Skip to content

যার জাদুর হাতে প্রাণ ফিরেছে বনে

যার জাদুর হাতে প্রাণ ফিরেছে বনে

ভারতের দক্ষিণের রাজ্য কর্ণাটকের পশ্চিম পর্বতমালার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনভূমি। এই বনভূমি রক্ষার জন্য মাইলের পর মাইল হেঁটে পাড়ি দিয়েছেন তিনি। গাছ লাগানো ও প্রতিপালনে কেটেছে তার ৭ দশকেরও বেশি সময়। বিরল জাতের বীজ নিয়ে কথা বললে জ¦লে ওঠে তার চোখ। মৃত্যুর পর একটি বড় গাছ হয়ে পুনর্জন্ম পেতে চান যিনি, তিনি ‘গাছের দেবী’ তুলসী গোবিন্দ গৌড়া। লিখেছেন নাসরিন শওকত

তুলসী গোবিন্দ গৌড়া ভারতের একজন পরিবেশবিদ। কর্ণাটক রাজ্যের উত্তরা কন্নড় জেলার আনকোলা তালুকের হোনালি গ্রামের বাসিন্দা। স্থানীয় আদিবাসী হালাক্কি সম্প্রদায়ের সদস্য তিনি। বন-সংরক্ষণের কাজে জীবন উৎসর্গ করেছেন। গাছ লাগিয়ে ও তার প্রতিপালন করে ৮০ বছরের জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন এই প্রকৃতিপ্রেমী। নিজের হাতে ৩০ হাজারেরও বেশি গাছ লাগিয়েছেন। তিনি পরিবেশের উন্নয়নে অবদান রাখায় ভারত সরকার ও বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে পেয়েছেন সম্মাননা। তুলসী গৌড়াকে ২০২১ সালে ভারত সরকার চতুর্থ সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মাননা পদ্মশ্রী প্রদান করে। বিশ্বের প্রতিটি প্রজাতির ‘মা’ গাছ সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান রয়েছে তার। তাই তাকে ‘বনের এনসাইক্লোপিডিয়া’ বলা হয়ে থাকে। ৮০ বছর পেরিয়ে এসেও তরুণ সম্প্রদায়কে বন-সংরক্ষণের কাজে উদ্বুদ্ধ করে চলেছেন এই ‘গাছের দেবী’।

হালাক্কি ভোক্কালিগা সম্প্রদায়

ভারতের দক্ষিণের রাজ্য কর্ণাটক। এই রাজ্যেই আদিবাসী হালাক্কি ভোক্কালিগা সম্প্রদায়ের বাস। ১ লাখ ৮০ হাজার হালাক্কি আদিবাসী রয়েছে রাজ্যটিতে। যাদের নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠী হিসেবে নির্ধারিত কোনো মর্যাদা দেওয়া হয়নি। ৮০ বছর বয়সী তুলসী গৌড়া হালাক্কি সম্প্রদায়ের সদস্য। কয়েক শতক ধরে কর্ণাটকের পশ্চিম পর্বতমালার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনভূমির বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে রেখেছে এই সম্প্রদায়। ২০০৬ সাল থেকে এই বনভূমির অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করে আসছে তারা। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ভারতে ৭০০ বা তারও বেশি নৃ-তাত্ত্বিক বা আদিবাসী জনগোষ্ঠী রয়েছে। যার জনসংখ্যা ১ কোটি ৪০ লাখ (১০৪ মিলিয়ন)। এই গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ৬০০টিরও বেশি সম্প্রদায় তফসিলি জাতিভুক্ত। অর্থাৎ তারা সরকারি কিছু সুবিধা পেয়ে থাকে। যেমন : শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করার পাশাপাশি সরকারি চাকরিও পেয়ে থাকেন।

