ভারতের নতুন বিধি: বাংলাদেশের রপ্তানিতে ভাটা পরার শঙ্কা

সজীব হোম রায়, কালের কণ্ঠ: ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিশাল বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে। রয়েছে নানা চুক্তি। এতে লাভবান হয় উভয় পক্ষই। কিন্তু গত আগস্টে ভারত সরকার কাস্টমস রুলস, ২০২০ (অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব রুলস অব অরিজিন আন্ডার ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্টস) জারি করেছে। এতে পণ্যের উৎপাদনপ্রক্রিয়াসহ কয়েকটি স্পর্শকাতর বিষয়ে রপ্তানিকারকরা তথ্য দিতে বাধ্য থাকবে। এটি কার্যকর হলে ভারতের রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সাহায্য ছাড়াই যেকোনো পণ্য ভেরিফিকেশন বা যাচাই করতে পারবে দেশটির কাস্টমস।

এই রুলসের ফলে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এ বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো গত সপ্তাহে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে। ভারতীয় রুলসের অন্তত চারটি ধারা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে সংস্থাটি। তবে সরকার আশা করছে, আলোচনার মাধ্যমে এ সমস্যার সুরাহা সম্ভব হবে। বিষয়টি নিয়ে শিগগিরই বৈঠক ডাকবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এটি পর্যালোচনা (স্টাডি) করব। ভারত আমাদের বন্ধু দেশ। কোনো সমস্যা থাকলে আমরা পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে তা সমাধান করব। আশা করছি কোনো সমস্যা হবে না। ভারতের নতুন হাইকমিশনার বেশ পজিটিভ মানুষ। তাই এটিতেও পজিটিভ কিছু হবে বলে আমার মনে হয়। আমরা বিষয়গুলো নিয়ে শিগগিরই বসব।’

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান এ এইচ এম আহসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভারতের নতুন রুলস কার্যকর হলে বাংলাদেশের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এখানে এমন অনেক শর্ত দেওয়া হয়েছে যা মানা সম্ভব নয়।’ তিনি বলেন, এই রুলস শুধু যে বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য তা নয়। এটা নেপাল, শ্রীলঙ্কাসহ সাফটা, সাপটা ও আপটা চুক্তির আওতাধীন যত দেশ আছে সবার জন্যই প্রযোজ্য। তাই এই রুলস কার্যকর হলে সবারই ক্ষতি হবে।

সূত্র মতে, ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশ বর্তমানে তিনটি আঞ্চলিক বাণিজ্যচুক্তির আওতায় পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধা পায়। চুক্তিগুলো হলো সার্ক প্রেফারেনশিয়াল ট্রেডিং অ্যাগ্রিমেন্ট (সাপটা), সাউথ এশিয়ান ফ্রি ট্রেড এরিয়া (সাফটা) এবং এশিয়া প্যাসিফিক ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (আপটা)। রুলসটি কার্যকর হলে এসব চুক্তির আওতায় প্রাপ্ত শুল্ক সুবিধা বাধাগ্রস্ত হবে। ইপিবি চিঠিতে বলেছে, একটি বহুপক্ষীয় চুক্তির আওতায় প্রদত্ত সুবিধা জাতীয়ভাবে প্রণীত ‘রুলস’ দিয়ে ব্যাহত করা যায় কি না তা বিশদভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বিবেচ্য রুলসটি কার্যকর করার ফলে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি হ্রাস পাবে বলে মনে হয়।

যা আছে রুলসটিতে : পুরো রুলস নয়, বাংলাদেশের আপত্তি কয়েকটি ধারা নিয়ে। রুলসটির ৪-এর (এ) ও (বি) অনুযায়ী, রপ্তানিকারকদের পণ্যের উৎপাদন প্রক্রিয়া ও ব্যয় সম্পর্কিত স্পর্শকাতর তথ্য তথা ব্যয় বিবরণী দাখিল করতে হবে। পণ্যে ব্যবহৃত কাঁচামালের আমদানি তথ্যও দাখিল করতে হতে পারে। ইপিবি বলছে, রপ্তানিকারকরা এসব তথ্য ও প্রমাণ সরকারি সংস্থা/বিভাগকে দিতে বাধ্য থাকতে পারে, কোনো ব্যক্তিমালিকানাধীন আমদানিকারককে নয়। আমদানিকারককে এসব তথ্য দিলে ব্যাবসায়িক গোপনীয়তা বজায় রাখায় ব্যাঘাত সৃষ্টি হবে। এ ধরনের শর্ত মূলত নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার তথা সার্বিকভাবে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানিকে বাধাগ্রস্ত করবে।

