Skip to content

ব্যবসায় নীতিহীন ফেসবুক


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক যে বিশ্বব্যাপী ব্যবসায় বাড়াতে কোনো নৈতিকতার ধার ধারে না সেটি পুরনো অভিযোগ। এরই সবশেষ দৃষ্টান্ত- রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জীবন নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে অনৈতিক ব্যবসায়ের অপচেষ্টা। এর মাধ্যমে কোম্পানিটি মিয়ানমারে বাজার সম্প্রসারণের অপকৌশল নেয়। দেশটিতে কমপক্ষে দুই কোটি ব্যবহারকারী আছে ফেসবুকের। সেখানে বহু মানুষের কাছে এটিই তাদের কাছে প্রধান অথবা একমাত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
২০১৮ সালে অনলাইনে ঘৃণা ছড়ানো বন্ধে খুবই ধীর এবং অকার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে ফেসবুক এমন অভিযোগ আনে খোদ জাতিসঙ্ঘ। একই বছর ফেসবুকও স্বীকার করে, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি বা ঘৃণামূলক বক্তব্য প্রচার বন্ধে যথেষ্ট কিছু করতে পারেনি কোম্পানিটি। সংস্থাটির অর্থায়নে একটি নিরপেক্ষ তদন্তের পর বলা হয়েছিল, মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে প্ল্যাটফর্মটি।
বিবিসি অনলাইনের খবরে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ঘৃণাপ্রসূত বক্তব্য অনুমোদনের অভিযোগে ফেসবুকের বিরুদ্ধে এবার মামলা করেছেন ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বেশ কিছু রোহিঙ্গা। এতে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১৫ হাজার কোটি ডলারের বেশি দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, মিয়ানমারের নির্যাতিত এ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতা উৎসাহিত করেছে ফেসবুক। যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকোতে ফেসবুকের বিরুদ্ধে আইনগতভাবে অভিযোগ দাখিল করেছেন আইনজীবীরা। মার্কিন ওই আইনজীবীরা ফেসবুকে দেয়া ঘৃণামূলক পোস্ট উদ্ধৃত করেছেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ২০১৩ সালের অনুসন্ধানে এমন একটি পোস্ট পাওয়া গেছে। তাতে রোহিঙ্গাদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, ‘ইহুদিদের বিরুদ্ধে হিটলার যেমনটা করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের সেই একই রকমভাবে লড়াই করতে হবে’। উসকানিমূলক আরেকটি পোস্ট ওই অভিযোগে তুলে ধরা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ‘তেল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দাও, যাতে তারা দ্রুত আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করতে পারে।’
ব্রিটেনে শরণার্থী রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব করছে এমন একটি আইনি প্রতিষ্ঠান অভিযোগ এনেছে- বিশ্বের নিপীড়িত ও রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে ‘ঘৃণামূলক এবং বিপজ্জনক ভুল তথ্য বছরের পর বছর ধরে প্রচার হওয়ার সুযোগ দিয়েছে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ’। সংস্থাটি এর মধ্যে এ বিষয়ে ফেসবুককে লিখিতভাবে একটি চিঠি দিয়ে জানায়। ফেসবুকের অ্যালগরিদম রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক বক্তব্য প্রচারের বর্ধিত সুযোগ করে দিয়েছে। যারা মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানেন, তাদের মডারেটর এবং সত্য যাচাইকারী হিসেবে নিয়োগ দিতে ব্যর্থ হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দেয় এমন পোস্ট নামিয়ে ফেলতে বা অপসারণে ব্যর্থ হয়েছে ফেসবুক। দাতব্য সংস্থাগুলো এবং মিডিয়া থেকে সতর্কতা দেয়া সত্ত্বেও যথাযথ এবং সময়মতো ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে সংস্থাটি।
ভূমিপুত্র হলেও মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের দেখা হয় অবৈধ অভিবাসী হিসেবে। দশকের পর দশক ধরে তারা সেখানে নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার। বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারে ২০১৭ সালে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে দেশটির সেনাবাহিনী নৃশংস নির্যাতন চালালে কমপক্ষে ১০ হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম নিহত হন। সে বছরই মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে কমপক্ষে সাত লাখ রোহিঙ্গা ঝুঁকি নিয়ে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেন বাংলাদেশে। এ সময়ে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। এর মধ্যে আছে নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ ও বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া।
ফেসবুকের এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ড এ কথারই সাক্ষ্য দেয়, সা¤্রাজ্যবাদী এবং করপোরেট পুঁজির কাছে নীতি-নৈতিকতার কোনো বালাই নেই। যেকোনো উপায়ে অর্থ কামানোই তাদের কাছে মুখ্য। তবে আশার কথা, নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের অনেকে এ ব্যাপারে ক্ষীণ কণ্ঠে হলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের বক্তব্য তুলে ধরছেন। এতে করে রোহিঙ্গা ইস্যু যে হারিয়ে যায়নি সে কথা তুলে ধরা যাচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় ফেসবুক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।



বার্তা সূত্র