কর্ণাটক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শ্রীধর গৌড়া। যিনি কয়েক দশক ধরে হালাক্কি সম্প্রদায়ের ওপর পড়াশোনা করেছেন। এই অঞ্চলে  সম্প্রদায়টির প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে জানিয়ে শ্রীধর গৌড়া বলেন, হালাক্কি-ভোক্কালিগা সম্প্রদায়ের মধ্যে দারিদ্র্যের হার প্রায় ৯৫ শতাংশ। যার মধ্যে মাত্র ১৫ শতাংশ যেকোনো ধরনের শিক্ষা শেষ করতে পেরেছে। রাজ্য হিসেবেও কর্ণাটক তেমন উন্নত নয়। এই রাজ্যের দাভানাগেরে জেলার হোনালি গ্রামে বাস করেন তুলসী গৌড়া। কর্ণাটকের বৃহত্তম জেলাগুলোর একটি দাভানাগেরে। তার পরও এর রাস্তাগুলো কাঁচা, স্কুলগুলোও থাকে প্রায়ই বন্ধ। এমনকি সেখানে জরুরি কোনো হাসপাতালও নেই। হাসপাতালে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে অনেকে রাস্তায়ই মারা যান।

ভারত তখন ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ছিল।  সে সময় জাহাজ তৈরি ও রেলপথ স্থাপনের জন্য পাহাড়ি একটি বিশাল বন উজাড় করতে অভিযান পরিচালনা করেছিল উপনিবেশকারীরা। তখন উত্তরা কন্নড় জেলার বনভূমির বেশির ভাগ অংশ নিশ্চিহ্ন করেছিল তারা। এই বনভূমি অঞ্চলেই বাস করেন তুলসী । ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে ভারত। এরপর থেকেই দেশটির নেতারা বড় আকারের শিল্পায়ন ও নগরায়ণের জন্য বনাঞ্চলকে শোষণ করতে থাকে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে, ১৯৫১ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে প্রায় ৪ দশমিক ২ মিলিয়ন হেক্টর জমি বা প্রায় ১০ দশমিক ৪ মিলিয়ন একর উন্নয়নমূলক প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়।

তুলসী গৌড়া

১৯৪৪ সাল। হোনালি গ্রামের আদিবাসী হালাক্কি সম্প্রদায়ের দরিদ্র এক পরিবারে জন্ম নেন তুলসী গৌড়া। কর্ণাটকে এর উত্তরা কন্নড় জেলার গ্রাম ও শহরের মাঝামাঝি হোনালি গ্রাম অবস্থিত।

তুলসীর যখন ২ বছর বয়স, তখন তার বাবা মারা যান। এ কারণেই ওই শিশু বয়সেই তাকে তার মায়ের সঙ্গে কাজ করতে হয়েছিল। তখন থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত স্থানীয় একটি নার্সারিতে দিনমজুরের ভিত্তিতে কাজ করতে হতো তাকে। তাই প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া করার কোনো সুযোগ পাননি তিনি। এমনকি পড়তেও পারেন না তুলসী। যখন তুলসীর কিশোরী বয়স, তখন গোভিন্দ গৌড়া নামে এক বয়স্ক ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে হয় তার। বিয়ের ওই সময়ে নিজের বয়সও জানতেন না তিনি। তবে ধারণা করেছিলেন, তখন সম্ভবত ১০ থেকে ১২ বছর বয়স হবে তার। তুলসী ৫০ বছর বয়সে তার স্বামীকে হারান।

কর্ণাটকের বন বিভাগের নার্সারিতে কাজ করতেন তুলসী। শুরুতে তার দায়িত্ব ছিল যে বিষয়গুলোকে চারা হিসেবে রোপণ করা হবে সেগুলোর যত্ন নেওয়া, চারা রোপণ করা ও সেগুলো বড় হয়ে বেড়ে ওঠা পর্যন্ত দেখভাল করা। তখন তিনি আগাসুর বীজতলার নার্সারিতে কাজ করতেন। সেখানেই মায়ের সঙ্গে দৈনিক মজুরি কর্মী হিসেবে ৩৫ বছর ধরে কাজ করে গেছেন। তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত তার কাজ চালিয়ে গেছেন যতক্ষণ পর্যন্ত না তাকে বন বিভাগে একটি স্থায়ী পদ দেওয়া হয়। বন সংরক্ষণ ও উদ্ভিদবিদ্যা সম্পর্কে তার অগাধ জ্ঞানের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে ওই স্থায়ী পদে চাকরি দেওয়া হয়। তার যখন ৭০ বছর বয়স তখন বন বিভাগের চাকরি থেকে অবসর নেন তুলসী। এর আগে ১৫ বছর ধরে নার্সারির স্থায়ী পদে কাজ করেন তিনি। নার্সারিতে কাজ করার ওই সময় জমির ঐতিহ্যগত জ্ঞান ব্যবহার করে বন বিভাগের বনায়নে সরাসরি অবদান রেখেছেন। তুলসী তখন চারাও রোপণ করেছেন। পাশাপাশি শিকারি ও বনের আগুন থেকে বন্যপ্রাণীদের সুরক্ষায়ও কাজ করেছেন তিনি। এখনো বন বিভাগের নার্সারিগুলোর তত্ত্বাবধান করেন।

