বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগঃ প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগঃ প্রতিক্রিয়া

যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পররাষ্ট্র দপ্তর মঙ্গলবার বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগসহ গণমাধ্যম ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা লঙ্ঘনের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র নেড প্রাইস বলেন, বিগত বছরগুলিতে বাংলাদেশ মানবাধিকার উন্নয়নে সফলতা দেখালেও সেখানে গণমাধ্যম ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা লঙ্ঘনের বিষয়ে আমরা উদ্বিগ্ন I

নেড প্রাইস সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ সরকার আগ্রাসীভাবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রয়োগ করছে। তিনি আরও বলেন, আমরা বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহবান জানাচ্ছি তারা যেন সাংবাদিকসহ সবার মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করে। যাদেরকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় আটক করা হয়েছে, তাদের ন্যায্য বিচার প্রক্রিয়া যেন নিশ্চিত করা হয়।

এই বিষয়ে বাংলাদেশের ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার বিশিষ্ট সাংবাদিকদের প্রতিক্রিয়া জানতে তাদের সাথে কথা বলেন ভয়েস অফ আমেরিকার বাংলা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শতরূপা বড়ুয়া।

মাহফুজ আনাম

মাহফুজ আনাম

সম্পাদক, প্রকাশক,

দি ডেইলি স্টার

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিরুদ্ধে, আমরা গণমাধ্যমের সব ধরনের কর্মীরা (সম্পাদক, রিপোর্টার, সাব-এডিটর, যারা ইউনিয়ন করেন, সবাই), একত্রিতভাবে, এটা প্রণয়নের পর থেকেই বিরোধিতা করে আসছি।

এটার বিরুদ্ধে আমরা সোচ্চার হয়েছি। এবং আমরা, সম্পাদক পরিষদ, বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করে, Article by Article বিশ্লেষণ করে, দেখেছি, এটা কিভাবে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থী।

আমরা মনে করি, এই আইন আমাদের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক, আমাদের Right to Information ACT এর সাথে সাংঘর্ষিক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ… যে মূল্যবোধ নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে তার সাথে সাংঘর্ষিক। সামগ্রিকভাবে, বাক স্বাধীনতার এটা একটা বিরাট অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমরা মনে করি, এই আইন আমাদের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক, আমাদের Right to Information ACT এর সাথে সাংঘর্ষিক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ… যে মূল্যবোধ নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে তার সাথে সাংঘর্ষিক। সামগ্রিকভাবে, বাক স্বাধীনতার এটা একটা বিরাট অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমি বলতে চাই, এই আইনের ২০টি ধারায় সাজা দেয়ার সুযোগ আছে। এই আইনের ২০টি ধারার ১৪টিই, যেগুলো সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, জামিন অযোগ্য। তাই এই আইনে অভিযুক্তরা যখন আদালতে যাচ্ছে, তখন তাদের জামিন দেয়া হচ্ছে না। আপনি জানেন, আমাদের দেশে আইনি প্রক্রিয়া অনেক দীর্ঘ। তাই কেউ এই আইনে গ্রেপ্তার হবার পর তাকে কোর্টের বিচার প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুরোটা সময় জেলে থাকতে হয়। বিচারক যদি শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তও দেন যে আপনি নির্দোষ, তারপরও প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে আপনাকে মাসের পর মাস বা বছর পর্যন্ত জেলে থাকতে হবে। এই আইনের ১৪টি ধারাই যেহেতু জামিন অযোগ্য, তাই এটা একটা সাঙ্ঘাতিক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। এখানে এক ধরনের সাজা আছে যা এক থেকে সাত বছর। কোন কোন ক্ষেত্রে সাজা হচ্ছে ১৪ বছর। আমাদের দেশে মৃত্যুদণ্ড বাদ দিলে, একটা খুনির সাজা হয় ১৪ বছর। সাংবাদিকদের অপরাধ কি এতোই বিরাট? এই আইনে পুলিশের হাতে অগাধ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এবং যেকোনো ব্যক্তি এই ডিজিটাল আইনের আওতায় মামলা করতে পারে। সেই মামলা গ্রহণ করবে কি না, সেটা পুলিশের সিদ্ধান্ত। এছাড়া প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি যে, অনেক সময় এই আইন প্রয়োগ করে মানুষকে হেনস্তা করা হচ্ছে, গ্রেপ্তার করা হছে। সর্বশেষে আমরা দেখছি যে, কোভিড নিয়ে সমালোচনা করার ফলে অনেককেই ধরা হচ্ছে। এগুলো খুবই দুঃখজনক ব্যাপার। এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার বিরাট অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অথচ যেখানে এই আইন প্রয়োগ করা উচিত ছিল যেমন Prevention of Hate Speech সেখানে তার প্রয়োগ হচ্ছে না। কিংবা যারা Communal Violence বা সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সৃষ্টি করছে, creating hatred against specialized group অথবা অনেক ঘটনা যেমন, বাল্য বিবাহ, নারীর অধিকার এসব বিষয় নিয়ে অনেক গোষ্ঠী সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে… তাদের বিরুদ্ধে সরকার, কিংবা পুলিশ কিংবা এই আইন যাদের নিয়ন্ত্রণে, তাদের সচরাচর যথেষ্ট তৎপর হতে দেখিনা। অথচ সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে, বাক স্বাধীনতা যারা ব্যবহার করে, তাদের ক্ষেত্রে এই আইন প্রয়োগের ভয়াবহ একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আমি একজন সম্পাদক হিসেবে খুব বলিষ্ঠভাবে বলতে চাই, এই আইন স্বাধীন সাংবাদিকতাকে ধ্বংস করছে, এমন একটা বিভীষিকাময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে, যেখানে Self-Censorship প্রয়োগ করতে সাংবাদিকরা বাধ্য হচ্ছে।

