Skip to content

ভারতে মসজিদ-মন্দির বির্তক ও খল রাজনীতি : অভিজিৎ বড়ুয়া | sangbad.net.bd

ধর্মের অবমাননা ধার্মিকরাও করে :   জিয়াউদ্দীন আহমেদ | sangbad.net.bd

: বৃহস্পতিবার, ০৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

ভারতে পৌরাণিক কাহিনীকে ঐতিহাসিক তথ্যের ওপর দিয়ে হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা ভারতে মুসলিম স্মৃতিস্তম্ভ এবং মসজিদকে মন্দিরে রূপান্তরিত করার প্রচার চালাচ্ছে এবং বাবরি মসজিদের ধ্বংসস্তূপের ওপর রাম মন্দির নির্মাণের রায়ের পর এবার ভারতে আরও একটি প্রাচীন মসজিদের ভেতর মন্দিরের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছে। বারাণসী এলাকার জ্ঞানবাপী মসজিদ কমপ্লেক্সের ভেতর এই মন্দিরের অস্তিত্ব ছিল হিন্দুদের এই দাবি মেনে নিয়ে সেখানে তাদের প্রার্থনা করার অনুমতি দিয়েছে আদালত। হিন্দুদের পবিত্র শহর বারাণসীতে অবস্থিত জ্ঞানবাপী মসজিদের হিন্দুদের ধ্বংসাবশেষের (শিবলিঙ্গ) উপস্থিতির দাবির পরে মসজিদের একটি অংশ সিল করে দেয় আদালত। বিশিষ্ট মুসলিম রাজনৈতিক নেতা আসাদউদ্দিন ওয়াইসিসহ অনেকে বলছে, ‘বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে সম্প্রতি রাম মন্দির প্রতিষ্ঠার ঘটনার সঙ্গে মসজিদকে মন্দিরে রূপান্তর করার চলমান প্রচারণার মধ্যে মিল রয়েছে।’ মে মাসে, একজন প্রবীণ বিজেপি নেতা দাবি করেছিলেন যে, মুঘলরা ৩৬,০০০টি হিন্দু মন্দির ধ্বংস করেছে এবং তারা ‘এক এক করে সমস্ত মন্দির পুনরুদ্ধার’ করবে।

বর্তমান নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার সমর্থিত হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা ভারতের মুসলিম সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে একের পর এক প্রচারণা চালাচ্ছে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে সংঘটিত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলÑ বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব আইন, মুসলিম কর্মীদের কারারুদ্ধ করা, হিজাবের বিরুদ্ধে প্রচারণা এবং দরিদ্র মুসলমানদের বাড়িঘর ভেঙে ফেলা। এখন তারা ভারতের মধ্যযুগীয় যুগে মুসলিম শাসকদের দ্বারা নির্মিত তাজমহল এবং কুতুব মিনারসহ ঐতিহাসিক মসজিদ এবং স্মৃতিস্তম্ভগুলোকে মন্দিরে রূপান্তর করার প্রচার চালাচ্ছে। হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলগুলোর নেতারা আদালতে পিটিশন দাখিল করছেন, প্রকাশ্য বিবৃতি দিচ্ছেন, স্মৃতিস্তম্ভ এবং মসজিদগুলোকে মন্দির হিসেবে ঘোষণা করার দাবিতে বিক্ষোভ করছেন। তারা দাবি করে যে, এই স্মৃতিস্তম্ভ এবং মসজিদগুলো মধ্যযুগীয় মুসলিম শাসকরা মন্দিরগুলো ভেঙে দিয়ে তৈরি করেছিলেন, তাই এখন তাদের এই জায়গায় প্রার্থনা করার অধিকার দেয়া উচিত।

হিন্দু জাতীয়তাবাদী ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতা রজনীশ সিং উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদ হাইকোর্টে একটি পিটিশন দাখিল করেছেন, যেখানে বিজেপির কট্টর সন্ন্যাসী যোগী আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী। তার আবেদনে, তিনি দাবি করেছিলেন যে তাজমহল একটি পুরানো হিন্দু মন্দির, যার নাম ছিল ‘তেজো মহালয়া’ এবং স্মৃতিস্তম্ভের কিছু বন্ধ গেট খোলার দাবি করেছিলেন। দিল্লিতে ১২ শতকে মুসলিম রাজা কুতুব-উদ-ইন-আইবেক দ্বারা নির্মিত আরেকটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য কুতুব মিনার, হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা এটিকে সাবেক মন্দির বলে দাবি করচ্ছে।

