রোহিঙ্গাদের সমর্থনে জো বাইডেনের এগিয়ে আসা উচিত

ম্যাথু স্মিথ ও অ্যান্ড্রু রিলে

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা ও গণহত্যা পরিচালনা করার সময় বাংলাদেশে সাত লক্ষাধিক পুরুষ, নারী ও শিশু পালিয়ে আসে। যারা পেছনে রেখে আসে বুলেট, আগুন ও ধ্বংসযজ্ঞ। সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীরা গ্রামকে গ্রাম পুড়িয়ে দেয়। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অনেকের দীর্ঘ শারীরিক ক্ষত সারলেও এখনও মানসিক আতঙ্ক কাটেনি। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে তাদের জন্য কিছু করা উচিত।

বাংলাদেশে এখন দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার বাস। তারা এক ধরনের আতঙ্ক, হতাশা, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার অভিজ্ঞতা পেছনে ফেলে এসেছে। ফর্টিফাই রাইটসের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন মতে, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শিবিরে থাকা ৮৯ শতাংশ রোহিঙ্গা শরণার্থীই ভীষণ হতাশায় ভুগছে। ৬২ শতাংশ ভুগছে ট্রমা-পরবর্তী বিষণ্ণতায়। এই চরম হতাশা কোন দিকে মোড় নেবে?

মিয়ানমারে চলমান গণহত্যা দীর্ঘদিন ধরে সেখানে চলা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অংশবিশেষ। অপরাধ সংঘটিত করেও সেখানে দায়মুক্তির ব্যবস্থা রোহিঙ্গাদের মানসিক অবস্থার ওপর আরও বেশি প্রভাব ফেলছে। ট্রমা নিয়ে গবেষণা হয় সাধারণত একটি নির্দিষ্ট ঘটনাকে ফোকাস করে। তা হলো- কোনো দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, প্রিয় কোনো মানুষের মৃত্যু কিংবা কোনো সহিংস আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া। তবে এর মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যবিজ্ঞানে দীর্ঘমেয়াদে শরণার্থীদের ওপর পরিকল্পিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে সৃষ্ট ট্রমার যথাযথ আলোচনা নেই।

কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা সব ধরনের অধিকার থেকে বঞ্চিত। স্বাস্থ্যসেবার কোনো অধিকারই তাদের নেই। রোহিঙ্গাদের ধর্মচর্চা, সন্তান জন্মদান এমনকি রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচয় দেওয়াতেও কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। ফর্টিফাই রাইটসের প্রশিক্ষিত রোহিঙ্গা গবেষক টিম সংগৃহীত তথ্য প্রকাশ করেছে। তাতে আমরা দেখেছি, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী চরম সহিংসতার শিকার। তাদের ওপর নানাভাবে নির্যাতন চালানো হয়েছে। নির্যাতনের ধরন ছুরিকাঘাত, বেত্রাঘাত, গুলি করা ও যৌন নিপীড়ন। সুযোগ সীমিতকরণ, সহিংসতার দায়মুক্তি ইত্যাদিও নির্যাতনের অংশ। নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গারা এ সম্পর্কে আরও ভালো জানে। সেটাই তাদের বেদনার কারণ।

এটা সত্য যে, ট্রাম্প প্রশাসনও রোহিঙ্গাদের এ সংকটে চোখে বুজে থাকেনি। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ও বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিলারসন ও পম্পেও উভয়ই রোহিঙ্গাদের জন্য ন্যায়বিচারের কথা বলেছেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট পেন্স ২০১৮ সালে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত একটি আঞ্চলিক সম্মেলনে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চিকে এই বলে তিরস্কার করেছিলেন- কোনো কারণ ছাড়াই ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনী ও তাদের দোসররা রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যা ও সহিংসতা চালায়।

এমনকি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র বড় ডোনার। ২০১৭ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের সাহায্য দিয়েছে। এর মধ্যে কেবল ২০২০ সালে দিয়েছে ২০০ মিলিয়ন ডলার। এমনকি গণহত্যা সংঘটিত করার জন্য মিয়ানমারের জ্যেষ্ঠ জেনারেল মিন আং হেদ্মইং-এর ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিলারসন জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে মিয়ানমারের গণহত্যা তদন্তের জন্য একটি ইউএন ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন গঠন করেন।

