Skip to content

ভোট পড়েছে ১২-১৪ শতাংশ

ভোট পড়েছে ১২-১৪ শতাংশ

জাতীয় নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে ততই উত্তাপ ছড়াচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। তাছাড়া প্রশাসনেও চলছে উত্তাপ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) নানা উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন করে তদন্তের দিকে এগোচ্ছে সংস্থাটি। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অন্তত দেড়শ নেতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে আসা অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। শিগগিরই নেতাদের নামে নোটিস পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে দুদকের একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে।

এদিকে ক্যাসিনোকা-ে জড়িতদের বিষয়ে দুদকে আসা অভিযোগগুলোও নতুন করে আমলে নিচ্ছে দুদক। তারাও আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ইতিমধ্যে একটি তালিকার কাজও গুছিয়ে এনেছে। আবার কোনো কোনো নেতা নিজেদের নামে নোটিস এড়াতে প্রভাবশালী মহলে তদবিরও করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ সম্প্রতি দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্সনীতি গ্রহণ করেছি। বড় বড় দুর্নীতিবাজকে ধরা হচ্ছে। যাদের বিরুদ্ধে কালো টাকার অভিযোগ আছে তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। সামনের জাতীয় নির্বাচনে কোনো দুর্নীতিবাজ মনোনয়ন পাক, তা আমরা প্রত্যাশা করি না। কোনো সংসদ সদস্য বা অন্য কাউকে দুদক হয়রানি করে না। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসে তা অনুসন্ধান করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, দীর্ঘদিন ধরেই দুর্নীতি দমন কমিশনে বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতাদের নামে অভিযোগ আসছে। কোনো অভিযোগ আমলে নেওয়া হচ্ছে, আবার কোনো অভিযোগ আমলে নেওয়া হচ্ছে না। নেতাদের মধ্যে কেউ সংসদ সদস্য, আবার কেউ সাবেক সংসদ সদস্য, সাবেক মন্ত্রী ও জেলা ও উপজেলার নেতা রয়েছেন। যাদের নোটিস দেওয়া হবে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, আয়কর রিটার্নের কপি, বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা হিসাব বিবরণী, অর্জিত স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের ক্রয়-বিক্রয়ের দলিল এবং তাদের ওপর নির্ভরশীলদের চাকরি বা ব্যবসা অথবা অন্য উৎস থেকে প্রাপ্ত আয়ের বিবরণীসহ সংশ্লিষ্ট রেকর্ড তদন্ত করবে বলে জানা গেছে।

তাছাড়া শাসক দলের যেসব নেতার নাম এসেছে, তাদের আর্থিক অবস্থা কী রকম ছিল তাও খতিয়ে দেখবে সংস্থাটি। পাশাপাশি কারা কারা দেশের বাইরে অর্থ পাচার করা ছাড়াও কোন কোন দেশে বাড়ি আছে তাও অনুসন্ধান চালানো হবে। সরকারবিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে আসা আগের মামলাগুলো সামনে আনা হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করে দুদকের ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে কাউকে দুদকে তলব করা হচ্ছে তা ঠিক নয়। যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত তাদেরই আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। সব পেশার লোকদের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ আসছে। বর্তমান ও সাবেক এমপিদের কেউ কেউ সরাসরি যোগাযোগ করছেন আমাদের সঙ্গে। দুদকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও দেখা করার চেষ্টা করছেন কেউ। আবার প্রভাবশালী রাজনীতিকদের মাধ্যমেও চাপ দেওয়া হচ্ছে। রাজনীতির বাইরে থাকা লোকজনদের দিয়েও তদবির চলছে।

ওই কর্মকর্তারা আরও বলেন, অন্তত দেড়শ রাজনৈতিক নেতার ওপর নজরদারি করা হচ্ছে। তাদের বিষয়ে দুর্নীতির অভিযোগ এসেছে দুদকে। অভিযোগগুলো তদন্ত করে তাদের নোটিস দেওয়া হবে। তারপরও আমরা অনুসন্ধানে যাব। তাছাড়া ক্যাসিনোকান্ডে যারা জড়িত ছিল, তাদের বিষয়েও আমরা নতুন করে তদন্ত করব। যারাই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকবে তাদের বিষয়ে পিছু হটবে না দুদক। অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, ঘুষ, সরকারি সম্পত্তি দখল, ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা বিষয়ে অনেকের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ আসছে। বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে টিআর, কাবিখা কর্মসূচি বাস্তবায়নে দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। আবার কারোর বিরুদ্ধে ক্যাসিনো ব্যবসা ও অর্থ পাচারের অভিযোগ আছে। অনুসন্ধান করে অভিযোগ প্রমাণ না হলে ছাড় দেওয়া হবে।

