Skip to content

‘মুক্তিযুদ্ধ’, ‘ধর্মযুদ্ধ’ এবং নায়ক ফারুক

‘মুক্তিযুদ্ধ’, ‘ধর্মযুদ্ধ’ এবং নায়ক ফারুক

মোজাফফর হোসেন

মোজাফফর হোসেন: ‘আমরা ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করিনি। আমরা যুদ্ধ করেছি এই দেশ স্বাধীন করার জন্য। পরাধীনতা যে শিকল মানুষের গলায় দিয়ে দেওয়া হয়েছিলো সেটাকে ভেঙে ৩০ লাখ মানুষের বুকের রক্ত দিয়ে বঙ্গবন্ধুর ডাকে এই দেশ স্বাধীন করা হয়েছে’। এই কথা বলে নায়ক ফারুক ঐতিহাসিক সত্য উচ্চারণ করেছেন। ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য এই বাংলায় কোনো যুদ্ধ হয়নি, হয়েছে স্বাধীনতার যুদ্ধ, তাও কথিত ইসলামিক কান্ট্রির বিরুদ্ধে। বাংলার মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, সাঁওতাল, চাকমা প্রভৃতি ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠী সম্মিলিতভাবে সেই যুদ্ধটা করেছে। এই সরল সত্যটা যারা উচ্চারণ করেন না, তারা ভণ্ড, ভণ্ডকে নিশ্চয় আল্লাহও পছন্দ করেন না, কিন্তু এদেশের মুসলমানরা করে। এই কারণে ফারুককে নিয়ে তাদের এত জ্বলুনি।  কিন্তু ইতিহাস তো বদলানো যাবে না হুজুর। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বঙ্গবন্ধুর সুহৃদ খান সারওয়ার মুরশিদ স্পষ্ট করে বলেছেন। ‘রাষ্ট্রীয় ধর্মনিরপেক্ষতার মূল কথাটি হলো, খাঁটি মুসলমান, খাঁটি হিন্দু, খাঁটি খ্রিস্টান বা খাঁটি বৌদ্ধ তৈরি করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের নয়। তার দায়িত্ব সুনাগরিক তৈরিতে সাহায্য করা। রাষ্ট্রচর্চা একটি সম্পূর্ণ ইহলৌকিক ব্যাপার যার সঙ্গে ধর্মকে জড়িত করা বিপজ্জনক’। 

বঙ্গবন্ধু আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘ভারত  একটি পলিটিক্যাল ইউনিয়ন, অন্যদিকে (স্বাধীন) বাংলাদেশ একটি কালচার নেশন। হাজার বছরের বেশি সময় ধরে আমাদের পরিচয় আমরা বাঙালি। বহুকাল আমাদের নেশন স্টেট ছিলো না। এখন সেটা পেয়েছি’। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাভিত্তিক ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এদেশের রাজাকাররা বরঞ্চ পাকিস্তানের সঙ্গে থেকে বাঙালি সংস্কৃতিবিরোধী একটি কথিত মুসলিম রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ কেউ করেছেন মানেই সেই রাজনৈতিক এজেন্ডার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, যুদ্ধ করেছেন বৈষম্যের বিরুদ্ধে, ইসলামী ট্যাগযুক্ত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। 

এখন ফারুক ‘ধর্মযুদ্ধ করেননি’ বলেছেন বলে অনেক কাঠমোল্লা বলছেন তাঁর জানাজা করা ঠিক হয়নি। জানাজার পূর্বশর্ত ‘ধর্মযুদ্ধ করা হলে’ তো এদেশে কারোরই জানাজা করা যাবে না, কারণ কোনো ধর্মযুদ্ধই তো এদেশে হয়নি, ফলে কেউই ধর্মযুদ্ধ করেননি। যারা ফারুকের কথায় কষ্ট পেয়েছেন তাদের দাবি মানলে, মুক্তিযুদ্ধটা ছিলো ধর্মযুদ্ধ। পাকিস্তান একটা অইসলামিক (ইহুদি টাইপের) রাষ্ট্র, তার বিরুদ্ধে এদেশের হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান প্রভৃতি ধর্মের মানুষ একত্রিত হয়ে জেহাদ (ইসলামে ধর্মযুদ্ধ অর্থে) করেছে। সেই যুদ্ধে গোলাম আজমদের মতো ইসলামবিরোধী শয়তানরা পাকিস্তানের সঙ্গ দিয়েছে। এখন এই ন্যারেটিভে তারা খুশি হবেন তো? [উল্লেখ্য, ঋণখেলাপী ফারুকের প্রতি আমার কোনো সমবেদনা নেই। পাঁচশ কোটি হোক, আর পাঁচ হাজার টাকা হোক, জীবিত হোক, আর মৃত, মুক্তিযোদ্ধা হোক আর না হোক, ঋণখেলাপের সমালোচনা করতে হবে]। লেখক: কথাসাহিত্যিক

বার্তা সূত্র