Skip to content

মোহনবাগানের নায়ক একা শুয়ে মল্লিকবাজারের কবরস্থানে

রেভারেন্ড সুধীর চ্যাটার্জির সমাধিটা কোথায় বলতে পারবেন?
—কার সমাধি? বিখ্যাত মানুষ কেউ?
—বিখ্যাত মানে, মোহনবাগানে খেলতেন। খুব বড় ফুটবলার ছিলেন। ১৯১১ সালে মোহনবাগানের হয়ে শিল্ড জিতেছিলেন।
—না দাদা, বলতে পারছি না। এত এত সমাধি রয়েছে এখানে। কী করে জানব বলুন তো?

মল্লিকবাজারের খ্রিস্টান সমাধিস্থল। পোশাকি নাম— লোয়ার সার্কুলার রোড সেমেট্রি। সেখানে রেভারেন্ড সুধীর চ্যাটার্জির সমাধি খুঁজতে গিয়ে ধাক্কা খেতে হয়েছিল এ ভাবেই! কে বলবে, এই মানুষটাকে নিয়েই মোহনবাগানের এত গর্ব!
২৯ জুলাই সকাল থেকে সেজে ওঠে কলকাতা ময়দানে মোহনবাগান তাঁবু। বিকেলে তাঁবু ভেসে যায় আলোয়। হয় নানা অনুষ্ঠান। ‘মোহনবাগান রত্ন’ সম্মান তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু কেন এই বিশেষ দিন?

১৯১১ সালে এই ২৯ জুলাই তারিখেই ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল মোহনবাগান! গড়ের মাঠে আইএফএ শিল্ড ফাইনালে হারিয়েছিল ইংরেজদের শক্তিশালী টিম ইস্ট ইয়র্কশয়ারকে। আবেগে-উচ্ছ্বাসে ভেসে যাওয়া বাঙালি সে দিন পেয়েছিল মুক্তির আনন্দ। ‘স্বাধীনতার আনন্দ’! দেশ স্বাধীন হওয়ার ৩৬ বছর আগেই স্বাধীনতার আনন্দ! অনেকে মনে করেন, ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামকে এক ধাক্কায় অনেকটা এগিয়ে দিয়েছিল মোহনবাগানের এই জয়। বিপ্লবীদের মনে আরও বেশি করে জ্বালিয়ে দিয়েছিল আগুন।

মোহনবাগানের সেই অমর একাদশেরই এক ‘সৈনিক’ এই রেভারেন্ড সুধীর চ্যাটার্জি। ধর্ম বদলে হয়েছিলেন খ্রিস্টান। শিবদাস ভাদুড়ি-বিজয়দাস ভাদুড়ির টিমের একমাত্র খ্রিস্টান ফুটবলার। অত্যন্ত জাঁদরেল, মিলিটারি মেজাজের এই মানুষটার শরীরে যেন ছিল এক অন্য রক্ত। হারতে শেখেননি তিনি। টিমকেও শিখিয়েছিলেন সেই মন্ত্র। সেই শিল্ড ফাইনালে জ্যাকসনের গোলে এগিয়ে গিয়েছিল ইস্ট ইয়র্কশয়ার। মরিয়া হয়েও গোল শোধ করতে পারছিলেন না মোহনবাগান ফুটবলাররা। কান্নায় ভেঙে পড়া অবস্থা মাঠ ছাপিয়ে যাওয়া সমর্থকদের। খেলার তখন বাকি মাত্র পাঁচ মিনিট। তখনই বদলে গেল সব কিছু। প্রথমে গোল শোধ করলেন অধিনায়ক শিবদাস। তার পরেই অভিলাষ ঘোষের পা থেকে এসেছিল জয়ের গোল! বাকিটা ইতিহাস।

সেই অমর একাদশের সবাই প্রয়াত দীর্ঘকাল আগে। এক জন বাদে বাকি সবারই দেহ দাহ করা হয়েছিল। কিন্তু এক জনকে দাহ করা হয়নি, তাই তিনি এখনও থেকে গিয়েছেন। তিনি ওই রেভারেন্ড সুধীর চ্যাটার্জি। খ্রিস্টান বলে তাঁকে দাহ করা হয়নি, মৃতদেহ কবর দেওয়া হয়েছিল মল্লিকবাজারে। যেখানে আজও তিনি শয়ান।