বাংলাদেশের কোন পণ্য ভারতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে তার সার্টিফিকেট অব অরিজিন ইস্যু করে ইপিবি। রুলস-৫-এর সাব-রুলে (৫) এ বিষয়ে ভারতের কাস্টমসকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। নতুন রুলসে কাস্টমসের কমিশনারকে সার্টিফিকেট অব অরিজিন যাচাই না করেই প্রেফারেনশিয়াল রেট অব ডিউটি নাকচ করার এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। এতে রপ্তানিকারকরা সব সময় অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকবে। ফলে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি কমার ঝুঁকি থাকবে।

রুলস-৬-এর সাব-রুলস (৩)-এর (বি) অনুযায়ী, ভেরিফিকেশন রিকোয়েস্টের ৬০ দিনের মধ্যে প্রত্যাশা অনুযায়ী না পাওয়া গেলে প্রেফারেনশিয়াল ট্যারিফ নাকচের অধিকার শুল্ক কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় পক্ষ কালক্ষেপণ করে যাচাইয়ের অনুরোধ করলে তার জবাব যথাসময়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে দেরি হতে পারে। ফলে ওই পণ্য বাতিল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

রুল-৭ অনুযায়ী, কোনো রপ্তানি পণ্যের উৎপাদনে অরিজিনাল ক্রাইটেরিয়া পূরণে ব্যর্থ হলে রপ্তানিকারকের অন্যান্য রপ্তানি চালানের ক্ষেত্রে যাচাই ছাড়া অগ্রাধিকারভিত্তিক শুল্ক ছাড় নাকচ করার অধিকার শুল্ক কর্তৃপক্ষের থাকবে। এতে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা সব সময় ঝুঁকিতে থাকবে।

বাংলাদেশের যেকোনো পণ্য ছাড়ের আগে ভেরিফিকেশনের দরকার হলে ভারতের কাস্টমস কর্তৃপক্ষ তা ইপিবির মাধ্যমে যাচাই করে। নতুন রুলস কার্যকর ভারতের হয়ে পণ্য সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করবে দেশটির আমদানিকারকরা। বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের পণ্য সম্পর্কিত তথ্য আমদানিকারকের কাছে দিতে হবে। এ জন্য রুল-৪-এর অধীনে ‘ফরম-১’ নামে একটি ফরম তৈরি করা হয়েছে। রুলস অব অরিজিন ক্রাইটেরিয়া যথাযথভাবে প্রতিপালন হয়েছে কি না তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকরা রপ্তানিকারকদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে তা কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করবে। তা না হলে পণ্য ছাড় করা হবে না। পাশাপাশি আমদানিকারকরা শুল্ক ছাড়ের সুবিধা পাবে না। এতে আমদানিকারকরা বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানিতে নিরুৎসাহিত হবে। ইপিবি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বলেছে, রপ্তানির বিপরীতে প্রেফারেনশিয়াল সার্টিফিকেট অব অরিজিন ইস্যুর ক্ষেত্রে এ ধরনের ফরম দাখিলের বিধান সংশ্লিষ্ট ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্টে না থাকলে তা চাওয়ার সুযোগ নেই।

রুল ৬(১)(বি) অনুযায়ী, ভেরিফিকেশন অনিষ্পন্ন থাকাকালীন প্রেফারেনশিয়াল ট্যারিফ সুবিধা স্থগিত রাখার বিধান রাখা হয়েছে। এতে ভারতীয় আমদানিকারকরা বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানিতে নিরুৎসাহিত হতে পারে।

প্রতিবেদনটি দৈনিক কালের কন্ঠে প্রকাশিত

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।