Skip to content

ভারতে সনাতন ধর্ম নিয়ে কুমন্তব্য মুখ্যমন্ত্রীর ছেলের, দেশ জুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া

ভারতে সনাতন ধর্ম নিয়ে কুমন্তব্য মুখ্যমন্ত্রীর ছেলের, দেশ জুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া

উদয় নিধি স্টালিন দক্ষিণ ভারতের বৃহত্তর প্রদেশ তামিল নাড়ুর মন্ত্রী। ধর্ম বিশ্বাসে এই নেতা ও তার পরিবার খ্রিস্টান। সম্প্রতি সনাতন ধর্মের বিরুদ্ধে কুমন্তব্য করায় তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রীর পুত্র উদয়নিধি স্তালিনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করলেন একজন বরিস্ট আইনজীবী। এছাড়াও যোগি রাজ্য উত্তর প্রদেশ এবং বিহারেও মামলা হয়।

শুধু উদয়নিধি নয়, তাকে সমর্থন করে প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে আরেক কদম এগিয়ে সব ধর্মকে নিয়েই কুমন্তব্য করে বসে কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি মল্লিকার্যুন খার্গের পুত্র কর্ণাটকের মন্ত্রী প্রিয়াংক খার্গে। তার বিরুদ্ধেও মামলা হয়। 

শুধু আদালতেই নয়, দেশ জুড়ে এদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ আন্দোলনে পথে নামে বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠন। তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যাক্ত করে দেশ জুড়ে সনাতনীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে প্রভাশালী ধর্মগুরুরা। 

এদিকে দক্ষিণের দুই অপরিপক্ক ও অল্প শিক্ষিত প্রভাবশালী নেতা পুত্র নেতাদের পরপর অবাঞ্ছিত মন্তব্যে মহা বিপাকে পড়েছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন মোদি বিরোধি ইন্ডিয়া জোট। একে ২০২৪ এর ভোটের আগে মোদি বিরোধী জোটের আত্মঘাতী গোল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

উল্লেখ্য উদয়নিধি স্টালিন তামিল নাড়ুর মুখ্যমন্ত্রীর পুত্র এবং নিজেও সেই রাজ্যের মন্ত্রী। এই উদয়নিধি ও তার মুখ্যমন্ত্রী পিতা সহ পুরো পরিবার খ্রিস্টান ধর্মে বিশ্বাসী। 

এদিকে উদয়নিধির এজাতীয় মন্তব্যে দেশ জুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দিয়েছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে। দিল্লি, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটকসহ উত্তর ভারতে ও উদয়নিধির বিরূদ্ধে রাস্তায় নেমে আন্দোলন, তার অনতিবিলম্বে ক্ষমা প্রার্থনা ও গ্রেপ্তারের দাবি উঠেছে।

প্রসঙ্গত গত ৫ই আগস্ট তামিল নাড়ুর ক্ষমতাসীন দল ডি এম কে নেতা তথা সেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর পুত্র যে নিজে ও সেই রাজ্য মন্ত্রিসভার সদস্য একটি অনুষ্ঠানে ভাষণ দিচ্ছিলেন। সেই ভাষণ কালে উদয়নিধি অপ্রাসঙ্গিক ভাবে সনাতন ধর্মকে টেনে আনে।

উদয় বলেন, “সনাতন ধর্ম সামাজিক ন্যায় বিরোধি। সনাতন ডেঙ্গু, করোনা ম্যালেরিয়ার মত সংক্রামক ব্যাধি। তাই এর শুধু বিরোধিতাই নয়, একে সমূলে বিনাশ করা উচিৎ।” বক্তব্যটি তামিল ভাষায় হওয়ায় এর মর্মার্থ হয়ে প্রকাশ্যে আসতে একটু দেরি হয় বটে। তবে তার এজাতীয় মন্তব্য সামনে আসতেই দেশ জুড়ে তুমুল ঝড় উঠে। 

এখানে উল্লেখ্য বরাবরই দ্রাবিড় নেতৃত্ব বিশেষ করে উদয় নিধিদের পরিবার হিন্দি ও হিন্দু বিরোধী বলে পরিচিত। হিন্দি ভাষার প্রতি ও বিভিন্ন সময়ে বিষেদগার করেছে উদয় সহ তার দলের বহু নেতা। সেসব নিয়ে আগেও প্রচুর বিতর্ক ও অশান্তি হয়েছে। 