ফরিদা ইয়াসমিন

ফরিদা ইয়াসমিন

ফরিদা ইয়াসমিন

সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয় প্রেস ক্লাব

বাংলাদেশের ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন নিয়ে বাংলাদেশের সাংবাদিকরাও কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে কথা বলছেন। এই আইনের কিছু কিছু ধারা আছে, যেগুলো যদি প্রয়োগ হয়, তাহলে তা হবে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থী। দীর্ঘদিন ধরে, আমরা সাংবাদিক সমাজ এই দাবিটা করে আসছি যাতে আইনের সেই ধারাগুলোকে বাদ দেয়া হয়, যাতে মূলধারার সাংবাদিকরা হেনস্থার শিকার না হয়।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন, সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেয়া হয়েছে যে, এগুলো মূলধারার সাংবাদিকদের বেলায় প্রয়োগ করা হবে না। এই ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনটির, আমরা একেবারে বিলোপ চাই না। চাই না এই কারণে যে, যখন এই আইনটি প্রনয়ন করা হয়েছে সেগুলো কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার কন্টেন্টকে মাথায় রেখেই তৈরি করা হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট এবং আমেরিকার প্রেক্ষাপট কিন্তু এক না।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট এবং আমেরিকার প্রেক্ষাপট কিন্তু এক না। বাংলাদেশে যারা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন, তাদের বেশিরভাগই যথাযথভাবে শিক্ষিত নন। তারা হয়তো ঠিক ব্যবহার ঐভাবে জানেনও না। এবং অনেক সময় ফেইক নিউজ, ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। কখনও কখনও ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে। সমাজের প্রতিষ্ঠিত, রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত কিংবা নানান ভাবে যারা বিভিন্ন পেশাগত ভাবে প্রতিষ্ঠিত, তাদের হয়রানি করা হচ্ছে, আক্রমণ করা হচ্ছে। একেবারে মানহানীকর তথ্য ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। এবং নারী ও শিশুরা এর শিকার হচ্ছে বেশি। তো এসব প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার এই ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনটি প্রণয়ন করেছে, যেখানে ডিজিটাল মাধ্যমে কেউ কোন রকম মানহানীকর তথ্য বা ভুল তথ্য ছড়িয়ে দিতে পারবে না। এবং এর মাধ্যমে মানুষ শুধু ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা না, রাষ্ট্র, সমাজ কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এইখানে।