মল্লিকবাজারের ওই সমাধিস্থলে ঢুকলে প্রথমেই মাইকেল মধুসূদন দত্তর সমাধি। সেখানে মধু কবির মর্মর মূর্তিও। তিনিও তো রেভারেন্ড সুধীর চ্যাটার্জির মতোই খ্রিস্টান ধর্ম নিয়েছিলেন। খোঁজ করতে গিয়ে সমাধিস্থলে দেখা এক বৃদ্ধের সঙ্গে। কত বছর ধরে তিনি সেখানে আছেন, তা নিজেই জানেন না। শেষ পর্যন্ত মোহনবাগানের ফুটবলার শুনে তিনিই খোঁজ দিয়েছিলেন রেভারেন্ড সুধীর চ্যাটার্জির সমাধির! বলেছিলেন, ‘ওই দেখুন, ওখানে লেখা আছে।’
কাদায় প্রায় ডুবে যাওয়া রাস্তা, জঙ্গলের ঝোপঝাড়, নাম না-জানা অসংখ্য মানুষের সমাধির পাশ দিয়ে হেঁটে এক জায়গায় দেখা গেল, সেখানে লেখা রয়েছে— ‘আচার্য সুধীর চ্যাটার্জি সরণি।’ ঠিক তার নীচে উল্লেখ করা—‘১৯১১-র শিল্ডজয়ী দলের সদস্য।’ ২০১০-এর ২৮ জুন রাজ্য সরকারের পূর্ত দপ্তর ওই ফলক বসিয়েছিল।

কিন্তু সরণির খোঁজ পেলেই যে সমাধির খোঁজ পাওয়া যাবে, তা নয়। তার জন্য ঘুরতে হবে বিস্তর। ঘুরতে ঘুরতেই রাস্তা ধাক্কা খায় সমাধিস্থলের কালো দেওয়ালে। ওটাই সীমানা। সেখান থেকে একটু বাঁ দিকে ঘুরতেই বড় একটা সমাধি। সাদার উপর কালো ছিট ছিট মোজ়াইক। তার উপরে ছোট্ট একটা বলের প্রতিকৃতি। লেখা, ‘১৯১১’। ওটা দেখেই বুঝতে পারা যাবে, এ-ই হল সেই সমাধি। যাতে বড়, কালো মার্বেলের ফলকে খোদাই করা ঈশ্বরের বাণী ও রেভারেন্ড ডক্টর সুধীর চ্যাটার্জির নাম!
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, সমাধিস্থলের একেবারে শেষ দিকে থাকা এই সমাধি দেখতে বড় একটা কেউ আসেন না। রেভারেন্ড সুধীর চ্যাটার্জির পরিবারের কেউ এখনও আছেন কি না, তা-ও বলতে পারেননি বিশাল সমাধিস্থলের দায়িত্বে থাকা কর্মীরা।
করোনাকালের আগের কথা। মোহন বাগানের সচিব তখন অঞ্জন মিত্র। রেভারেন্ড সুধীর চ্যাটার্জির এই সমাধির কথা জেনে অঞ্জন বলেছিলেন, ‘মোহনবাগান ক্লাব এই সমাধি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিতে পারে।’ পরে অবশ্য আর কিছুই হয়নি। বছর চারেক আগে, ২০১৯-এ অঞ্জনই তো প্রয়াত।

আজ আরও একটা ২৯ জুলাই। এ বারও সেজে উঠেছে মোহনবাগান। গান-বাজনা, আলোয় তৈরি হবে এক স্বপ্নের পরিবেশ। তখন অন্ধকারে, ভেজা ও স্যাঁতসেঁতে মাটিতে শুয়ে থাকবেন তিনি, সেই অমর সৈনিকদের এক জন! যাঁদের স্মরণেই জমকালো আয়োজন মোহনবাগান তাঁবুতে! তখন হয়তো আকাশভাঙা বৃষ্টির জল ধুয়ে দেবে রেভারেন্ড সুধীর চ্যাটার্জির মর্মর সমাধিকে!

কণ্ঠ: শৌণক স্যান্যাল 

বার্তা সূত্র