দুদক সূত্র জানায়, যাদের বিষয়ে দুদক অনুসন্ধান চালাবে তারা হচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বরিশাল-৪ আসনের সংসদ সদস্য পংকজ নাথ, মাদারীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবদুস সোবহান মিয়া, ভোলা-৩ আসনের সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, সাবেক সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মজিবুর রহমান, আওয়ামী লীগ নেতা আফসার উদ্দিন মাস্টার, বনানী গোল্ডেন ক্লাবের আবদুল আওয়াল ও আবুল কাশেম, জামাল হোসেন, সাংসদ জাফর আলমের নাম আছে। তাছাড়া কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হাজি রবিউল ইসলাম ও আতাউর রহমান আতার বিরুদ্ধে টেন্ডারবাজি, নিয়োগবাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজে এবং পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদ অর্জন করেছেন বলে দুদকে অভিযোগ এসেছে। পিরোজপুরের সাবেক সাংসদ এমএ আউয়াল, ফেনী-২ আসনের সাংসদ নিজাম উদ্দিন হাজারী, নরসিংদী-২ আসনের সাবেক স্বতন্ত্র সাংসদ কামরুল আশরাফ খান পোটন, ময়মনসিংহ-৯ আসনের সাংসদ আনোয়ারুল আবেদীন খান, চাঁদপুর-৪ আসনের সাবেক সাংসদ শামসুল হক ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও নতুন করে অনুসন্ধান হওয়ার কথা রয়েছে।

বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য বরকত উল্লা বুলু, সালাউদ্দিন আহমেদ, আবদুল আউয়াল মিন্টু, এম মোর্শেদ খান, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, তাবিথ আউয়াল, লালমনিরহাট-৩ আসনের সাবেক সাংসদ আসাদুল হাবিব দুলু, সাবেক সাংসদ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, নোয়াখালী-৪ আসনের মো. শাহজাহান, বগুড়া-৩ আসনের সাবেক সাংসদ আবদুল মোমিন তালুকদার ও ঝিনাইদহ-৪ আসনের সাবেক সাংসদ শহিদুজ্জামান বেল্টু, মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের সাবেক সাংসদ ও বিকল্পধারা বাংলাদেশের শীর্ষ নেতা মাহী বি. চৌধুরী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আলোচিত সাবেক কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা এ কে এম মমিনুল হক সাঈদ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি (বহিষ্কৃত) ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট, যুবলীগ নেতা জি কে শামীম, আরেক যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াসহ অন্তত ৭০ জন নেতার নাম রয়েছে তালিকায়।

২০১৯ সালে ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান চালানোর পর ওই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর অবৈধ সম্পদ অর্জনকারী এবং বিদেশে অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ক্যাসিনো কারবারে জড়িত অন্তত ৪০ জনের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু হলেও রহস্যজনক কারণে তা সামনে এগোতে পারেনি। এমনকি কয়েকজনকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতিও দেওয়া হয়েছে। তবে যুবলীগের বহিষ্কৃত সভাপতি সম্রাট, খালেদ আহমেদ ভূঁইয়া, জি কে শামীমসহ শীর্ষ ২৪ জনের বিরুদ্ধে ২৩টি মামলা করে সংস্থাটি। তার মধ্যে ১২ মামলায় চার্জশিট দেওয়া হয়। তাদের ৫৮২ কোটি টাকার সম্পদও জব্দ করে দুদক।

সাবেক কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদ, তারেকুজ্জামান রাজীব, এনামুল হক আরমান, সেলিম প্রধান, জাকির হোসেন, কাজী আনিছুর রহমান ও সুমি রহমান, শফিকুল আলম ফিরোজ, লোকমান হোসেন ভূঁইয়া, পাগলা মিজানসহ অন্যদের বিরুদ্ধে আবারও নতুন করে তদন্ত শুরু করার কথা রয়েছে। জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে মনোনয়ন বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ সম্পত্তির বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগে বলা হয়, ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনে জাতীয় পার্টির চারজন মহিলা সংসদ সদস্যর মনোনয়ন কার্যক্রমে ১৮ কোটি ১০ লাখ টাকা উৎকোচ নেন জিএম কাদের। উৎকোচের বিনিময়ে ওই চার নারীকে জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়। তাছাড়া জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব এবং পটুয়াখালী-১ আসনের সাবেক এমপি এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারের বিরুদ্ধেও অনুসন্ধান করবে দুদক।

অভিযোগের বিষয়ে সাবেক সংসদ সদস্য বরকত উল্লা বুলু গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করার জন্য সরকার আমাদের হয়রানি করছে। কয়েক দিন পরপর দুদক থেকে চিঠি আসে। ভুয়া সাক্ষী তৈরি করে আমাকেসহ অন্য নেতাদের শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করছে। আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, এমপি ও নেতারা হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। তাহলেই আমরা মনে করব দুদক স্বতন্ত্রভাবে কাজ করছে।’

ভোলা-৩ আসনের সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, নরসিংদী-২ আসনের সাবেক স্বতন্ত্র সাংসদ কামরুল আশরাফ খান পোটনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি। দুজনের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। মাদারীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবদুস সোবহান মিয়ার মোবাইলে কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।



বার্তা সূত্র

সর্বাধিক পঠিত

সর্বশেষ সংবাদ