আমাদের দেশে যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় কোন রকম ভুল কন্টেন্ট ছড়ানো হয় বা গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় তারা কিন্তু সেই রেসপনসিবিলিটি নিচ্ছে না। সোশ্যাল মিডিয়া হ্যাস টু টেক রেসপনসিবিলিটি। যেটা আমেরিকাতে হচ্ছে… টুইটারের মালিক কিংবা ফেইসবুকের মালিক কিন্তু জবাবদিহি করছে। কিন্তু আমাদের দেশে তাদের কোন অফিস নাই, তাদের কোন রকম জবাবদিহিতার ব্যবস্থা নাই। তখন বাধ্য হয়ে সরকারকে কিন্তু কিছু ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে। এই ব্যবস্থা নিতে গিয়ে হয়তো মূলধারার দুই-একজন সাংবাদিক শিকার হয়ে যাচ্ছে। এটা আমরা চাই না। আমরা সব সময়ই এর প্রতিবাদ করছি। এবং সব সময়ই এই বিষয়টা সরকারের নজরে আনার চেষ্টা করি যাতে কোনভাবে কোন সাংবাদিক, যারা মূলধারায় সাংবাদিকতা করেন, তারা যেন কেউ হেনস্থার শিকার না হন। কোন রকম ক্ষতিগ্রস্থ না হন। তো আমরাও কিন্তু সেই দাবিটা করে আসছি। সরকার এ ব্যাপারে যথেষ্ট আন্তরিক, আমি বলবো।

আর যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট যে বক্তব্য দিয়েছে, সেখানে তারা কিন্তু এটাও বলেছেন যে, বাংলাদেশ এগুচ্ছে, ইতিবাচকভাবে এগুচ্ছে। এখন এইখানে এসে তারা একটু উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তো আমি বলবো যে, যারা এই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তারা যেন একটু আমাদের প্রেক্ষাপটটা চিন্তা করেন। যে কথাগুলো আমি আগেই বললাম যে, সোশ্যাল মিডিয়া কিন্তু কোন রকম রেসপনসিবিলিটি নিচ্ছে না। এবং আপনি হয়তো জানেন যে, এই সোশ্যাল মিডিয়ায় ধর্মের নামে কিছু প্রপাগান্ডাও করা হয়। যেটা অনেকটা জঙ্গিবাদের দিকে মানুষকে নিয়ে যায়। এগুলো নিয়ন্ত্রনে সরকারকে তো ব্যবস্থা নিতে হয়। এটা আমরা জানি যে, অন্যান্য অনেক উন্নত দেশে কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রনের কথা আজকাল থাকছে। এবং ভারত কিন্তু ইতোমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়া থেকে কন্টেন্ট সরানোর আইন প্রণয়ন করছে। এটা বিশেষ করে থার্ড ওয়ার্ল্ড কান্ট্রির জন্য একটা মাথা ব্যথার কারন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তো আমি বলবো যে, প্রেক্ষাপটটা আলাদা। এই প্রেক্ষাপটের কারণে বাংলাদেশে যা হচ্ছে, ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনটি আমরা মনে করি দরকার। কিন্তু এখানে যাতে মূলধারার সাংবাদিকরা যেন হেনস্থা না হয়, এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

প্রধান সম্পাদক, জিটিভি

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর যা বলেছে, এ বিষয়ে বলতে গেলে আসলে একটু পরিপ্রেক্ষিতটা বলতে হবে। বাংলাদেশের ডিজিটাল সিকিউরিটি এ্যাক্ট এর ভেতরে যে সমস্ত ধারাগুলোকে সন্নিবেশ করা হয়েছে, এগুলো কিন্তু ২০০৬ সালের আই.সি.টি এ্যাক্ট এর মধ্যেও ছিল। শুধু তাই না, আমরা যদি সামগ্রিকভাবে আমাদের সিআরপিসি টা দেখি, যে ক্রিমিনাল প্রসিডিওর এ্যাক্টটা আছে, সেখানেও কিন্তু ধারাগুলো আছে। শুধু তাই না, ডিফেমেশন ল’তেও এই ধারাগুলো আছে।

