Skip to content

লোহাডাংগার তুরীরা

লোহাডাংগার তুরীরা

লোহাডাংগার লবানু সিং, ছবি: সালেক খোকন

শহর থেকে আসা বাসগুলো মুল্লুক দেওয়ানের কাছে এসেই থেমে যায়। বাসের ভেতর থেকে যাত্রীরা কবরের দিকে ছুঁড়ে দেন মানতের পয়সা। ঝন্ ঝন্ শব্দে মাজারের নিরবতা ভাঙ্গে। পাকা রাস্তার একপাশে মুল্লুক দেওয়ান আর অন্যপাশে তার বজরার মাঝির কবর। বিষ্ণুপুরবাসীর বিশ্বাসে মুল্লুক দেওয়ান সত্যপীর। 
 

দানের পয়সা আর সরকারি অর্থে মুল্লুক দেওয়ানে তৈরি হয়েছে একটি এতিমখানা। এতিমখানার পাশেই বেশ পুরনো একটি পুকুর। পুকুরপাড়ে বাবরি দোলানো সারি সারি লিচু গাছ। চারদিকে গা ছমছমে পরিবেশ। ভোর হতে না হতে বাতাসে ভেসে বেড়ায় কোমলমতি বাচ্চাদের কণ্ঠে তেলওয়াতের সুর। 
 

মাঝে মাঝে কোন বিপদগ্রস্থ জনকে নিরবে চোখের পানি ফেলেতে দেখা যায় মুল্লুক দেওয়ানে। মোমবাতি আর গোলাপজল ছিটায় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরাও। সবার বিশ্বাস, ‘মুল্লুক দেওয়ান  কাউকে খালি হাতে ফেরায় না’।এরকম নানা বিশ্বাসের গল্প নিয়ে যুগ যুগ ধরে মুল্লুক দেওয়ান বেঁচে আছেন বিষ্ণুপুরবাসীর মনে। 
 

মুল্লুক দেওয়ানের অপর পাশেই লোহাডাংগা। সেখানে বাস করে আরেক বিশ্বাসের মানুষেরা। যাদের মনে মুল্লুক দেওয়ান নেই।আছে বিশহরি, কারমা, জিতিয়া, মশান কালি, শশ্মান কালির মতো দেবতারা। গ্রামের সকলের কাছে এরা শিং সম্প্রদায়। কিন্তু আসলে তারা ‘তুরী’ আদিবাসী। নিয়ম মেনে এরা পূরুষদের নামের শেষে ‘শিং’ আর মেয়েদের নামের শেষে ‘বালা’ বা ‘দেবী’ টাইটেল ব্যবহার করে।
 

তুরীদের খোঁজ পেয়ে রওনা হই লোহাডাংগার দিকে। এ গ্রামটি দিনাজপুরের বিরল উপজেলায়। পাকা রাস্তার দুদিকে মাটি আর ছনে ছাওয়া বেশ কয়েকটি বাড়ি। মধ্য দুপুর। বাড়িগুলো তাই পুরুষশূন্য। একটি বাড়ির ভেতরে বেশ আয়েস করে আড্ডা দিচ্ছে নারীরা। নিজেদের মধ্যে তারা কথা বলছে বাংলা মেশানো কোন এক ভাষায়। এটি কোন ভাষা? উত্তরে মিলে মুচকি হাসি। পাশ থেকে বাসন্তি বালা উত্তর দেয়, ‘হামে তুরী জাতি, হামারা ভাষা তুরী’।
খানিক সৌজন্যমূলক কথা বলে গ্রামটির ভেতরে ঢুকে পড়ি। প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি বাড়ি এখানে। একটি বাড়ির কাছে এসেই থমকে দাঁড়াই। ভেতরে দরদ দিয়ে বিশহরির গান গাইছে কয়েকজন। 
 