তবে এই পর্বে উদয় নিধি সরাসরি সনাতন ধর্মের বিরুদ্ধে এমন কুমন্তব্য করে দেশের ৭৫% এর বেশি হিন্দু সনাতনী মানুষদের ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। এখানে উল্লেখ্য উদয় নিধিদের পরিবার তামিলনাড়ুতে অত্যন্ত প্রভাবশালী পরিবার। 

বর্তমানে তার পিতা তামিল নাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী। এর আগে উদয়ের দাদু করুণা নিধি দীর্ঘদিন তামিল নাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তার দাদু পেরিয়ার ও কট্টর সনাতন ও হিন্দি বিরোধী ছিলেন। তার বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের দালালি করার অভিযোগও করেন অনেকে।

এদিকে উদয় নিধীর এই মন্তব্যে সবচেয়ে বিপাকে পরেছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন মোদি বিরোধি ২৬ দলীয় ইন্ডিয়া জোটের। কারণ উদয় নিধীদের দল ডি এম কে এই জোটের অন্যতম শরিক। উদয়নিধির এ জাতীয় মন্তব্যে খ্রিস্টান অধ্যুষিত তামিল নাড়ুর রাজনীতিতে উদয়নিধিদের খুব বেশি ক্ষতি না হলেও সনাতনী সংখ্যাধিক্যের সারা ভারতে চরম ক্ষতি হবে মোদি বিরোধী জোটের। 

বিশেষ করে যেই বিহার, উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, উড়িষ্যা, উত্তরাখণ্ড , আসামের মত বড় রাজ্যগুলোতে ২০২৪ এর ভোটে বিজেপি জোট তথা মোদি ব্রিগেডকে জোর টক্কর দেয়ার স্বপ্ন সাজিয়েছে বিরোধিরা, সেই স্বপ্নকে অনেকটা দুর্বল করে দিয়েছে ডি এম কের এই অপরিণত নেতা।

এই বিপদ বুঝেই মোদি বিরোধি ইন্ডিয়া জোটের প্রধান দল কংগ্রেস সহ অনেকেই জোট সঙ্গি ডি এম কে নেতার বক্তব্যের সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই, তারা সনাতন সহ সব ধর্ম ও ধর্মবলম্বীদের শ্রদ্ধা ও সম্মান করেন বলে জানিয়ে দিয়ে নিজেদের আলাদা করে নিচ্ছে। 

একদিকে যখন উদয় নিধির এই জাতীয় মন্তব্যে ২৪ এর ভোট পরিকল্পনায় সৃষ্ট ড্যামেজ কন্ট্রোলের পথ খুঁজছে কংগ্রেস, তখন উদয় নিধির মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে পুনরায় বেফাঁস মন্তব্য করে বিজেপির হাতের অস্ত্রে আরও শান করিয়ে দেয় আরেক দক্ষিণী কংগ্রেস নেতা।

এই পর্বে একেবারে রাহুল গান্ধীদের জাতিয় কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খার্গের পুত্র প্রিয়ঙ্ক খারগে। এই নেতা ও পারিবারিক পৈত্রিক সূত্রে অল্প বয়সেই নেতা এবং কর্ণাটকে মন্ত্রী হয়েছে। উদয়নিধির চেয়ে এক কদম এগিয়ে এই নেতা শুধু সনাতন নয়, “কোন ধর্মই সামাজিক ন্যায়, মানবতা ও সমতা শেখায় না “। তার বক্তব্যের নির্যাস ছিল সব ধর্মেরই সমূল নাশ প্রয়োজন। 

এদিকে এই দুই অপরিণত ও স্বল্প শিক্ষিত নেতার পর ধর্মকে কুষ্ঠু, ক্যানসারের চেয়েও ভয়ংকর বলে ধর্ম যুদ্ধের বিতর্কের আগুনে ঘী ঢেলে দেন দক্ষিণেরই আরেক তাবড় নেতা। তিনি ডি রাজা। এই কথিত উচ্চ শিক্ষিত বামপন্থি নেতার দল সিপিআই ও কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন মোদি বিরোধি মহাজোটের সঙ্গি দল।

২০২৪ এর লোকসভা ভোট যেখানে শিরে সংক্রান্তির মত সামান্য সময়ের ব্যবধানে এসময়ে দক্ষিণী নেতাদের এজাতীয় মন্তব্যে মহাবিপাকে কংগ্রেস, আরজেডি, সমাজবাদী, জে ডি ইউ, তৃণমূল কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি, শিব সেনার মত দলগুলো। 

