Skip to content

রোহিঙ্গা সংকটে ফেসবুকের ইন্ধন ও ক্ষতিপূরণ

রোহিঙ্গা সংকটে ফেসবুকের ইন্ধন ও ক্ষতিপূরণ

পশ্চিম মিয়ানমারের না য়েন্ত চেঞ্জ নামে একটি গ্রামে আমার জন্ম। সেখানে আমার শৈশব ছিল আনন্দময় ও শান্তিপূর্ণ। আমার চালু দোকান ছিল। ছোটবেলায় আমি কোনো সাম্প্রদায়িক সহিংসতা দেখিনি। প্রতিবেশীদের সঙ্গে আমাদের বড় কোনো সমস্যা ছিল না। যদিও আমরা ছিলাম রোহিঙ্গা মুসলমান এবং তারা ছিল রাখাইন বৌদ্ধ। যেমন পার্শ্ববর্তী রাখাইন গ্রামে আমার অনেক বন্ধু ছিল। আমাদের গ্রামের মধ্যকার খেলার মাঠে আমরা তাদের সঙ্গে প্রায়ই চিনলোন (বল দিয়ে খেলা) খেলতাম। তাদের সঙ্গে আমরা খুব মজা করতাম। আশাপ্রদ ও আনন্দের সেই মনোরম জীবন এখন দূরবর্তী স্মৃতি ছাড়া আর কিছুই নয়।

 রোহিঙ্গা গ্রামে ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’-এর পরিপ্রেক্ষিতে ছয় বছর ধরে আমি বাংলাদেশের কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে বাস করছি। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবির। প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা এখানে বাস করছে। বাঁশ ও ত্রিপল দিয়ে তৈরি ছোট ছোট ঘরই আমাদের আশ্রয়স্থল।
আমাদের এই পরিণতির জন্য ফেসবুক তথা এর কোম্পানি মেটাও দায়ী। ফেসবুক মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে আমাদের ওপর নিপীড়নের পথ তৈরি করে দিয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিটি ফেসবুক পেজে রোহিঙ্গাবিরোধী সেন্টিমেন্ট তৈরি করে। ফেসবুক তার অ্যালগরিদমের মাধ্যমে প্রপাগান্ডা ছড়ানোর পরিণতিতে আমাদের ওপর সহিংসতার নির্মমতা নেমে আসে।
এটা সত্য, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা ও রাখাইনদের মধ্যে উত্তেজনার ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, স্মার্টফোন ও ফেসবুক আসার আগে আমাদের ও রাখাইনদের মধ্যে বড় কোনো শত্রুতার ঘটনা ঘটেনি। এগুলো ব্যবহার করে রাজনৈতিক ও ধর্মীয়ভাবে গোঁড়া মানুষেরা আমাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর সুযোগ পাওয়ার পর থেকেই পরিস্থিতি জটিল রূপ নিতে শুরু করে।

আমি মনে করি, ২০১২ সালে ফেসবুক প্রথম ঘৃণার উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তখন আমার বয়স ছিল মাত্র ১১ বছর। সে সময় বৌদ্ধ এক মেয়েকে ধর্ষণ ও হত্যার জন্য রোহিঙ্গাদের একটি দলকে অভিযুক্ত করা হয়। এমন জঘন্য কাজ কে করেছে, তা বের করা যায়নি। কিন্তু প্রমাণের অভাবে মানুষ রোহিঙ্গাদের ওপরেই দোষ চাপাচ্ছিল। আমাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর জন্য ফেসবুক সাধারণ জায়গা হয়ে ওঠে। এর পর আমি দেখলাম, রাখাইনে প্রতিবেশী, ভালো বন্ধুদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শীতল হতে শুরু করে। তার কয়েক বছর পর ২০১৬ সালের শেষের দিকে ফেসবুকের মাধ্যমে রোহিঙ্গাবিরোধী সেন্টিমেন্ট তৈরি হয়। ফেসবুক রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যে নিপীড়নকে উৎসাহ ও বৈধতা দিয়েছিল, তার সরাসরি প্রভাব পড়ে আমাদের পরিবারের ওপর। আমার বাবা এবং আর্থিকভাবে সচ্ছল কিছু রোহিঙ্গার বিরুদ্ধে পুলিশ স্টেশনে আক্রমণ করার মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়। এ কারণে তাদের অনেক অর্থ জরিমানা করা হয়। জরিমানা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় আমার চাচা আবু সুফিয়ান ও তাঁর ছেলেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে এবং বিচার ছাড়াই জেলে পুরে রাখে। এর পর থেকে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ ও ইসলামবিদ্বেষী পোস্ট ফেসবুকে সাধারণ বিষয় হয়ে ওঠে। আমি ফেসবুকে এমন বার্তা দেখেছি, যেখানে বলা হয়, ‘‘আমাদের দেশকে রক্ষা করো এবং অবৈধ ‘বাঙালিদের’ বিতাড়িত করো’’। এমনকি নির্দিস্ট একটি বার্তায় বলা হয়, ‘অবৈধদের জন্মহার খুব বেশি। আমরা যদি এমনটি হতে দিই, শিগগিরই আমাদের দেশের প্রেসিডেন্ট হবে দাড়িওয়ালা’। এর মাধ্যমে রাখাইন বন্ধুদের সঙ্গে আমাদের চিনলোন খেলার দিন সত্যি শেষ হয়ে যায়।

আমি ফেসবুককে এসব বার্তার ‘রিপোর্ট’ করি। কিন্তু যারা দায়িত্বে ছিলেন তারা কিছুই করেননি। শুধু দাবি করা হয়, ওইসব উদ্দেশ্যপূর্ণ বিদ্বেষপূর্ণ পোস্ট ও বার্তা ‘(ফেসবুকের) কম্যুনিটি স্ট্যান্ডার্ড ক্ষুণ্ন করে না।’ তার পরই শুরু হয় হত্যা, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের শুরুতে যা আমরা দেখেছি। তখন আমার বয়স ছিল ১৫ বছর। আমি ভালো শিক্ষার্থী ছিলাম এবং আইনজীবী হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। সেদিন আমি আমার ম্যাট্রিক পরীক্ষার পড়ার জন্য খুব সকালে উঠি। হঠাৎ গুলির শব্দ শুনি। শব্দ আসছিল গ্রামের পুলিশ স্টেশন থেকে। কী করব বুঝে উঠতে পারিনি। তাই ঘরেই অবস্থান করলাম। তিন ঘণ্টা ধরে এই গুলির শব্দ হচ্ছিল। এর মধ্যেই এলো সামরিক বাহিনীর সদস্যরা। যখন আমরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম, তখন জানলাম, স্থানীয় বাজারের মোহাম্মদ শামীম নামে এক দোকানদারকে হত্যা করা হয়েছে। তার লাশ রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেছি। কিছু পরিবার পরদিনই বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য যাত্রা শুরু করে। কিন্তু আমরা প্রথমে থাকার সিদ্ধান্ত নিলেও পরিস্থিতির ভয়াবহতায় বেরিয়ে পড়ি। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অবশেষে বাংলাদেশে পৌঁছি।

আমাদের এই পরিণতির জন্য ফেসবুকও কম দায়ী নয়। আমাদের রোহিঙ্গা ছাড়াও আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো ফেসবুককে সতর্ক করেছিল। কিন্তু ফেসবুক তখন গুজব ও বিদ্বেষপূর্ণ বার্তা বন্ধ করতে ব্যবস্থা নেয়নি। যাহোক, এখন জাকারবার্গ ও ফেসবুক-সংশ্লিষ্টদের কক্সবাজার এসে আমাদের অবস্থা দেখা উচিত। গণহত্যায় যারা মারা গেছে তাদের ফেসবুক এখন ফিরিয়ে দিতে পারবে না। কিংবা মিয়ানমারে আমরা যা রেখে এসেছি তা ফেরত দিতে পারবে না। কিন্তু জাকারবার্গ এখনও আমাদের সাহায্য করতে পারেন। তিনি আমাদের মতো তরুণদের জন্য তহবিল জোগাড় এবং আমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য সাহায্য করতে পারেন। তাঁর কোম্পানি আমার মতো মানুষদের যে ক্ষতি করেছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে এটা খুব সামান্য, যা তাঁর পক্ষে সহজেই করা সম্ভব।

মং সায়েদুল্লাহ: কক্সবাজার শিবিরে থাকা রোহিঙ্গা শরণার্থী; আলজাজিরা থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক



বার্তা সূত্র