Skip to content

রোহিঙ্গা নেতা মুহিব উল্লাহ হত্যা: নিজেদের আরসা সদস্য দাবি করেছেন চার আসামি

রোহিঙ্গা নেতা মুহিব উল্লাহ হত্যা: নিজেদের আরসা সদস্য দাবি করেছেন চার আসামি

বেনার নিউজ

জনপ্রিয় রোহিঙ্গা নেতা মুহিব উল্লাহ হত্যার সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আটক ১৫ রোহিঙ্গার মধ্যে চারজন জানিয়েছেন, তাঁরা জঙ্গিগোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মির (আরসা) সদস্য। তাঁরা ঘটনার সাথে জড়িত থাকার ব্যাপারেও আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

তবে পুলিশ বলছে, বাংলাদেশে আরসার কোনো অস্তিত্ব নেই এবং এর মূল নেতা আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনি সম্ভবত মিয়ানমারের জঙ্গলে অবস্থান করছেন।

আরসার সদস্যরা মিয়ানমার থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে ডাকাতি করে পুনরায় মিয়ানমার চলে যায় বলে বুধবার বেনারকে বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান।

তবে বাংলাদেশ কোনোভাবেই আরসা অথবা কোনো জঙ্গি বা বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেবে না বলে জানান তিনি। 

আসামিরা ‘আরসার কথা বলছে

মুহিব উল্লাহ হত্যা মামলা সম্পর্কে কক্সবাজারের উখিয়া থানার ওসি (তদন্ত) গাজী সালাহ উদ্দিন বেনারকে বলেন, “মামলাটি এখনো তদন্তাধীন। মামলায় অভিযুক্ত এ পর্যন্ত ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের মধ্যে চারজন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।”

তিনি বলেন, “আরও কয়েকজন আসামিকে ধরার চেষ্টা চলছে। এরা ধরা পড়ার পর এ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে পাঠানোর চিন্তা ভাবনা চলছে।”

গ্রেপ্তার আসামিরা আরসার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছে কিনা জানতে চাইলে জবাবে ওসি বলেন, “তারা আরসার কথা বলছে।”

আরসা নেতা আতাউল্লাহর নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড হয়েছে কিনা- বিষয়টি তাদের কাছে পুরোপুরি পরিষ্কার নয় বলে জানান সালাহ উদ্দিন।

তিনি বলেন, “আসামিরা কেউ বলেছে আমি আরসার পাহারাদার; কেউ বলেছে আমি আরসার কাজ করি। তবে বেশির ভাগ আসামির ভাষ্য, তারা কেউ সামনা-সামনি আতাউল্লাহকে দেখেনি।”

এই হত্যাকাণ্ডে আতাউল্লার নির্দেশ থাকতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, “এ কারণে আমরা জাহেদ হোসেন লালু, ছমি উদ্দিনসহ আরও তিন-চারজন আসামিকে খুঁজছি যাদের ধরতে পারলে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া যাবে।”

রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী ও আরসার শীর্ষ নেতা আতাউল্লাহ এখন কোথায় আছেন অথবা তার অবস্থান সম্পর্কে কিছু জানা আছে কিনা জানতে চাইলে সালা উদ্দিন বলেন, “আমরা ধারণা করছি সে মিয়ানমারের জঙ্গলে আছে।” 

রোহিঙ্গা শিবিরে আরসার কর্মকাণ্ড আছে কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আসলে ওরা নিজেদের আরসা বলে দাবি করে। কিন্তু আমরা এ ধরনের কোনো কিছু পাইনি। এ ধরনের একটা সংগঠন চলতে যে ধরনের বিষয়গুলো থাকা দরকার আমরা এখনো সেরকম কিছু পাইনি। আমরা বিচ্ছিন্নভাবে এসব শুনে আসছি।”

