Skip to content

শেখ হাসিনার ৪১ বছরের নেতৃত্বে অনন্য উচ্চতায় দল

শেখ হাসিনার ৪১ বছরের নেতৃত্বে অনন্য উচ্চতায় দল

টানা ৪১ বছর আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিয়ে দলকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। ১৯৭৫ সালের পট পরিবর্তনের পর ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের নেতারা দলকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতে তাকে সর্বসম্মতিক্রমে দলীয় সভাপতি নির্বাচিত করেন। বিদেশে ছয় বছরের নির্বাসিত জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে তিনি ১৯৮১ সালের ১৭ মে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। এরপর টানা ৯ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর দায়িত্ব সফলভাবে পালন করছেন। দলকে ক্ষমতায় এনেছেন চার বার। মৃত্যু ভয়কে পায়ের ভৃত্য করে সততা, প্রজ্ঞা, দক্ষ আর দূরদর্শী নেতৃত্বগুণে শেখ হাসিনা অনেক আগেই দেশের গণ্ডি পেরিয়ে স্থান করে নিয়েছেন বিশ্ব নেতৃত্বের কাতারে। আজ আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় সম্মেলনেও সভাপতি নির্বাচিত হচ্ছেন তিনি। সারা দেশ থেকে আগত কাউন্সিলররা আওয়ামী লীগকে পরিচালনার ভার তুলে দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে।

‘উন্নয়ন অভিযাত্রায় দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের উন্নত, সমৃদ্ধ ও স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ২২তম ত্রিবার্ষিক জাতীয় সম্মেলন আজ। সকাল সাড়ে ১০টায় ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শান্তির প্রতীক পায়রা উড়িয়ে সম্মেলনের উদ্বোধন করবেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতীয় পতাকা ও দলীয় পতাকা উত্তোলনের পর কেন্দ্রীয় নেতারা মঞ্চে আসার পর আধঘণ্টা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করা হবে। এতে তুলে ধরা হবে আওয়ামী লীগের ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং সরকারের উন্নয়ন ও সাফল্য। এরপর বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ শেষে শোক প্রস্তাব উত্থাপন করবেন দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া। সাধারণ সম্পাদকের প্রতিবেদন উপস্থাপন করবেন ওবায়দুল কাদের। স্বাগত বক্তব্য দেবেন অভ্যর্থনা উপকমিটির আহ্বায়ক শেখ ফজলুল করিম সেলিম। শেখ হাসিনার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের প্রথম অধিবেশন শেষ হবে।

বৈশ্বিক সংকটের কারণে এবারের সম্মেলনে ব্যাপক জৌলুস পরিহার করা হয়েছে। তবে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলের সম্মেলনকে কেন্দ্র করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে বর্ণিল সাজে সাজানো হয়েছে। পদ্মা সেতুর ওপরে নৌকার আদলে তৈরি করা হয়েছে ৮২ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৪৪ ফুট প্রশস্তের মঞ্চ। মূল মঞ্চের উচ্চতা সাত ফুট। সাংস্কৃতিক পর্বের জন্য তৈরি হয়েছে আলাদা মঞ্চ। সম্মেলন ঘিরে সারা দেশেই দলটির মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে। বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। সম্মেলনে সারা দেশ থেকে ৭ হাজার কাউন্সিলর এবং লক্ষাধিক ডেলিকেটসহ আমন্ত্রিত অতিথিরা অংশ নেবেন। প্রথম অধিবেশন শেষে নামাজ ও দুপুরের খাবারের বিরতির পর বিকাল ৩টায় কাউন্সিলরদের নিয়ে দ্বিতীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন চত্বরে। এই অধিবেশনে দলের আগামী তিন বছরের জন্য সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন করা হবে। দলের নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন প্রথমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী আহ্বান করবে। কোনো পদে একাধিক প্রার্থী থাকলে ভোট হবে। ভোটের জন্য স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স এবং ব্যালট পেপারও সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে একাধিক প্রার্থী না থাকলে প্রস্তাব ও সমর্থনের মাধ্যমে শীর্ষ দুই নেতৃত্ব নির্বাচন করা হবে। এরপর কাউন্সিলরদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরে দলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করবে নবনির্বাচিত সভাপতি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সভাপতি নির্বাচিত হচ্ছেন—সেটা নিশ্চিত। তার রানিংমেট সাধারণ সম্পাদকসহ ৮১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের পুরো টিম সাজানোর দায়িত্বও কাউন্সিলররা শেখ হাসিনার ওপর অর্পণ করবেন। কারণ তিনি দলটির সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তি।