২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত ওই তদন্ত দলের ৪০০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে মিয়ানমারের গণহত্যার বিষয়ের প্রমাণ উঠে আসে। একই বছরের জুলাই মাসে ফর্টিফাই রাইটসের প্রতিবেদনেও তা বের হয়ে আসে এবং সেসব তথ্য-প্রমাণই গাম্বিয়াকে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক গণহত্যার দায়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ২০১৯ সালের নভেম্বরে মামলা করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। সে বিচার এখনও চলমান।

তবে এখনও অনেক করণীয় রয়েছে। আমরা মনে করি, ওভালে প্রেসিডেন্ট অফিস থেকে জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হিসেবে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন। ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেও যা করতে ব্যর্থ হয়েছেন বাইডেন প্রশাসনকে তাই করতে হবে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত মিয়ানমারের গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দেশটিকে দোষী সাব্যস্ত করতে হবে। তার প্রমাণ ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে রয়েছে। যেসব অপরাধ মিয়ানমার করেছিল তার বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতকে সহায়তা করা। বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয়ের সম্মতিতে ঐকমত্য হওয়া দরকার।

জো বাইডেনের আরও উচিত হবে, আমেরিকা ও বহুর্মুখী শক্তির মাধ্যমে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমার ইস্যুতে চীন যে ভেটো দেয় তা আটকানোর ব্যবস্থা করা। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) মিয়ানমারের বিষয়টি জোরদার হবে। রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক দেশত্যাগে বাধ্য করা মনাবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে আইসিসির প্রসিকিউটর তা তদন্ত করতে পারেন। তবে মিয়ানমারে সংঘটিত নৃশংসতার বিচার করতে হলে আদালতকে সেভাবে ক্ষমতায়িত করতে হবে।

ট্রাম্প প্রশাসন রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধে আইসিসিতে বিচারের জন্য নিরাপত্তা কাউন্সিলকে তৎপর করতে ব্যর্থ হয়েছে। উল্টো সেপ্টেম্বরে আমেরিকা আইসিসির প্রসিকিউটরদের অদ্ভুত নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। জো বাইডেনের উচিত হবে অগ্রাধিকার বিবেচনায় সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে দিয়ে রোম স্ট্যাটুট অনুমোদন করা। এর মাধ্যমে মিয়ানমারের অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী যেমন আরাকানিজ, কাচিন, শানের ওপর নৃশংসতার বিচারের জন্যও যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আদালতকে সাহায্য করতে পারে। আন্তর্জাতিক আদালত কোনো আলাদিনের চেরাগের মতো নয় যে, তৎক্ষণাৎ বিচার করতে পারবে। বরং এটি ধীরগতিসম্পন্ন এবং অনেক অর্থেরও ব্যাপার। তবে এটি বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারলে গণহত্যা ও অন্যান্য নৃশংসতা প্রতিরোধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শেষ পর্যন্ত রোহিঙ্গা অধিকার নিশ্চিত করতে পারে মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক শক্তি। বাইডেন প্রশাসনের উচিত দেশটির মানবাধিকার রক্ষায় উদ্যোগীদের দ্বিগুণ সমর্থন দেওয়া। একইসঙ্গে মিয়ানমারের উন্নতিতে ভূমিকা রাখা। সবচেয়ে বড় যেটা করতে হবে, সেটা হলো নাগরিকত্ব প্রদানসহ রোহিঙ্গাদের পূর্ণাঙ্গ অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া। রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার যতদিন না হবে, এটি ততদিন আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার প্রশ্ন হয়েই থাকবে। সুতরাং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিষয়টিতে নজর দিতে হবে।

লেখকদ্বয় যথাক্রমে ফর্টিফাই রাইটসের প্রধান নির্বাহী ও সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং ফর্টিফাই রাইটসের কনসালট্যান্ট; টাইম থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক

সংগ্রহ সূত্র: সমকাল

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।