গত কিছুদিন আগে মোদির নেতৃত্বে অযোধ্যা রাম মন্দিরের উদ্বোধন, তার ভারতীয় জনতা পার্টির ৩৫ বছরের পুরনো প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছে। অযোধ্যা মসজিদ ধ্বংসের ফলে ভারত জুড়ে দাঙ্গা শুরু হয়েছিল যে কর্তৃপক্ষের মতে কমপক্ষে ২০০০ মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের বেশির ভাগই মুসলমান। জ্ঞানবাপী মসজিদ, মথুরার কৃষ্ণ জন্মভূমি-শাহী ইদগাহ মসজিদের সঙ্গে, অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণের প্রচারণার সময় বিজেপি, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) এবং আরএসএস যুক্তি দিয়েছিল যে তিনটি মসজিদই হিন্দু মন্দির ভেঙে তৈরি করা হয়েছিল। অনেক হিন্দু বিশ্বাস করেন যে জ্ঞানবাপী মসজিদটি একটি প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের ওপর নির্মিত, এটি ভগবান শিবের উদ্দেশে উৎসর্গ করা আসল কাশী বিশ্বনাথ মন্দির। ১৯ ডিসেম্বর, ২০২৩-এ, এলাহাবাদ হাইকোর্ট জ্ঞানবাপী মসজিদ মামলায় মুসলিম পক্ষের দায়ের করা পাঁচটি পিটিশন খারিজ করে। ২৭ জানুয়ারি ২০২৪ জেলা আদালত পুরোহিতদের পরিবারের সদস্যদের মসজিদ কমপ্লেক্সের একটি সেলারে প্রার্থনা করার অনুমতি দিয়েছে। ব্যাসজি কা তেহখানা নামে পরিচিত এই সেলারটি সিলমুক্ত করা হয়েছে এবং ভোরের দিকে একটি পূজা অনুষ্ঠিত হয়। বারাণসীর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এস রাজালিঙ্গম বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের জানান, ‘আমাকে আদালত যে নির্দেশ দিয়েছে তা পালন করা হয়েছে।’ কাকতালীয়ভাবে ৩৮ বছর আগে ১৯৮৬ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারিই অযোধ্যার বাবরি মসজিদের তালা খোলা হয়েছিল।

অবিভক্ত ভারতবর্ষে ২৫০০ বছর আগে অসংখ্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আবির্ভাব হয়েছিল। সর্বমোট ৬২টি ধর্মীয় সম্প্রদায় নিজ নিজ ধর্মমত প্রচার করে এবং নিজ নিজ ধর্মীয় প্রথা ও আচার-ব্যবহারকে কেন্দ্র করে এই ধর্মপ্রম্প্রদায়গুলো গড়ে উঠেছিল। সমাজ ছিল ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্র বর্ণে বিভক্ত। এরপর আর্বিভাব হয় বুদ্ধ ধম্মের। পরবর্তী কয়েকশ বছর বুদ্ধ ধম্ম অবিভক্ত ভারতবর্ষে প্রাধান্য বিস্তার করে। তখন গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহার, যা পরবর্তীকালে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুরা দখল করে ও বুদ্ধ মূর্তিকে হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি বানিয়ে নেয়। বৌদ্ধ ও জৈনদের উপাসনালয়গুলো দখল করে বৈষ্ণব বা শৈব মন্দিরে রূপান্তরিত করে। দশকের পর দশক ধরে সালেমের এক মন্দিরে পুজো করে আসছেন হিন্দুরা। মন্দিরে থাকা মূর্তিকে লোকজ দেবতা থালাভাত্তি মুনাপ্পন হিসেবে স্থানীয়রা পুজো করছেন। কিন্তু সেই মূর্তি আদতে বুদ্ধের। আর মন্দিরটি বৌদ্ধ স্তূপ।

মাদ্রাজ হাইকোর্টের নির্দেশ পেয়ে সালেমের ওই মন্দিরের সমীক্ষা শুরু করেছিল তামিলনাড়–র পুরাতত্ত্ব বিভাগ। সেখানেই এই মন্দিরের প্রকৃত ‘রূপ’ সামনে এসেছে। এবার মন্দিরটিকে বৌদ্ধ স্তূপ হিসেবে প্রচার করতে হবে বলে নির্দেশ দিয়েছে মাদ্রাজ হাইকোর্ট। তামিলনাড়–র প্রাচীন মন্দিরগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকে দ্য হিন্দু রিলিজিয়াস অ্যান্ড চ্যারিটেবল এনডাওমেন্টস (এইচআর অ্যান্ড সিই)। তাদের এই জায়গার ভিতরে বোর্ড দিয়ে মূর্তি বুদ্ধের বলে জানাতে বলা হয়েছে। এছাড়া বৌদ্ধ বিহার যা হিন্দু মন্দিরে রূপান্তরিত হয়েছিল, তা হলো : পুরী জগন্নাথ, কাশী বিশ্বনাথ, তিরুপতি মন্দির, কেদারনাথ, বদ্রীনাথ এবং অমরনাথ।