তবে দলমত-নির্বিশেষে সবার কৌতূহল, কে হচ্ছেন আওয়ামী লীগের পরবর্তী সাধারণ সম্পাদক? ওবায়দুল কাদেরের হ্যাটট্রিক, নাকি চমক দেওয়ার মতো অন্য কেউ? জানা গেছে, সাধারণ সম্পাদক পদে এবারও পরিবর্তন হচ্ছে না! ২০১৬ সালে আওয়ামী লীগের ২০তম কাউন্সিলে সাধারণ সম্পাদকের পদ পান ওবায়দুল কাদের। ২১তম কাউন্সিলে তিনি পুনর্নিবাচিত হন।

জানা গেছে, এবার সম্মেলনে গঠনতন্ত্রে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসছে না। তবে গঠনতন্ত্র সংশোধন করে মহিলা শ্রমিক লীগকে দলের ভাতৃপ্রতীম সংগঠনের মর্যাদা দেওয়া হতে পারে। কেন্দ্রীয় কমিটির আকার বাড়ছে না। আগের মতোই কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ হবে ৮১ সদস্যের। জেলা, উপজেলা ও মহানগর কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার সময় বেঁধে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ। সম্মেলনে কোনো কমিটির সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণার পরে ৪৫ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ করতে হবে। এই বিধানটি গঠনতন্ত্রে সংযুক্ত করা হতে পারে। ঘোষণাপত্রে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় থাকবে। এছাড়া বর্তমান গঠনতন্ত্রের কিছু ভুল বানান ঠিক করাসহ বেশ কিছু সংশোধনী আনা হবে। ৮১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির মধ্যে চারটি সদস্য পদ শূন্য রয়েছে।



এবার বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের আওয়ামী লীগের সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বাংলাদেশে অবস্থিত বিভিন্ন বিদেশি কূটনৈতিকরা আমন্ত্রণপত্র পেয়েছেন। তবে বিদেশের কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের এবার আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে না। বৈশ্বিক পরিস্থিতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক মন্দার কারণে সম্মেলনে এবার বড় আয়োজন হচ্ছে না। একদিনেই শেষ হচ্ছে সম্মেলনের কার্যক্রম। সম্মেলনের মূলমঞ্চে চার সারিতে চেয়ার সাজানো হয়েছে। প্রথম সারিতে দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা এবং সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বসবেন। দ্বিতীয়টিতে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, সিনিয়র নেতা ও প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাকি দুটিতে বসবেন কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। মোট ১২০টি চেয়ার রাখা হবে। মঞ্চে বর্তমান সরকারের উন্নয়ন ও অগ্রগতির চিত্র থাকবে। পেছনে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবি থাকবে। সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের ছবিও থাকবে। আরও থাকবে জাতীয় চার নেতার ছবিসহ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, শামসুল হক এবং মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের ছবি। সম্মেলনে প্রবেশের জন্য পাঁচটি গেট থাকবে। এর মধ্যে একটি ভিআইপি গেট থাকবে। চারটা গেট থাকবে কাউন্সিলরদের প্রবেশের জন্য। সকাল ৭টা থেকে কাউন্সিলর-ডেলিগেটদের প্রবেশের গেট খুলে দেওয়া হবে। ৫০ হাজার মানুষের আপ্যায়নের ব্যবস্থা থাকবে। সম্মেলনস্থলে ৩৫ হাজার মানুষের বসার ব্যবস্থা থাকবে। সম্মেলন উপলক্ষে ১০০ চিকিৎসক নিয়ে ১২টির মতো প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্র প্রস্তুত করেছে স্বাস্থ্য উপ-কমিটি। দেশের মানুষ কষ্টে আছে ভেবেই এবার সম্মেলনে সাজসজ্জা করা হয়নি। এবার বাজেট ৩০ লাখ কমিয়ে ৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা অনুমোদন করা হয়েছে। তবে পর্যাপ্ত পরিমাণ এলইডি মনিটর থাকবে, যেখানে সম্মেলনের কার্যক্রম দেখা যাবে।