ডিজিটাল সিকিউরিটি এ্যাক্টের মধ্যে সেগুলো কে একত্রে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। বিশেষ করে এই আইনের ৩২, ২৯, ২৫, এই ধারাগুলো নিয়ে বড় ধরনের সংশয় দেখা দিয়েছে এবং এই আইনটা যখন হয় তখন বাংলাদেশের গণমাধ্যম কর্মীরা, সাংবাদিক সমাজ, সম্পাদক পরিষদ, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, প্রত্যেকে যার যার জায়গা থেকে এ ব্যাপারে তাদের অবস্থান সরকারের কাছে তুলে ধরেছে।

আমরা যদি একটু পেছনে ফিরে তাকাই আমরা দেখেছিলাম যে গুজব, মিথ্যা প্রচারনা, ডিজিটাল প্লাটফর্মে এগুলো ব্যবহার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা, বিশেষ করে মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তি এবং ইসলামিক জঙ্গি গোষ্ঠী, তাঁরা এই প্ল্যাটফর্মটাকে ব্যবহার করছিল বাংলাদেশের সেকুলার প্ল্যাটফর্মটাকে নষ্ট করার জন্য, এই প্ল্যাটফর্ম কে ব্যবহার করে, বাংলাদেশে একের পর এক ব্লগার হত্যা হয়েছে। লেখক এবং প্রকাশকদেরকেও হত্যা করা হয়েছে।

তারপর আরও একটা ঘটনা ছিল, তা হচ্ছে, একটা ছাত্র আন্দোলন হয়েছিল বাংলাদেশে সড়ক আইন এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে। তখন দেখা গেছে, এই প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে কেউ কেউ উত্তেজনা এবং গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করেছে। সেটার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার মনে করেছে যে একটা ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন করা প্রয়োজন।

দুঃখজনক হলেও এই আইনটি যে উদ্দেশ্যে করা হয়েছে, অর্থাৎ ডিজিটাল প্লাটফর্মে কেউ যাতে গুজব ছড়াতে না পারে, কেউ যাতে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে না পারে, কেউ জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হতে না পারে, কেউ যাতে জঙ্গিদের দ্বারা মদদপুষ্ট হতে না পারে, সেটা যতটা না হয়েছে, তার চাইতে বেশি দেখা যাচ্ছে মানবাধিকারকর্মী, সংস্কৃতি কর্মী এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এই আইনটা ব্যবহার করা হচ্ছে বেশি।

বিশেষ করে আমি বলব এই আইনটির কোন কোন ক্ষেত্রে প্রয়োগটি অপপ্রয়োগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ আমরা দেখছি বিশেষ করে অনলাইনে বা ডিজিটাল যে কোন ক্ষেত্রে সাংবাদিকরা কোন একটি মন্তব্য করছে বা কোন রিপোর্ট করছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের বিরুদ্ধে সারাদেশে নানান রকম মামলা হচ্ছে। এমনকি সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে রিপোর্ট করলেও মামলা করা হচ্ছে এবং সাংবাদিকদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

আমাদের পুলিশ প্রশাসন, আমাদের আইনমন্ত্রী নানান সময়ে বলেছেন যে এই আইন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে না। কিন্তু আমরা দেখেছি যে গণমাধ্যম, গণমাধ্যম কর্মী, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এই আইনটি প্রয়োগ করা হচ্ছে। যারা বিভিন্ন এলাকার চিহ্নিত দুর্বৃত্ত, যারা রাজনীতিকে ব্যবহার করে সমাজের নানা জায়গায় অসামাজিক কর্মকান্ড করছে, অনিয়ম করছে, দুর্নীতি করছে, তারাই মূলত এ আইনটি প্রয়োগ করছে।

