Skip to content

মৌলবাদীদের দাপটে সংখ্যালঘুরা এখনো নিরাপদ নন বাংলাদেশে

মৌলবাদীদের দাপটে সংখ্যালঘুরা এখনো নিরাপদ নন বাংলাদেশে

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর এখনো নির্যাতন চলছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিটি সংখ্যালঘুর জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তার বিষয়ে আন্তরিকভাবে সচেষ্ট হলেও মৌলবাদীদের দাপটে বিভিন্নরকম অপরাধমূলক কাজকর্ম চলছেই। মন্দিরে মন্দিরে হামলার পাশাপাশি জমি দখলেও সচেষ্ট ভূমিদস্যুরা। সদ্যসমাপ্ত জাতীয় সংসদের নির্বাচনের সময়ও সংখ্যালঘুদের টার্গেট করা হয়। তৃণমূলস্তরের কিছু অসাধু ব্যক্তি মৌলবাদীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। এটা ঠিক, বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলের তূলনায় এখন হিন্দুরা অনেক কম অত্যাচারিত। তবু নির্যাতন বা জমি দখল এখনো বন্ধ হয়নি।

আওয়ামী লীগের আমলে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন অনেকটাই কমেছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনাও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী। তাই তিনিও তার বাবার মতোই হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে কোনো বিভেধ রাখতে চান না। কিন্তু তার দলেরই নিচুতলার কিছু নেতা, ব্যক্তিগত লাভালাভের কারণে জামায়াত ও বিএনপির স্থানীয়দের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছেন। পরিসংখ্যান বলছে, বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলের তূলনায় অত্যাচার কমলেও এখনো নির্মূল হয়নি। তাই প্রধানমন্ত্রীর শত চেষ্টার পরেও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে বহু হিন্দু পরিবার।

তবে আগেকার পরিস্থিতি ছিল অনেক ভয়াবহ। শাসকদের প্রত্যক্ষ মদদেই গোটা দেশে চলতো হিন্দু নির্যাতন। তাই ২০০১ এর নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর প্রথম ১৫০ দিনে সারা দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা-ধর্ষণের মতো ১৮ হাজার অপরাধ সংঘটিত হয়। এইসব হামলায় জড়িত ২৬ হাজার ৩৫২ জনের মধ্যে বিএনপির অনেক মন্ত্রী এবং সংসদ সদস্যও ছিলেন। তারেক রহমানের পরিচালনায় গোটা দেশেই সৃষ্টি হয়েছিল অস্থিরতা। জামায়াতের হাত ধরে অবাধ লুঠপাট ও ধ্বংসের খেলায় মেতে ওঠেন বিএনপির নেতারা। দেশের দক্ষিণ এবং পশ্চিমাঞ্চলে নির্যাতনের মাত্রা ছিল সবচেয়ে বেশি। ভোলা জেলার শুধু একটি উপজেলা চরফ্যাশনেই ৩০০ হিন্দু পরিবার হামলার শিকার হয়। বরিশালের বানারিপাড়া, উজিরপুর এবং পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি থেকে বহু হিন্দু পরিবার বসতবাড়ি ছেড়ে গোপালগঞ্জের রামশীলে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রথম বছরেই তাদের নেতা-কর্মীদের হাতে ধর্ষণের শিকার হন ৫৬৬ জন নারী। ২০০২ সালে এই সংখ্যা বেড়ে হয় ১ হাজার ৯১ জন। হিন্দু নারীদের সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকাটাই কষ্টকর হয়ে উঠেছিল। তাদের সম্পত্তি গ্রাস করাটাই ছিল বিএনপি নেতাদের প্রধান লক্ষ্য। অনেকেই পাকিস্তান আমলের সঙ্গে তূলনা করেন খালেদা জিয়ার শাসনামলকে।

সাবেক পূর্ব পাকিস্তান থেকে মৌলবাদীদের কারণে বহুদিন ধরেই হিন্দুরা তাদের ভিটেমাটি ছাড়তে থাকেন। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় পূর্ববঙ্গে মোট জনসংখ্যার ২৯ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল সংখ্যালঘু। ১৯৭০ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২০ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থাৎ পাকিস্তানের প্রথম তেইশ বছরেই কমে যায় ৯ শতাংশেরও বেশি সংখ্যালঘু। ১৯৭৪ সালে হিন্দু ছিল ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ।  ২০২২ এ এসে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর কমতে থাকে সংখ্যালঘুদের সংখ্যা হ্রাসের প্রবণতা। আসলে আওয়ামী লীগের আমলে হিন্দুরা নিজেদের অনেক বেশি নিরাপদ মনে করেন। তাদের নিরাপত্তা দিতে খুবই আন্তরিক শেখ হাসিনা।