গৌতমবুদ্ধের মূর্তিকে তিরুপতি বালাজীর রূপ দেয়া হয়েছে, কেদারনাথ, মুন্ডেশ্বরীও বুদ্ধমূর্তি। কারণ অশোকের সময়ে ভারতবর্ষের অধিকাংশ জনগণ বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হয়েছিল। হিন্দুধর্মের ব্যাপক পতন ঘটেছিল। সুতরাং সেই সময়ে যে মন্দিরগুলো তৈরি হয়েছিল সেগুলোকে হিন্দু মন্দির হতে পারে না। শঙ্করাচার্যই ৮০০-৯০০ খ্রিস্টাব্দে হিন্দুধর্মকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন এবং তিনি ভারতবর্ষ জুড়ে জোর করে এটি করেছিলেন, বৌদ্ধদের হত্যা, বৌদ্ধ বিহারগুলো ধ্বংস বা দখল করেন। তিনি ভারত জুড়ে সমস্ত বড় বৌদ্ধ বিহারগুলোকে হিন্দু মন্দিরে রূপান্তরিত করেছিলেন। ৬৫০ খ্রীষ্টপূর্ব হতে ৯০০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত নির্মিত মন্দিরগুলো বৌদ্ধ মন্দির হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

বর্তমানে ভারতে যে লিঙ্গপূজা করা হয়, তা বৌদ্ধ স্তূপ পূজা ব্যতীত অন্য কিছু নয়। সেরূপ স্তূপ পূজা করতে স্বয়ং চোখে দেখেছেন বলে চীন হতে আসা চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং (৬০২-৬৬৪) তার লিখিত পুস্তক ‘সুজুকি’তে উল্লেখ করেছেন। পরবর্তী সময়ে ব্রাহ্মণেরা ছোট ছোট স্তূপসমূহকে শিবলিঙ্গ এবং স্তূপপূজাকে লিঙ্গপূজা নামে প্রসারিত করেছে। এ সম্পর্কে বিস্তৃত রয়েছে হিউয়েন সাং এর ভ্রমণ বিবরণী ঝট-ণট-কও’র ইংরেজি সংস্করণ ইংল্যান্ডের প্রখ্যাত অনুবাদক স্যামুয়েল বেল (১৮২৫-১৮৮৯) কর্তৃক অনুদিত ‘বুদ্ধিস্ট রেকর্ডস অব দ্য ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড’ গ্রন্থের দ্বিতীয় ভাগের পৃষ্টা সংখ্যা ১৪৬, ১৪৭। গ্রন্থটি ১৮৮৪ সালে নেব্রাস্কা, ইউ. এস. এ. হতে প্রকাশিত হয়েছিল। ভারতে ফা-হিয়েন (৩৩৭-৪২২) নামে অন্য এক প্রসিদ্ধ চৈনিক পরিভ্রাজক এসেছিলেন। তিনি লিখেছেনÑ ‘বুদ্ধের খোঁজে চীন হতে বের হয়ে আমি জম্বুদ্বীপে (ভারতে) এসেছি। জম্বুদ্বীপে বুদ্ধ ব্যতীত অন্য কোনো ইতিহাস আমার উপলব্দ হয়নি।’

বৌদ্ধ স্থান অযোধ্যা, রামের নয়। অযোধ্যা হলো ঐতিহাসিক এক বৌদ্ধ নগরী, যা সাকেত নামেও পরিচিত। এখানে এখনও এক বিশাল স্তূপে ভগবান তথাগত বুদ্ধের কেশ এবং নখধাতু মাটির আবরণে তলে পড়ে রয়েছে। সম্রাট অসোকের সময়ে সাকেত (অযোধ্যা) এক অত্যন্ত মহত্বপূর্ণ কেন্দ্ররূপে গড়ে উঠেছিল। সম্রাট অশোক বিশাল বুদ্ধ বিহার এবং অনেক সঙ্ঘারাম নির্মাণ করিয়েছেন। ১৮৬২ সালে বৃটিশ পুরাতত্ববিদ জেনারেল আলেক্সজান্ডার কানিংহাম (১৮১৪-১৮৯৩) এ ভূ-ভাগের পুরাতত্ব সর্বেক্ষণ করিয়েছেন এবং তিনি সমস্ত বৌদ্ধ স্মারক সমূহের চিহ্নিত করেছিলেন।

[লেখক : প্রাবন্ধিক]



বার্তা সূত্র