যে উদ্দেশ্যে আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছিল, সেখানে কিন্তু আমরা এ আইনের কোনো প্রয়োগ দেখছি না।

যে উদ্দেশ্যে আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছিল, সেখানে কিন্তু আমরা এ আইনের কোনো প্রয়োগ দেখছি না। এখনও দেখছি ইউটিউবে ওয়াজের নামে নানান রকম মৌলবাদী তৎপরতা, জঙ্গী তৎপরতা, বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, বাংলাদেশের সেকুলার বিশ্বাস, এমনকি জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে অনেক কিছু বলা হচ্ছে। অথচ তাদের বিরুদ্ধে যতটা প্রয়োগ হচ্ছে তারচেয়েও বেশি প্রয়োগ হচ্ছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে। এখানেই আমাদের আপত্তি। আমরা এ কারণে এই আইনের সংশোধন চাচ্ছি। অথবা এই আইনের প্রয়োগটাই যে একটি অপপ্রয়োগ হয়ে দাঁড়িয়েছে সে ব্যাপারে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

এবং বিশেষ করে ঢাকার বাইরে যে সাংবাদিকরা আছেন তারা এর একটি বড় শিকারে পরিণত হচ্ছেন। এমনকি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মত কর্মকাণ্ডের কথা বলে এদেশের একশ্রেণীর সাম্প্রদায়িক শক্তিও কিন্তু এই এ্যাক্টটিকে সেকুলার গোষ্ঠী বা ধর্মনিরপেক্ষবাদের পক্ষে যারা কাজ করেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে।

নাসিমা খান মন্টি

নাসিমা খান মন্টি

নাসিমা খান মন্টি

সম্পাদক, দৈনিক আমাদের নতুন সময়

এ বিষয়ে আমি যেটা মনে করি তা হলো, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের কিছু কিছু ধারা আসলেই সাংবাদিকদের জন্য বিপদজনক, মানে সাংবাদিকতাকে বাধাগ্রস্ত করে। তবে আমি এটা মনে করি না যে, পুরোটা অ্যাক্টেই সমস্যা আছে। তবে কয়েকটি ধারার ব্যাপারে আমাদের দেশের সম্পাদক পরিষদ এবং বিভিন্ন যে সংগঠনগুলো আছে, তারাও আশংকা প্রকাশ করেছে।

যেমন সবচেয়ে বিপদজনক যেটা সেটা হলো, কোন পরোয়ানা ছাড়া যে গ্রেফতার করতে পারবে সাংবাদিকদের- এটা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে আমি মনে করি অনেক বড় একটা বাধা। কারণ একটা সাংবাদিক যদি সবসময় ভয়ে থাকে, তাকে ভয়ে কাজ করতে হয় তাহলে তা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বিপদজনক। সে হয়তো বুঝতেও পারবে না, এটা কতটা বিপদজনক ছিল। হয়তো তার বিরুদ্ধে মামলাটা হয়ে যাবে। এবং কোন পরোয়ানা ছাড়াই তার জিনিসপত্র, তার কম্পিউটার ওরা সিজ করতে পারবে। বা আরেকটা যে বিষয় আছে…তার যেকোন রিপোর্ট গিয়ে ব্লক করতে পারার অধিকারটা ওখানে আছে। এরকম বেশ কিছু ধারা আছে, যেগুলো আসলে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বিপদজনক। এর মধ্যে আমাদের অনেকজন সাংবাদিকই আটক হয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কিশোর, তারপরে ফটোগ্রাফার শহীদুল। কিন্তু আমরা আবার দেখি যে, রোজিনা ইসলাম, তাঁর ঘটনায় কিন্তু আবার এই অ্যাক্টটা কোন কারণে সরকার প্রয়োগ করেনি। যদিও সে একদম মেইন স্ট্রিম সাংবাদিক এবং আমাদের সবারই এটা ভয় ছিল যে, তার ক্ষেত্রে নাকি আবার এই ধারার কোন একটা ধারা, সিকিউরিটি অ্যাক্টের কোন একটা ধারা প্রয়োগ করে ফেলে সরকার।