সাধারণ মানুষ তাদের প্রত্যাখান করলেও বাংলাদেশের মাটি থেকে জামায়াত বা বিএনপির নাম কিন্তু মুছে যায়নি। এখনও তাদের নেতারা দেশকে অস্থির করার ষরযন্ত্রে লিপ্ত। বিশেষ করে ক্ষমতায় ফেরার যাবতীয় সম্ভাবনা চলে যাওয়ার পর তারা আরও বেশি হিংস্র হয়ে উঠেছে। তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কিছু লোভী নেতা হাত মিলিয়েছেন। মন্দিরের সম্পত্তি দখল থেকে শুরু করে গোটা দেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি করতে চাইছে তারা। বাংলাদেশকে অস্থির করে তোলার জন্য বিদেশি মদদও রয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে অর্থলোভীরা। তাদের কারণেই শেষ হয়নি সংখ্যালঘু নির্যাতন। বিপুল ভোটে জয়লাভ করার পর আওয়ামী লীগের কিছু আদর্শবান নেতার মধ্যেও দেখা দিয়েছে আত্মতুষ্ঠি। আর তারই সুযোগ নিচ্ছে ভূমিদস্যুরা। তাই নির্যাতন চলছে।

পরিসংখ্যাণের দিকে চোখ রাখলেই সংখ্যালঘু নির্যাতনে চিত্রটি ফুটে উঠবে। ২০২২ সালে গোটা দেশে খুন হয়েছেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ১৫৪ জন। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩৯ জন নারী। বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের তরফে এই তথ্য তুলে ধরে আরও বলা হয়েছে, গত এক বছরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্তত ৮৯ হাজার ৯৯০ একর জমি দখল করা হয়েছে। ৫৭২টি পরিবারকে বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। ৪৪৫টি পরিবার বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। ২০২২ সালে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মোট ২২০ কোটি ৮৯ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলেও জাতীয় হিন্দু মহাজোটের অভিযোগ।

সংখ্যালঘুরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আক্রান্ত হচ্ছেন ধর্মীয় কারণে নয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক ফারুখ ফয়সালের মতে, স্বার্থের, সম্পদের এবং জমি দখলের লক্ষ্যে সংখ্যালঘু নির্যাতন চলছে। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মণীন্দ্র কুমার নাথের মতে, সংখ্যালঘু নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে সরকারকে কড়া ব্যবস্থা নিতে হবে। দোষীরা শাস্তি পেলে তবেই কমতে পারে নির্যাতন। স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্তাদের দুর্নীতিমুক্ত হয়ে কর্তব্যপালনও জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

সদ্যসমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও লক্ষ্য করা গেছে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন সংখ্যালঘুরা। ভোটের আগে-পরে মোট ১৩টি বড় ধরনের হামলা হয়েছে সংখ্যালঘুদের ওপর। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ১ জন নিহত ও ৩৭ জন আহত হয়েছেন। নির্বাচনকেন্দ্রিক হামলার পিছনেও রয়েছে আর্থিক লাভের বিষয়।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদন অনুযায়ী, গোটা দেশে ১২টি জেলায় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্বাচনকেন্দ্রিক হামলা–নির্যাতন, ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর এবং হুমকির ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলা–নির্যাতনের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বেশিরভাগ ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে এইচআরএসএস। এছাড়াও সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে বিভিন্ন জরিপ ও সংবাদে শাসকদলের কিছু অসাধু ব্যক্তির নাম উঠে আসছে। তৃণমূল স্তরের এইসব নেতাদের অনেকেরই পরিচয় হয়তো প্রধানমন্ত্রীর জানা নেই। কিন্তু এদের দমন করতেই হবে। সম্প্রতি সরস্বতী পূজা নির্বিঘ্নে মিটলেও মন্দিরে মন্দিরে চোরাগোপ্তা হামলা চলছেই। বিভিন্ন মন্দিরের জমি গ্রাস করা হচ্ছে। সংখ্যালঘুরা ভয়ে মুখ খুলতে পারছেন না। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দেশের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের আরও বেশি সক্রিয় হতে হবে। সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে সংখ্যালঘুরা কিন্তু আওয়ামী লীগকেই ভোট দিয়ে নিজেদের আস্থা প্রকাশ করেছেন নৌকার প্রতি। এখন সেই আস্থাকে সম্মান জানিয়ে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণই বাংলাদেশের সংখ্যাগুরুদের প্রধান দায়িত্ব। মাথায় রাখতে হবে বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক চেতনাকেও।



বার্তা সূত্র