প্রসঙ্গত, গত ১৬ জানুয়ারি আরসা প্রধান আতাউল্লাহর ভাই মোহাম্মদ শাহ আলীকে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র, অস্ত্র, মাদক ও তাঁর হাতে অপহৃত এক যুবকসহ উখিয়া থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৮টার দিকে কক্সবাজারের উখিয়ার লম্বাশিয়া শিবিরে রোহিঙ্গাদের শীর্ষস্থানীয় নেতা এবং শরণার্থীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস এন্ড হিউম্যান রাইটস এর চেয়ারম্যান মুহিব উল্লাহকে সংগঠনের কার্যালয়ে ঢুকে গুলি করে তাকে হত্যা করে একদল অস্ত্রধারী।

এ ঘটনায় ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে নিহত মুহিব উল্লাহর ভাই হাবিবউল্লাহ বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলাটি তদন্ত করছে উখিয়া থানা পুলিশ।

এই হত্যার জন্য আরসাকে দায়ী করেছেন মুহিব উল্লাহর পরিবারের সদস্যরা। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এই দাবি নাকচ করে দেয়া হয়েছে।

রোহিঙ্গা শিবিরে আইন শৃঙ্খলা রক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাঈমুল হক বেনারকে বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের শুরু থেকেই পুলিশকে তদন্ত কার্যক্রমে সহযোগিতা করছে ১৪ এপিবিএন।

মামলায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে তিনি জানান।

নাঈমুল বলেন, আর মাত্র দুই-তিনজন আসামিকে ধরতে পারলেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসবে।”

তিনি বলেন, “এ পর্যন্ত এ মামলায় আরসা নামধারী অনেক আসামির সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি।”

মামলাটির তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।

যারা পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে এরা কি আরসা বা আল ইয়াকিন সাথে জড়িত— এমন প্রশ্নের উত্তরে নাঈমুল বলেন, “ক্যাম্পে আরসা বা আল ইয়াকিন এর কোনো অস্তিত্ব নেই। কিছু খারাপ লোক এদের নাম ভাঙিয়ে নানা অপরাধ করে।

আরসা থাকা অস্বাভাবিক নয়

নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার বেনারকে বলেন, “কক্সবাজারে বর্তমানে বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে নতুন পুরাতন মিলিয়ে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। সেখানে বিভিন্ন সশস্ত্র গ্রুপ রয়েছে যারা নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের জন্য রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এ পর্যন্ত প্রায় ২০০ জন রোহিঙ্গা এই সংঘর্ষে নিহত হয়েছে।”

তিনি বলেন, “আরসার উৎপত্তি মিয়ানমারে। তারা সন্ত্রাসী কার্যক্রমসহ মাদক পাচার, অস্ত্র চোরাচালান, মানব পাচারের সাথে যুক্ত। সুতরাং, সীমান্তের ওপার থেকে বাংলাদেশে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিতে পারে আরসা সদস্যরা। এটি অস্বাভাবিক নয়। সরকারের উচিত সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে সকল সশস্ত্র গ্রুপকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া।”

কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে প্রশ্রয় দেয়া হবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বুধবার বেনারকে বলেন, “আমরা আমাদের ভূমিতে কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, জঙ্গি গোষ্ঠী অথবা কোনো বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিই না। আমরা অতীতে উলফাকে বাংলাদেশ থেকে নিশ্চিহ্ন করেছি।”

তিনি বলেন, “আরসার উৎপত্তি ও ঘাঁটি মিয়ানমারে এবং তাদের কিছু সদস্যরা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে ডাকাতি করে আবার ফিরে যায়। আমরা যখনই তাদের ব্যাপারে কোনো গোয়েন্দা তথ্য পাই তখনই তাদের আটক করা হয়।”

“বাংলাদেশে শরণার্থী শিবিরে অথবা বাংলাদেশের কোনো স্থানে আরসার কোনো সংঘবদ্ধ উপস্থিতি নেই। এবং আমরা কখনও তাদের কোনো আশ্রয়-প্রশ্রয় দেবো না,” বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর আরাকানে পুরো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এক অমানবিক সামরিক অভিযান শুরু করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। এর ফলে লাখ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেন।