Skip to content

‘বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষার অনন্য বাতিঘর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’

‘বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষার অনন্য বাতিঘর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’

ঢাবি করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষার এক অনন্য বাতিঘর। এই বিশ্ববিদ্যালয় বাঙালি জাতির শিক্ষা-সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য গবেষণা, উদ্ভাবন, মুক্তবুদ্ধি চর্চা, প্রগতিশীল ভাবনা, জাতিগঠন ও দেশাত্মবোধক চেতনার এক তেজোদ্দীপ্ত আলোকবর্তিকা।

বুধবার (১ ডিসেম্বর) দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে বিশ্ববিদ্যালয়টির শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে যুক্ত হয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘রাজকীয় ক্ষতিপূরণ’ উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বঙ্গভঙ্গ রদের রাজকীয় ক্ষতিপূরণ হিসেবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। ১৯২১ সালের পহেলা জুলাই ১২টি বিভাগ ও ৮১৭জন শিক্ষার্থী নিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছিল। আজ সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮৪টি বিভাগ এবং প্রায় ৩৮ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। প্রতিষ্ঠালগ্নে মাত্র দুজন নারী শিক্ষার্থী থাকলেও এখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪০ শতাংশ।’

অনুষ্ঠানে আসন্ন পঞ্চম শিল্পবিপ্লবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পথিকৃতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে বলে জানান রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ। তিনি বলেন, ‘কিছুদিন পরেই পঞ্চম শিল্প বিপ্লবের হাওয়া বইতে শুরু করবে। সে জন্য চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পঞ্চম শিল্পবিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। এই লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করতে হবে। আমাদের শিক্ষার্থীরা যাতে তথ্য-প্রযুক্তিসহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের সব শাখায় বিশ্বব্যাপী সফলতার সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারে, সেভাবে তাদের গড়ে তুলতে হবে।’

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেওয়ার সময় জাতীয় সংসদের স্পিকার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ড. শিরীন শারমীন চৌধুরী বলেন, ‘ভাষা আন্দোলন থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রাম পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমাজের প্রতিবাদী স্ফুরণ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষের অন্যতম অর্জন। আমি গর্বিত, আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয় অনন্তকাল ধরে ছাত্র রাজনীতির গৌরব ও ঐতিহ্যকে অনন্য মাইলফলকরূপে ধারণ করে এগিয়ে যাবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি আশাবাদ ব্যক্ত করে শিরীন শারমীন চৌধুরী বলেন, ‘বিশ্বায়নের যুগে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক জ্ঞান-তথ্য প্রযুক্তিনির্ভর বিশেষায়িত জ্ঞানের অগ্রদূতরূপে মানসম্মত, যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা সুসংহত করার অবদান রেখে যাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা ক্ষুধা, দারিদ্র ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণের কারিগর এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তৈরি হবে।’

অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই দেশের ইতিহাস বদলে দিয়েছে। শিক্ষিত, অসাম্প্রদায়িক যে মধ্যবিত্ত সমাজ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে, তাদের হাত ধরেই আজকের এই বাংলাদেশ । অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে যেতে হিয়েছে। এ কথা অস্বীকার করা যায় না যে, শুরুর দশকে এই বিশ্ববিদ্যালয় যেমন ছিল, তা আজ ম্লান হয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় তার গৌরব হারিয়েছে।’

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে দীপু মনি বলেন, ‘ভৌত মহাপরিল্পনার আগে সুনাগরিক তথা বিশ্বনাগরিক গড়ে তুলতে একাডেমিক মহাপরিকল্পনা দরকার। এর মধ্য দিয়ে উচ্চশিক্ষায় যে পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন, তা পূর্ণ করুন।’

অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘আমরা খুব ভাগ্যবান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী, মুজিববর্ষ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ একইসঙ্গে পালন করছি।’ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন এই শিক্ষার্থী বলেন, ‘আপনারা সময় নষ্ট করবেন না। সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ঠিকমতো সময়ের ব্যবহার করবেন। আপনারা আমাদের ভবিষ্যৎ। আপনাদের হাতে নির্ভর করছে আমাদের সোনার বাংলাদেশ।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশিনের সভাপতি শিল্পপতি এ কে আজাদ বলেন, ‘আজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ঐতিহ্য, তার পেছনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাইদের অবদান রয়েছে। রক্ত-শ্রম-মেধা বুদ্ধি দিয়ে তারা অবদান রেখেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই দেশের নিম্ন আয়ের পরিবারের সন্তানদের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করেছে। শিক্ষা বৈষম্য কমিয়ে আনতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সারাবিশ্বে পথিকৃত।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি আমাদের প্রতিদান কিন্তু নেই বললেই চলে। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চলছে পুরোপুরি সরকারের অর্থায়নে। বিশ্বের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে অ্যালামনাইদের সহযোগিতা থাকে। আমাদের সময় এসেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঋণ শোধ করার। অর্থাভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থীর পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়ে যায়, তার দায়িত্ব আমরা নিচ্ছি।’

অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকট নিরসনে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি জানিয়ে এ কে আজাদ বলেন, ‘বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আবাসন সমস্যা। আপনারা একটি নীতিমালা করুন। আবাসান সমস্যা সমাধানে অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন এগিয়ে আসবে। অ্যাকাডেমিক ভবন নির্মাণেও আমরা এগিয়ে আসব।’

সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন ও প্রত্যাশা এবং আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং নিয়ে বিতর্কের কোনো শেষ নেই। এসব বিষয় নিয়ে শতবর্ষে উপলক্ষে প্রকাশিত গ্রন্থাদি ও বিভিন্ন প্রকাশনায় বিস্তর লেখালেখি হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘শুধু একটি বিষয় উল্লেখ করব— পূর্ব বাংলার অবহেলিত জনপদে একটি শিক্ষিত-বুদ্ধিদীপ্ত জনগোষ্ঠীর বিকাশ ঘটিয়ে একটি জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং সেই রাষ্ট্রের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির বিবর্তন ও উন্নয়নে অব্যহতভাবে যদি কোনো একক প্রতিষ্ঠান অনন্যসাধারণ অবদান রেখে থাকে, সেটি একমাত্র আমাদের প্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্বে এর তুলনা বিরল। আন্তর্জাতিক জ্ঞানরাজ্যেও এর অবদান অনস্বীকার্য।’

এ সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার প্রবীর কুমার সরকারের সঞ্চালনায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহম্মদ সামাদ, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল প্রমুখ।

সারাবাংলা/আরআইআর/পিটিএম



বার্তা সূত্র