যেভাবে হলেন গাছের দেবী

মাত্র ১২ বছর বয়স থেকেই গাছ লাগানো শুরু করেছিলেন তুলসী। পরে বন বিভাগে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ শুরু করেন। তখন বন সংরক্ষণের প্রতি তার ঝোঁক ও মমতা মুগ্ধ করেছিল বন বিভাগের কর্মকর্তাদের। সে কারণেই পরে ওই বিভাগেই স্থায়ী চাকরি পেয়েছিলেন তিনি। পাশাপাশি তার মায়ের নার্সারিতেও কাজ করতেন তিনি। কর্ণাটকে তুলসী নিজের হাতে ৩০ হাজারেরও বেশি গাছ লাগিয়েছেন বলা হয়ে থাকে। তবে ধারণা করা হয়ে থাকে, রাজ্যটিতে তিনি আনুমানিক ১ লাখের মতো গাছ লাগিয়েছেন। সেগুলোকে পরম যত্নে লালন করেছেন দীর্ঘদিন।

তুলসী গৌড়া কর্নাটক বন বিভাগে সরকারি নার্সারিতে ৪৮ বছর কাজ করেছেন। পরে ১৯৯৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর নিয়েছেন। তার পরের ১৫ বছর তিনি পূর্ণকালীন উপদেষ্টা হিসেবে বন বিভাগের হয়ে কাজ করে চলেছেন। এ সময়ে স্থানীয় গাছ ও বন সম্পর্কে তার অগাধ জ্ঞান সবার সঙ্গে ভাগ করে চলেছেন তিনি। ভারতের সরকারি সংরক্ষণ নীতি পরিবর্তিত হয়েছিল ১৯৮৩ সালে। ওই বছর ভারতীয় শীর্ষ বন কর্মকর্তা আদুগোদি নানজাপ্পা ইয়েল্লাপ্পা রেড্ডি কর্নাটকের সরকারি নার্সারিতে দায়িত্ব নিয়ে আসেন। ওই অঞ্চলের বিশাল বনভূমি এলাকা পুনরুদ্ধারের দুঃসাধ্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তাকে। প্রথম কাজের দিনে নার্সারিতে তুলসী গৌড়ার সঙ্গে দেখা হয় তার। তখন তুলসী মাটি থেকে ছোট ছোট পাথর আলাদা করছিলেন এবং যতœ সহকারে বীজ ও চারা লাগাচ্ছিলেন। ৮৬ বছর বয়সী নানজাপ্পা রেড্ডি বর্তমানে অবসরে গেছেন। বন ও গাছ নিয়ে তুলসীর অনন্য জ্ঞান ও পান্ডিত্য সম্পর্কে রেড্ডি বলেন, ‘তার হাতে কিছু জাদু ছিল। দেশীয় প্রজাতির গাছ শনাক্ত করা ও যত্ন সহকারে সেগুলো সংগ্রহ করা এবং লালন-পালনের বিষয়ে তার জ্ঞান কোনো বইয়ে পাওয়া যাবে না। তুলসী তার দলের গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টাও হয়েছিলেন। তার সঙ্গে কাজ করা স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে ‘গাছের দেবী’ বলে ডাকতে শুরু করেছিল।’