‘সাইয়া পাড়া লোক দূর্গা
মোর বাজে গাইয়ো গো
সাদ গুরু বান্দা মাইগে
জয়া বিশহরি,  
 

বাড়ির ভেতর ঢুকতেই থেমে যায় গান। একটি টুল টেনে বিনীত ভঙ্গিতে গোত্রের মহত লবানু শিং আমাদের বসতে দেন। বাড়ির ভেতর মাটি উঁচু করে তৈরি করা হয়েছে ছোট্ট একটি জায়গা। পাশেই সন্ধ্যা তারা ফুলের গাছ। লবানু জানায় এটি তাদের ‘তুলসি থান’ বা ‘প্রার্থনার স্থান’। তুলসি গাছ না থাকলেও যে কোন একটি ফুলের গাছ সেখানে লাগাতে হয়। এটাই আদিবাসী তুরীদের রীতি। প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাড়ির নারীরা সন্ধ্যা প্রদীপ দেয় এখানে। তাই সন্ধ্যা হলেই শাশুড়ী বাড়ির বউদের খোঁজ করেন। তুরী ভাষায় বলেন, ‘বউয়ে, তুলসি থানোন সানবাতি দে, ধুম জ্বালায়ে দে’।
লবানু জানায় তাদের পূর্বপুরুষদের কথা। আদিবাসী তুরীরা এখানে বাস করছে ব্রিটিশ আমলেরও আগে থেকে। ভারতের ভাগলপুরে এখনও বসবাস অনেক তুরী আদিবাসীদের। এক সময় এখানে ছিল তুরীদেরই ৪টি গ্রাম। কালের আবর্তে নানা কারণে এখন টিকে আছে শুধুমাত্র একটি পাড়া।
 

কৃষিকাজ এ আদিবাসীদের প্রধান পেশা। কিন্তু স্বাধীনতা লাভের পর থেকে তাদের পূর্বপুরুষদের জমিগুলো বেদখল হতে থাকে। এখন অধিকাংশ জমিই স্থানীয় ভূমিদস্যুদের দখলে। ফলে এখন তুরীরা অন্যের জমিতে চাষাবাদের পাশাপাশি অনেকেই নাউয়া গিরি (নাপিতের কাজ)করছে। 
এ আদিবাসীদের গোত্র পরিচালনায় থাকে চার সদস্যের পরিষদ। লবানু শিং একে একে বলতে থাকেন পদের নামগুলো: মন্ডল, মহত, বাসি, ছড়িদার। গোত্রের মন্ডল মোহনা শিং মারা যাওয়ায় মহত লবানুই মহতের কাজ করছেন। লবানু ছাড়া এখন পরিষদের কেহই আর বেঁচে নেই। বাসি পদের ছোট্ট শিং আর ছড়িদার পদের পাতলা শিংয়ের মৃত্যুর পর এখানকার তুরীরা তাদের পরিষদকে আর পূর্ণগঠিত করেননি। গোত্রের রাসেন শিংয়ের মতে তুরীদের কাছে মন্ডল বা মহত ছাড়া এখন আর অন্য পদগুলোর কার্যকারিতা নেই। সময়ের সাথে সাথে ভেঙ্গে গেছে আদিবাসী তুরীদের সমাজ কাঠামোও।
 

গোত্রের মন্ডল মোহনা শিংয়ের মৃত্যুর পর এখানকার তুরীরা পালন করেছে নানা আচার। সে কথাগুলোই বলতে থাকে লবানু। আদিবাসী তুরীদের কারো মৃত্যু হলে তাকে গোসল করিয়ে সাদা কাপড় পরিয়ে মাটি চাপা দেয়া হয়। বাড়ি থেকে লাশ নিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে একটি মাটির হাড়িতে গোবর গুলিয়ে নেয় তুরীরা। অতঃপর গোটা পাড়ার বাড়িগুলোতে ছিটিয়ে দেয় তারা। গোবর শেষ হলেই হাড়িটিকে নিয়মমাফিক বাড়ির মধ্যেই ভেঙ্গে ফেলতে হয়। 
অন্যান্য আদিবাসীদের মতো তুরীদের মৃত্যুর পর ৭ দিন পর্যন্ত এরা তরকারীতে হলুদ খেতে পারে না। ১৩ দিনের দিন বাড়িতে এরা নাপিত ডেকে এনে সবার চুল ও দাড়ি কামিয়ে দেয় এবং মহিলাদের কানি আঙ্গুলের নখ হালকা ভাবে ঘষে দেয়। তাদের বিশ্বাস এতে শুদ্ধি ঘটে। এরপর চলে খাওয়া দাওয়ার পর্ব। তুরীদের ভাষায় এটি ‘ক্রিড়িয়া’।
 

লবানু শিংয়ের সাথে কথা বলতে বলতেই সেখানে তুরীদের ভিড় জমে। পরিচয় দিতে গিয়ে কথা হয় খিড়ো বালা, বিজলী বালা আর দুলালী বালার সাথে। তাদের থেকে জানা যায় তুরীদের সবচেয়ে বড় উৎসব কারমা পূজার কথা। মুলত এটি গাছের পূজা। আদিবাসী কড়াদের মতোই বন থেকে কেটে আনা বিরল প্রজাতির খিল কদম গাছের পূজা করে এরা।
ভাদ্র মাসে হয় করমা পূজাটি। পূজার পূর্বে মেয়েদেরকে তার স্বামীর বাড়ি থেকে দাওয়াত করে নিয়ে আসে তার ভাই ও বাবা। তাই ভাদ্র মাসে চারদিকে যখন কাশ ফুল ফুটতে থাকে তখন মেয়েদের মনে বাবার বাড়ি যাওয়ার আনন্দের ঢেউ লাগে। এই আকুতি নিয়ে করমা পূজার সময় দলবেধে তারা গায় নানা গান।
 