কারণ দক্ষিণে বিজেপির অবস্থান আগেও ভালো ছিলো না। এখনও বা আগামি ২০২৪ এর লোকসভা ভোটে ও তাদের হারানোর কিছু নেই শাসক দল বিজেপি অফিসিয়ালি ডি এম কে নেতা উদয় নিধির সনাতন ধর্মের বিরুদ্ধে কুমন্তব্য করে সনাতনীদের নির্মূল করার আহ্বানের প্রতিবাদ করে বটে, তবে সেইভাবে মাঠে নামেনি। 

বিজেপি উদয়নিধীর মত অপরিণত নেতার মন্তব্যকে পাত্তা না দিয়ে আপাতত সাধারণ দেশবাসীর প্রতিক্রিয়া দেখছে। নিজেদের তুনে বিরোধীদের নিজে থেকেই সেচ্ছায় তুলে দেয়া বান লোকসভার ভোটের রণাঙ্গনে মোদি ব্রহ্মাস্ত্র হিসাবে প্রয়োগ করবে বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বক্তব্য।

যদিও বিক্ষিপ্ত ভাবে বিজেপি নেতারা খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বি স্টালিন পরিবারের হিন্দু ও হিন্দি বিরোধি এবং অসহিষ্ণু বিকৃত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করছেন। 

অন্যদিকে বিতর্কের আগুন বাড়ছে দেখে উদয়নিধি তার বক্তব্যকে বাই পাস করতে চেয়েছে এই বলে যে আমি হিন্দু ধর্ম বা হিন্দুদের বিরুদ্ধে কিছু বলিনি। বলেছি সনাতনি সংস্কার, জাতপাত আচার অনুষ্ঠানের বিরূদ্ধে। যদিও তার এই জাতীয় যুক্তিতে জ্বলে উঠা বিতর্কের আগুন মোটেও নেভেনি বরং রাজ্যের পর রাজ্যে ছড়াচ্ছে। 

শনিবার থেকে দিল্লিতে  জি ২০ র শীর্ষ সম্মেলন শুরু হচ্ছে। এসময়ে বিশ্ব নেতৃত্বের পাশাপাশি বিশ্ব ব্যাপী সাংবাদিকরা ভারত তথা দিল্লিতে অবস্থান করছে। এমতাবস্থায় এসময়ে বিজেপি ইস্যুটিকে নীরবে শান দিলেও, সম্মেলন শেষ হতেই এই অস্ত্র নিয়েই ইন্ডিয়া জোটকে বধে নামবে বলে বিজেপি সূত্রের খবর।

যাই হোক সনাতন নাশের আহ্বান করা ডি এম কে নেতার বিরুদ্ধে ধর্মীয় ভাববেগে আঘাত, সম্প্রীতি নষ্টকারী ও ধর্মের ভিত্তিতে হিংসা ছড়ানোর অভিযোগে মামলা হয়। 

ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৯৫ এ  এবং ১৫৩ এ এর অধীনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, শুধু উদয় নিধি নয়, তার মন্তব্যকে সমর্থন করার জন্য কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকা অর্জুন এর বিরুদ্ধেও মামলা করা হয়েছে।

শনিবার একটি অনুষ্ঠানে তামিলনাড়ুর ক্রীড়া ও যুব বিষয়ক মন্ত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্টালিনের পুত্র উদয় নিধি সনাতন ধর্মকে ডেঙ্গু এবং ম্যালেরিয়ার মতো রোগের সাথে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, সনাতন ধর্মকে শুধু বিরোধিতা করলেই চলবে না, নির্মূল করা উচিত। এদিকে উদয় নিধির মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটির সভাপতি মল্লিকার্জুন খার্গের ছেলে প্রিয়াঙ্ক খার্গে বলেন, কোনও ধর্মই মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করে না, তাই ধর্ম একটি রোগের মতো। 

এরপরেই ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষোভ শুরু হয়। এদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় এমনকি সুপ্রিম কোর্টেও মামলা হয়। একটি মামলায় অভিযোগকারী একজন সুপ্রিম কোর্টের বরিস্ট আইনজীবী এস.লোধি। 

সুপ্রিম কোর্টের অন্য একজন আইনজীবী উদয়নিধির বিরুদ্ধে দিল্লি পুলিশের কাছেও একটি অভিযোগ পত্র দায়ের করেছেন। 



বার্তা সূত্র