গাছ ও বন সম্পর্কে জ্ঞান

পরিবেশবিদদের কাছে ‘বনের এনসাইক্লোপিডিয়া’ নামে পরিচিত তুলসী গৌড়া। আর নিজের হালাক্কি সম্প্রদায়ের কাছে তিনি ‘গাছের দেবী’। কারণ বন ও গাছের গুণাগুণ থেকে শুরু করে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পর্যন্ত সবকিছুই নখদর্পণে তার। বিশ্বের যে প্রান্তেরই বন বা গাছ হোক না কেন, ওই প্রজাতির মূল বা ‘মা’ গাছকে শনাক্ত করতে পারেন তিনি। ‘মা’ গাছেরা মূলত তার বয়স ও উচ্চতার কারণে অনন্য হয়। দীর্ঘ প্রায় ৮০ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে এ ধরনের গাছের আদি অবস্থা সম্পর্কে বলে দিতে পারেন তুলসী। ‘মা’ গাছদের শিকড় মাটির অনেক গভীরে থাকে বলে বনের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্কে জুড়ে থাকে তারা। প্রাকৃতিকভাবে বীজ ছড়িয়ে ও চারা বুনে ‘মা’ গাছ নাইট্রোজেন ও পুষ্টির আদান-প্রদান করে থাকে। বীজ সংগ্রহের ক্ষেত্রেও বিশেষজ্ঞ তুলসী। ‘মা’ গাছ থেকে বীজকে আহরণ করে বিভিন্ন প্রজাতির চারাকে নতুন করে তৈরি ও বড় করে তোলার ক্ষেত্রে তার বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। এটি একটি কঠিন প্রক্রিয়া। কারণ চারাগুলোর বেঁচে থাকা নিশ্চিত করে ‘মা’ গাছ থেকে অঙ্কুরোদগমের শীর্ষ সময়ে বীজ সংগ্রহ করতে হয়। তবে তুলসী কীভাবে বনের গাছ ও চারা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেছেন তা ব্যাখ্যা করতে পারেন না তিনি। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘তিনি বনের ভাষা বলতে পারেন।’ তার সম্প্রদায় হালাক্কি ভোক্কালিগার ঐতিহ্য অনুসারে, মাটির যতœ নেওয়া ও মাতৃতন্ত্র প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত।

চাকরি ও সম্মাননা

কর্ণাটক বন বিভাগে ৬০ বছরেরও বেশি সময় কাজ করে কাটিয়েছেন তুলসী। এর মধ্যে বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে একটি কমিউনিটি সংরক্ষণাগার, পাঁচটি বাঘ সংরক্ষণাগার, পনেরোটি সংরক্ষিত বন ও ত্রিশটি বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য গড়ে উঠেছিল। এই সংরক্ষণ কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে স্থানীয় সম্প্রদায় ও গ্রামগুলোর পুনঃসংযোগ স্থাপন করা হয়। যার লক্ষ্যে ছিল রাজ্যটির এক-তৃতীয়াংশ এলাকা বন বা গাছ দিয়ে ছেয়ে ফেলা।

তুলসী জাতীয় সেলিব্রিটি হয়ে ওঠার আগে বন সংরক্ষণে অনন্য অবদান রাখার জন্য এক ডজনেরও বেশি পুরস্কার পান।

১৯৮৬ সালে তুলসী গৌড়া ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী বৃক্ষমিত্র পুরস্কার পান, যা আইপিভিএম পুরস্কার নামে পরিচিত। বনায়ন ও বর্জ্যভূমি উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে স্বীকৃতি দিতে আইপিভিএম এই পুরস্কার দিয়ে থাকে। এর ১৩ বছর পর ১৯৯৯ সালে ‘বনের এই দেবী’ ‘কর্ণাটক রাজ্যোৎসব’ পুরস্কার’ পান। কর্ণাটকের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এই বেসামরিক সম্মাননা রাজ্যের ষাটোর্ধ্ব বয়সী বিশিষ্ট নাগরিকদের দেওয়া হয়।

পরে ২০২১ সালের ৮ নভেম্বর ভারত সরকার তুলসী গৌড়াকে পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত করে। সামাজিক উন্নয়নে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই সম্মাননা পান তিনি। দেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক নাগরিক সম্মাননা পদ্মশ্রী পাওয়ার পর ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের ব্যাপক মনোযোগ কাড়েন তুলসী। পদ্মশ্রী মঞ্চে সেদিন তিনি ঐতিহ্যবাহী আদিবাসী পোশাক ও খালি পায়ে উঠে যান। পরনে ছিল তার হাতে বোনা ঐতিহ্যবাহী পিঠখোলা শাড়ি ও গলায় সাত পরতের পুঁতির মালা। পরিবেশ সুরক্ষার কাজ করা মহান এই পরিবেশবিদের হাতে সেদিন পুরস্কার তুলে দেন সাবেক রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ।

