Skip to content

মেঘনায় ডুবে যাওয়া ট্যাংকারের তেলে জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়ার আশঙ্কা

মেঘনায় ডুবে যাওয়া ট্যাংকারের তেলে জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়ার আশঙ্কা

বেনার নিউজ

তিন দিন পার হলেও ভোলায় মেঘনা নদীতে ডুবে যাওয়া ওয়েল ট্যাংকারটি মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

প্রায় ১১ লাখ লিটার জ্বালানি তেল বহনকারী ওই ট্যাংকার থেকে নির্গত ডিজেল ও অকটেন মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগরে ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে সেখানকার জলজ প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা পরিবেশবাদীদের।

নদীতে ছড়িয়ে পড়া ডিজেলের দুর্গন্ধের কারণে ভোলা ও আশেপাশের জেলার জেলেরাও মাছ ধরতে যাচ্ছেন না।

কোস্ট গার্ড কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ২৫০ টনের বেশি ওজনের জাহাজ উদ্ধার করতে পারে না। ডুবে যাওয়া ট্যাংকারের ওজন এর চেয়ে অনেক বেশি। তবে সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়া তেল সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।

সাগর নন্দিনী-২ নামের ডুবে যাওয়া ওয়েল ট্যাংকারটির মাস্টার মাসুদুর রহমান মঙ্গলবার রাতে বেনারকে বলেন, একটি বেসরকারি কোম্পানিকে এই ট্যাংকারটি উদ্ধারের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

“সব ঠিক থাকলে বুধবার সকাল থেকে ওয়েল ট্যাংকারটি উদ্ধার কাজ শুরু হবে,” বলেন তিনি।

কীভাবে ডুবল এই ট্যাংকার?

মাসুদুর রহমান বেনারকে বলেন, তিনি শনিবার বিকেলে চট্টগ্রাম থেকে ১১ লাখ লিটার ডিজেল ও অকটেন নিয়ে চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন।

রোববার ভোরের দিকে নদীতে কুয়াশার কারণে ভোলার ইলিশ্যার কাছে তুলাতুলি এলাকায় ট্যাংকার থামিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন তিনি।

“এর মধ্যেই একটি বড়ো জাহাজ আমাদের পেছন দিক থেকে ধাক্কা দেয়। সম্ভবত তারা আমাদের ট্যাংকার দেখতে পায়নি। ওই জাহাজটির কোনো ক্ষতি হয়নি। তবে অয়েল ট্যাংকারটির ক্ষতি হয়েছে,” বলেন মাসুদুর রহমান।

তিনি জানান, “এর মধ্যে প্রচণ্ড বেগে পানি ঢোকা শুরু হয়। ট্যাংকারটি ঘাটের দিকে নিয়ে যাই, এর কিছুক্ষণ পরই সেটি ডুবে যায়।”

ডুবে যাওয়ার পরই ট্যাংকার থেকে তেল বের হতে শুরু হয় বলে জানান মাসুদুর রহমান।

ওই ট্যাংকারটিতে মোট ছয়টি চেম্বার আছে জানিয়ে তিনি বলেন, “সেখান থেকে কতটুকু তেল বেরিয়েছে সেটি আন্দাজ করা সম্ভব নয়। তবে তেল বের হচ্ছে এবং তা সাগরে ও নদীতে ছড়িয়ে পড়ছে।”

কোস্ট গার্ড বের হওয়া তেল সংগ্রহ করছে বলে জানান তিনি।

মাছ ধরতে যাচ্ছেন না জেলেরা

মেঘনা নদীকে কেন্দ্র করে পুরো ভোলা জেলায় প্রায় দুই লাখ জেলে জীবিকা নির্বাহ করেন বলে মঙ্গলবার বেনারকে জানান ইলিশ্যা এলাকার জেলে মোহাম্মদ মনির।

“চারদিকে তেলের গন্ধ, আবার জেলেদের জালে তেল মিশে যাচ্ছে। অবস্থা ভালো নয়। অনেক জেলে নদীতে মাছ ধরতে যাচ্ছে না। নদীর পানি থেকে তেলের গন্ধ যেতে কয়েকদিন লেগে যাবে,” বলেন মনির।

