশুভ শক্তি মহামারির মতো সংক্রমিত হয় এবং কার্যত হচ্ছেও তাই। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, রাষ্ট্র এবং সরকার যদি এ বিষয়ে কঠোর হয় তবে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’-এর ফাঁকফোকর দিয়ে সমাজবিরোধী সন্ত্রাসী অপশক্তি দু’একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটাতে পারে। কিন্তু বছরব্যাপী সারাদেশে প্রতিমা ভাঙা, মন্দিরে আগুন দেওয়া, দেবস্থল দখল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লুট, ধর্ষণ ও জোর করে ধর্মান্তরের মতো ঘটনা ঘটতে পারে না। এর সঙ্গে গত ১০-১৫ বছর যাবৎ নতুন সংযোজন ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ এবং ‘হেট স্পিচ;। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অসত্য ও মিথ্যা অভিযোগ এনে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া, সর্বস্ব লুটপাটের মতো ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। দুর্ভাগ্য, প্রতিটি ঘটনাই পরিকল্পিতভাবে ঘটানো এবং এর মদদদাতারা চিহ্নিত হলেও তারা অনেক ক্ষেত্রে থাকে জামিনে। পক্ষান্তরে জেলের অভ্যন্তরে পচে মরে নির্দোষ অভিযুক্ত ও তার আত্মীয়স্বজন। প্রশাসনের আত্মপক্ষ সমর্থনের অকাট্য যুক্তি- জামিন তো দেন আদালত; আমাদের কিছুই করণীয় নেই। তার চেয়েও দুর্ভাগ্য, যখন বলা হয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের রসরাজকে বাঁচিয়ে রাখতেই তাকে জেলে রাখতে হয়েছিল বছরের পর বছর। মুক্ত করে দিলে দুস্কৃতকারীরা তাকে মেরে ফেলত। এখানেই শেষ নয়। আরও এক ধাপ এগিয়ে প্রশাসন চার্জশিটে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মামলায় রসরাজকেই প্রধান আসামি করেছে। ফলে নাসিরনগরের সেই গরিব ও প্রান্তিক জেলে পরিবারের নির্দোষ রসরাজকে চট্টগ্রামে গিয়ে ডিজিটাল আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে প্রতি মাসে বা দু’মাস অন্তর।
প্রশাসন আন্তরিক হলে যে এর ব্যতিক্রমও হয়- তার প্রমাণ মুন্সীগঞ্জের গণিত শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডল। ধর্মীয় অনুভূতিতে কথিত আঘাতের অভিযোগে মামলা করলেও পরবর্তী সময়ে একই প্রশাসন চার্জশিটে সত্য ঘটনা তুলে ধরায় আদালতের রায়ে হৃদয় চন্দ্র মণ্ডল নির্দোষ প্রমাণিত হন এবং তাঁরই স্কুলে সসম্মানে ফিরে আসেন। গত বছর দুর্গাপূজার সময় কুমিল্লার ঘটনা আরেক মাত্রিক। কে বা কারা দুর্গা মণ্ডপে প্রতিমার পাশে হনুমানের কোলে পবিত্র কোরআন শরিফ রেখে যায়। সঙ্গে সঙ্গে ভাইরাল হওয়া এই ‘ফুটেজ’ কার্যত দুস্কৃৃতকারীর পক্ষে আরও উত্তেজক অনুষঙ্গ হয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছিল, যা পরে ২৭টি জেলায় সংঘটিত নারকীয় সন্ত্রাসের প্রধান উৎস।
প্রতিবছর দুর্গাপূজার ৫ দিনে নিরাপত্তা বিধানে সরকার যতটা উদগ্রীব ও আন্তরিক, তা অবশ্যই সাধুবাদযোগ্য। কিন্তু ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় বছরের বাকি ৩৬০ দিন একইভাবে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। রাষ্ট্র ও সরকার বছরের ৩৬৫ দিনই অপশক্তি দমনে আন্তরিকভাবে সচেষ্ট হোক এবং কার্যকর থাকুক- এটি শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ই নয়; সব নাগরিকের প্রত্যাশা।
কাজল দেবনাথ: উপদেষ্টা ও সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ
kajaldebnath48@gmail.com



বার্তা সূত্র