আজকাল গ্রামবাসী যখনই তাকে দেখেন, তখন তার সামনে মাথা নত করেন তারা। শিশুরা প্রায়ই তার সঙ্গে সেলফি তোলে। স্কুলের বাসভর্তি শিক্ষার্থীরাও তুলসীর সঙ্গে দেখা করতে তার বাড়িতে চলে আসে। জাতীয় পুরস্কার পদ্মশ্রী পাওয়ার পর সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তুলসী বলেছিলেন, তিনি পদ্মশ্রী পেয়ে আনন্দিত হলেও ‘বন ও গাছকে বেশি মূল্য দেন’।

উত্তরাধিকার

বন সংরক্ষণে তুলসীর অতুলনীয় অবদান নিজ সম্প্রদায়ের সদস্যদের মধ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। শৈশবেই বনের কাটা গাছের অংশে নতুন গাছ লাগানোর কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে সেই শিশু বয়স থেকেই স্থানীয় বন উজাড় রোধ করায় অবদান রাখতে থাকেন। তখন পরিবারের জন্য কাঠ সংগ্রহ করতে দিনভর বনে বনে ঘুরে বেড়াতেন। তার মা তাকে শিখিয়েছিলেন বড় ও স্বাস্থ্যকর গাছের বীজ দিয়ে কীভাবে ভালো গাছের পুনর্জন্ম হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা ও বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, তুলসীর যখন কিশোর বয়স, তখন তিনি তার বাড়ির পেছনের ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি অংশে গাছ লাগিয়ে গভীর বনে রূপ দিয়েছিলেন। তুলসীর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা রুকমানি বলেন, ‘শৈশবকাল থেকেই তিনি গাছের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলতেন, দেখে মনে হতো যেন একজন মা তার শিশুসন্তানদের সঙ্গে কথা বলছেন।’

উত্তর কন্নড় জেলার হালাক্কি উপজাতির কল্যাণে কাজ করেন নাগরাজা গৌড়া। নিজের সম্প্রদায়ের তুলসী গৌড়া জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখায় গর্ব করে তিনি বলেন, ‘বন ও ঔষধি গাছ সম্পর্কে অসামান্য জ্ঞান রয়েছে তার। যা এখনো পর্যন্ত কেউ নথিভুক্ত করেনি। তিনি একজন অন্তর্মুখী মানুষ। নিজের মতো থাকতেই ভালোবাসেন। তাই তার কাজ না দেখলে কারও পক্ষেই তার অবদান বোঝা সহজ নয়।’ এদিকে হালাক্কি সম্প্রদায়ের জন্য তুলসীর দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতির প্রশংসা করে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইয়েল্লাপ্পা রেড্ডি বলেন, তুলসী গৌড়া ৩০০টিরও বেশি ঔষধি গাছ লাগিয়েছেন ও চিহ্নিত করেছেন। যেগুলো তাদের গ্রামে অসুস্থতার চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।

হোনালি গ্রামে প্রায় দেড়শ’ বাসিন্দার বাস। নিজের গ্রামের নারীদের অধিকার রক্ষায়ও কাজ করছেন তিনি। তার পরিবারে ছেলে ও নাতি-নাতনি মিলিয়ে ১০ সদস্য রয়েছে। ছেলে ও নাতিরা ছোট্ট একখন্ড- জমি চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে। তারা জ্বালানির জন্য বনের কাঠ ও ঔষধি গাছের জন্য বনের ওপর নির্ভরশীল। তার হালাক্কি সম্প্রদায় ঔষধি গাছের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। পরিবেশের রক্ষণাবেক্ষণে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করা নিভৃতচারী এই পরিবেশবিদ মৃত্যুর সময় অনেক ডালপালাওয়ালা একটি বড় গাছের নিচে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার ইচ্ছে রাখেন। বর্তমানে বন বিভাগের নার্সারিগুলোর তত্ত্বাবধান করে সময় কাটছে তার ।



বার্তা সূত্র