পথ পরিক্রমায় আওয়ামী লীগের ৭৩ বছর: ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন রোজ গার্ডেনে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামে। ১৯৫৬ সালে ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত দলীয় কাউন্সিলে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’ নামকরণের মাধ্যমে দলটি অসাম্প্রদায়িক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নামকরণ হয় ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’। এখন দলটি প্রতিষ্ঠার ৭৩ বছর পার করছে। এ পর্যন্ত দলের ২১টি জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৪৯ সালে ২৩ ও ২৪ জুন পুরান ঢাকার কেএম দাস লেনের ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেনে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে প্রথম জাতীয় সম্মেলনে প্রতিনিধি ছিল প্রায় ৩০০ জন। উদ্বোধনী ভাষণ দেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। পরে প্রতিনিধিদের সমর্থনে ৪০ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। এই সম্মেলনে সভাপতি নির্বাচিত হন মওলানা ভাসানী, সাধারণ সম্পাদক হন শামসুল হক। তখন তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন কারাগারে বন্দি। বন্দি অবস্থায় তাকে সর্বসম্মতিক্রমে প্রথম কমিটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ১৯৫৩ সালে ৩, ৪ ও ৫ জুলাই ঢাকার মুকুল সিনেমা হলে দলের দ্বিতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি এবং শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক হন। দুই দিনব্যাপী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলন ২০১৬ সালের ২২ ও ২৩ অক্টোবর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে শেখ হাসিনা সভাপতি ও ওবায়দুল কাদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সম্মেলন হয় ২০১৯ সালের ২০ ও ২১ ডিসেম্বর। পাকিস্তান আমলে আটটি আর স্বাধীন বাংলাদেশে ১৩টি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। অতীতের সম্মেলনগুলোতে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে কার্যনির্বাহী কমিটি পর্যন্ত নির্বাচিত হয়েছেন শত শত নেতা। আওয়ামী লীগের ৭৩ বছরে সভাপতি হয়েছেন ছয় জন। সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন ৯ জন।  চারবার সভাপতি হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ চারবার করে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জিল্লুর রহমান। তাজউদ্দীন আহমেদ টানা তিন মেয়াদে দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তাজউদ্দীন আহমদ তিনবার; আবদুর রাজ্জাক, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী ও ওবায়দুল কাদের দুইবার করে; প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক ও আবদুল জলিল এক বার করে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭২ সালের পর থেকে কেউই টানা তিন বার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হননি।



জাতীয় নির্বাচনি দিক-নির্দেশনা থাকবে: এবার সম্মেলনের মাধ্যমে দলে বঙ্গবন্ধু পরিবারের আরও কয়েক জন সদস্য কেন্দ্রীয় কমিটিতে আসছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। দলের সিনিয়র নেতাদের আলোচনায় এমন গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। তারা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে এলে সম্মেলনে বড় চমক হবে বলে মনে করছেন অনেকে। জানা গেছে, দলের জাতীয় কাউন্সিল থেকেই ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনি দিক-নির্দেশনা এবং দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য আওয়ামী লীগ কী কাজ করবে, সেসব বিষয়গুলো নেতাকর্মীদের জানানো হবে। এবারের সম্মেলনে ২০৪১ সালের মধ্যে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয় তুলে ধরা হবে।



বার্তা সূত্র