আমাদের শোনাতে খিড়ো বালা সুর করে গাইতে থাকে-
‘কাশি ফুলা ফুটেই গেলে
আসা মরা লাগি গেলে 
ভাইয়া বাপা লেগেল আতে বেটিক
কারমা পূজাকে রাতে।’
পাশ থেকে বিজলী বালা ধরেন আরেকটি গান-
‘করম ডাল,করম ডাল
চল শশুড়ায়ে
ভাদ্র মাসে বিয়া হতে গো
আনে ঘুরায়ে।’
 

তুরীদের কণ্ঠে গান শুনছিলাম একমনে। হঠাৎ পাশের বাড়িতে একটি লোকের আর্তচিৎকার। আমরা প্রায় দৌঁড়ে চলে গেলাম মহতের পাশের বাড়িটিতে। সেখানে সাপে কাটা এক রোগীর শরীর থেকে বিষ নামাচ্ছিল মহতেরই ভাই সবানু সিং। বিশেষ ভঙ্গিতে পরছেন তুরী ভাষায় মন্ত্র:
 

‘এখানি পুসকেননি চারি খানি ঘাট
তাতে দিনু পদ্মার পাত
পদং কুমারী মা-বাপার নাম-জয় বিশহরি
নাব বিষ নাব
বত্রিশে গড়ে গড়ে নাব
নিচ থাকি উপারে যদি ধাউবো
দোহার লাগে-শিব, দুর্গা, কার্তিক, গনেশের মাথা খাবো।’
 

কারমা পূজা ছাড়াও তুরীরা বিশহরি পূজা করে ধুমধামের সাথে। পূজার সময় সারা বছর সাপে কাটা রোগীদের কাছ থেকে হাঁস সংগ্রহ করা হয়। অতঃপর হাঁসগুলোকে বিশহরির সন্তুষ্টি লাভের জন্য বলি দেয়া হয়। হাঁস কেন? এরকম প্রশ্নে সবানু মুচকি হাসে। উত্তরে বলে, ‘হাসো পর বিশহরি বেটলেছে’। এ আদিবাসীদের বিশ্বাস বিশহরি বা মনসা দেবী হাঁস পছন্দ করেন। তাই হাঁসের মাথায় বিশহরি বসে থাকে।
 

সবানু জানায় বিশহরির পূজা হয় পহেলা ভাদ্রে। পূজার পরেরদিন এ গ্রামের তুরীরা ‘তুমরী খেলা’র আয়োজন করে। এ খেলায় মাঠের মধ্যে একটি সাপ ছেড়ে দেয়া হয়। সাপ ছাড়ার পর দুজন মন্ত্র পাঠ করতে থাকে। যার মন্ত্রে সাপ দ্রুত চলে আসে এবং বশ্যতা স্বীকার করে তাকেই জয়ী ধরা হয়।
 

লোহাডাংগার আশেপাশের গ্রামগুলোর আদিবাসীদের অধিকাংশই অভাবের কারণে সুবিধা লাভের আশায় খ্রীস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে। তুরীদের কাছেও এসেছে ধর্মান্তরিত হওয়ার নানা প্রলোভন।অভাব অনটনের মধ্যেও সেসব প্রলোভনে পূর্বপুরুষদের জাত বিক্রি করতে রাজি নয় তারা। খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করছেন না কেন? এমন প্রশ্নে খিড়ো বালা ক্ষেপে যায়। প্রতিবাদের সুরে তুরী ভাষায় বলনে, ‘হামিরি ধর্ম হামে চেলবে, তরনিক ধর্ম লিয়ে হামে নে চলবে, হামে খাটিয়ে খাবে, জাতি নে মারবে’।
 

অন্য রকম শ্রদ্ধা নিয়ে আমরা তাকিয়ে থাকি ক্ষিপ্ত ও প্রতিবাদি খিড়ো বালার দিকে। মনে মনে বলতে থাকি স্বজাতীয় চেতনা নিয়ে যুগে যুগে বেঁচে থাকুক আদিবাসী তুরীরা।
 

বার্তা সূত্র