তবে ডুবে যাওয়া ট্যাংকারের “ছয়টি চেম্বারের প্রায় সবই অক্ষত আছে,” বলে মঙ্গলবার বেনারকে জানান কোস্ট গার্ডের বরিশাল বিভাগীয় জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন শাহেদ সাত্তার।

এখন আর ট্যাংকারটি থেকে “তেল নিঃসরণ হচ্ছে না,” জানিয়ে তিনি বলেন, “যে পরিমাণ তেল নিঃসরিত হয়েছে সেগুলো মেশিন দিয়ে চুষে নেয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত আমরা ১০ টন ডিজেল পানির ওপর থেকে সরিয়ে নিয়েছি। তবে কিছু পরিমাণ তেল সাগরে ও নদীতে মিশেছে।”

“বর্তমানে ডুবে যাওয়া ট্যাংকারের চারদিকে আটকে দেয়া হয়েছে যাতে তেল বাইরে যেতে না পারে,” বলেন ক‌্যাপ্টেন শাহেদ।

তিনি বলেন, “বিআইডব্লিউটিএ ২৫০ টনের বেশি ওজনের ট্যাংকার উদ্ধার করতে পারে না। সে কারণে ট্যাংকারটি উদ্ধার করতে বেসরকারি একটি কোম্পানিকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তবে উদ্ধারকারী বার্জটি এখনও ঘটনাস্থলে আসেনি।”

সামুদ্রিক প্রতিবেশ ক্ষতির আশঙ্কা

পরিবেশ অধিদপ্তর ভোলা জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক তোতা মিয়া মঙ্গলবার বিকালে বেনারকে বলেন, “ওয়েল ট্যাংকারের শতকরা ৯৫ ভাগ পানির নিচে ডুবে আছে। শুধু মাথাটি ভেসে আছে।”

ট্যাংকারটির চেম্বারগুলোর কোনোটিতে ডিজেল, কোনোটিতে অকটেন রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “এখন অকটেন বেরুচ্ছে। অকটেনের সুবিধা হলো এটি সহজে বাতাসে ভেসে যায়।”

তিনি বলেন, “তবে কী পরিমাণ ডিজেল বেরিয়ে পানিতে মিশে গেছে সেটি বলা কঠিন। এগুলো স্রোতের তোড়ে ভেঙে ভেঙে পানির সাথে মিশে সাগরে চলে গেছে এবং মেঘনা নদীতে মিশেছে। এগুলো পরিবেশের জন্য, জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর।”

পানির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে পানিতে তেল নিঃসরণের “ক্ষতিকর প্রভাব অনেক” বলে মঙ্গলবার বেনারকে জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওশানোগ্রাফি বিভাগের অধ্যাপক ও পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. মো. কাওসার আহমেদ।

তিনি বলেন, “তুলাতুলির যে স্থানে ট্যাংকারটি ডুবেছে সেখান থেকে তেল সংগ্রহ করা খুব কষ্টসাধ্য। নদীর স্রোতে সেগুলো আশেপাশের নদী ও বঙ্গোপসাগরে চলে যাবে।”

পানিতে তেল ছড়িয়ে পড়লে সেটি পানিতে অক্সিজেনের সমস্যা তৈরির পাশাপাশি মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহৃত বিভিন্ন ক্ষুদে উদ্ভিদেরও সমস্যা তৈরি করে বলে জানান তিনি।

“এই তেল অনেক মাছ খাবার মনে করে খাবে। অনেক মাছের গায়ে লাগবে। ফলে অনেক মাছ মরে যাবে। আবার সেই মাছ অন্য জলজ প্রাণী খেয়ে ফেললে সেটি তার শরীরেও চলে যাবে,” বলেন অধ্যাপক কাওসার।

তিনি বলেন, নদী ও সাগরের জলজ পাখিদের গায়ে এই তেল লেগে যাবে এবং অনেকগুলোই মারা যাবে। এ ছাড়া মাছের মাধ্যমে এই তেল মানুষের খাবারে চলে আসবে।

তিনি বলেন, “এই তেল সার্বিকভাবে সামুদ্রিক প্রতিবেশে সমস্যা করবে।”

“তবে একটি ভালো খবর হলো ওই অঞ্চলে ডলফিন নেই। ওটা থাকলে নিঃসরিত তেলের কারণে এসব জলজ প্রাণীর মারাত্মক ক্ষতি হতো। এমনকি মারাও যেতে পারত,” বলেন অধ্যাপক কাওসার।