Skip to content

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাত সুপারিশ

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাত সুপারিশ

আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদলের কাছে দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উদ্বেগের কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসেও ‘তারা বিভিন্ন ধরনের বঞ্চনা, বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন’ বলে অভিযোগ জানিয়েছে সংগঠনটি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওয়াশিংটনের কাছে সুনির্দিষ্ট সাতটি সুপারিশও করা হয়েছে।

গত ১৬ নভেম্বর ঐক্য পরিষদের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করতে সংগঠনটির রাজধানীর পুরানা পল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যান যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিনিধিদল। সভায় মার্কিন প্রতিনিধিদলকে পাকিস্তান আমল (১৯৪৭-১৯৭১ সাল) এবং স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের নানা অভিযোগ ও উদ্বেগের বিষয়টি জানায় হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ।

সংগঠনটির পক্ষ থেকে সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত ছয় পৃষ্ঠার দীর্ঘ একটি লিখিত বক্তব্যে বিস্তারিত তুলে ধরেন। তাতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন, দেখ ত্যাগ, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী তৎপরতা এবং সংখ্যালঘু পরিস্থিতিসহ নানা বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। 

লিখিত বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন, ‘সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তিগুলোকে উগ্র, চরমপন্থী ও জঙ্গি হিসেবে পরিণত করা হচ্ছে; যারা শুধু জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের সরকারের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করার সাহসই করে না, বরং সরকার ও ক্ষমতাসীন দলকে প্রতিনিয়ত হুমকিও দিচ্ছে। তারা বলছে, বাংলাদেশের কোথাও ভাস্কর্য স্থাপন করা হলে তারা তা ধ্বংস করে দেবে। তাদের ভাষায়, ভাস্কর্য একটি মূর্তি ছাড়া আর কিছুই নয়, যা ইসলামে অনুমোদিত নয় কারণ ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম। এমনকি তারা ব্লাসফেমি অ্যাক্ট প্রণয়নের দাবিও তুলছে।’

সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তির চলমান প্রবণতা উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকতে সাধারণভাবে সংখ্যালঘুদের জন্য ব্যাপক আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করেন ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এই নেতা। তিনি বলেন, ‘২০১১ সালে ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ধর্মের স্বাধীনতা আবারও হুমকির মুখে পড়তে চলেছে। দেশটি ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করার একটি মহৎ পরিকল্পনার অংশ ছাড়া আর কিছুই নয় এবং এই দেশকে শুধু মুসলিম-জাতিতে পরিণত করেছে। এটি জনসংখ্যার আদমশুমারি থেকে প্রতিফলিত হয়েছে যেখানে দেখা যায় যে ১৯৭১ সালে ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনসংখ্যা ১৯-২০ শতাংশ ছিল, যা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো অনুসারে ২০২২ সালের আদমশুমারিতে ধীরে ধীরে ৮ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে।’

এতে আরও বলা হয়, ‘সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তির দ্বারা সংখ্যালঘুদের প্রতি ক্রমাগত হুমকির কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ ২০২৫ বা ২০১৬ সালের মধ্যে হিন্দু মুক্ত দেশ হবে এবং দ্বিতীয় পাকিস্তান বা আফগানিস্তান হবে। তা হলে এদেশ তথা উপমহাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কেমন হবে যা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে কোনও দেশের, কোনও শান্তিপ্রিয় গণতান্ত্রিক নাগরিকের কাছ থেকে আশা করা যায় না। দেশের ১২তম জাতীয় নির্বাচন ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সামগ্রিকভাবে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা নির্বাচনের আগে এবং পরবর্তী সময়ে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। তারা তাদের উপর ধ্বংসের আশঙ্কা করছেন, যা তারা গত কয়েক দফা নির্বাচনে অনুভব করেছিল।’

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ২০১৮ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক মহা সমাবেশ করা হয়। সেখান থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে বেশ কিছু দাবি তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে বলা হয়, ‘এই নৃশংসতা’ থেকে মুক্তি পেতে এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের অস্তিত্বের জন্য তারা কী করবেন, তা একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনি ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করারও দাবি জানানো হয়। আমাদের সেই দাবিকে সঠিক বিবেচনা করে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন ও বৈষম্য বিরোধী আইন প্রণয়ন, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন প্রতিষ্ঠা, অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যাবর্তন আইন দ্রুত বাস্তবায়নের অঙ্গীকারও করেছিল। দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের আর মাত্র ১৩ মাস বাকি, অথচ সরকার এখনও কোনও পদক্ষেপ নেয়নি; যা সামগ্রিকভাবে সংখ্যালঘুদের জন্য হতাশাজনক।

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যে সাতটি সুপারিশ করা হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাতটি সুপারিশের মধ্যে বলা হয়েছে, বৈষম্যমূলক ও সাংঘর্ষিক ধারা বাতিল করে ১৯৭২ সালের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো; চরমপন্থী ও জঙ্গি শক্তিসহ সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সরকারকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানানো; দায়মুক্তির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য অবিলম্বে পদক্ষেপ নিতে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো।

এছাড়াও সাহাবুদ্দিন কমিশনের প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানোর কথাও বলা হয়েছে। যে প্রতিবেদনে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধে জড়িত অপরাধীদের নাম ও অপরাধের কথা তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের ২০১৮ সালের নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুত পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি, অর্পিত সম্পত্তি ফেরত আইন, সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন, সমতল ভূমির ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য পৃথক ভূমি কমিশন এবং বৈষম্যবিরোধী আইন বাস্তবায়নে সরকারকে আহ্বান জানানো।

পৃথক সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় গঠনে পদক্ষেপ নিতে সরকারকে আহ্বান জানানোর সুপারিশও করেছে সংগঠনটি। সেই সঙ্গে ভুক্তভোগী সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহারের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগীয় প্রশাসনের কথিত নিরাপত্তা ও নিরাপত্তার জন্য ভুক্তভোগীদের কারাগারে পাঠানো বন্ধে পদক্ষেপ নিতে সরকারে প্রতি আহ্বান জানানোর কথাও বলা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক কমিশনের কমিশনার স্টিফেন স্নেকের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলে ছিলেন কুর্ট ওয়ার্থমুলার, প্যাট্রিক গ্রিনওয়াল্ট ও টম ব্রাউনস। মতবিনিময় সভায় হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতাদের মধ্যে ছিলেন সংগঠনটির সভাপতি অধ্যাপক নিমচন্দ্র ভৌমিক ও নির্মল রোজারিও, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজল দেবনাথ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি জে এল ভৌমিক প্রমুখ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্তের ১৭ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কিছুদিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতিনিধি ঢাকায় এসে মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসকে নিয়ে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কার্যালয়ে এসেছিলেন এবং আমাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। জাতিসংঘের একজন প্রতিনিধি এসেছিলেন, কথা বলেছেন। তাতে আমাদের কাছে মনে হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জাতিসংঘ ও অন্যান্য দেশ এবার বাংলাদেশের সংখ্যালঘু পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখেছে। আমরা সংখ্যালঘু ইস্যুটাকে আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছি। এখন সরকার এবং সকল রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব হলো- তারা এটাকে কীভাবে তাদের রাজনীতিতে গ্রহণ করবে।



বার্তা সূত্র