এই অ্যাক্টের যে ধারা নিয়ে মানুষের আশংকা আছে বা কাজ করার ক্ষেত্রে বাধা হচ্ছে, সেগুলো সংশোধন হওয়া দরকার।

কিন্তু আমি মনে করি যে, এই অ্যাক্টের যে ধারা নিয়ে মানুষের আশংকা আছে বা কাজ করার ক্ষেত্রে বাধা হচ্ছে, সেগুলো সংশোধন হওয়া দরকার। যেমন আমরা এখন জানি যে বিভিন্ন ভাবে এটা অ্যাবিউযও হয়, মানে এই আইনটাকে আমরা অ্যাবিউয করছি। কিন্তু আসলে এই ধারাগুলো এমন যে, এগুলোকে খুব সহজে অ্যাবিউয করা যায়। যেমন আমি যে কাউকে গ্রেফতার করি, আমার কাছে ওয়ারেন্ট নেই, আমি বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাচ্ছি। যেটা ঘটেছে, অলরেডি অনেক সাংবাদিকের ক্ষেত্রে। এই জিনিসগুলো বিপদজনক। মানে কাউকে সন্দেহ হলো, আমি তুলে নিলাম, আমাকে পরিবারের কাছে কাগজপত্র দেখাতে হলো না। আমরা যদি কেইস বাই কেইস ধরে দেখি, যেগুলোতে এই ধারাগুলোকে অপব্যবহার করা হয়েছে…কোথায় সে হোলগুলি, ওগুলো যদি আমরা বন্ধ করতে পারি, তাহলে মনে হয় আমরা এই সিকিউরিটি অ্যাক্টটা নিয়ে এগুতে পারব। সাংবাদিকতার যে ভয় এই আ্যাক্ট নিয়ে, সেটা হয়তো দূর হবে বলে আমি আশা করি। কাজই এই বিষয়গুলো নিয়ে ওঁরা আশংকা জানিয়েছেন যে, সেটা কিছুটাতো অবশ্যই আশংকারই মানে, চিন্তারই বিষয়। আসলে সাংবাদিকদের কাজ করার ক্ষেত্রে এই বাধাগুলো দূর করতে হবে।

জ. ই. মামুন

জ. ই. মামুন

জ. ই. মামুন

প্রধান নির্বাহী সম্পাদক, এটিএন বাংলা

আমি যেটি মনে করি সেটি হচ্ছে যে বাংলাদেশের ডিজিটাল সিকিউরিটি এ্যাক্ট বলে যে আইনটি প্রচলিত আছে, এটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাংবাদিক, গণমাধ্যম কর্মী এবং যারা একটু মুক্ত চিন্তার চর্চা করে তাদের উপরে বেশি প্রয়োগ করা হয়। এবং এই আইনটি প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমি দেখে যে রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের চাইতে প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গ অর্থাৎ আমলা নির্ভর যারা, পুলিশ বা নির্বাহী কর্মকর্তা বা ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা প্রশাসক, এই ধরনের মানুষেরা এই আইনটি ব্যবহার করে সাংবাদিক বা অন্যদের বিরুদ্ধে বেশী মামলা করে। কিন্তু বোঝানোর চেষ্টা করে তাঁরা সরকারকে যে, এই যে তারা এসব কথা বলছেন এটি সরকারের অমুক নীতির বিপক্ষে যাচ্ছে এবং এই কথার মাধ্যমে তারা আইনটি ভঙ্গ করছেন। কিন্তু ব্যাপারটি আসলে মোটেও সেরকম নয়। কথা ছিল যে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনটি ব্যবহার করা হবে তাদের বিরুদ্ধে, যারা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বড় ধরনের কোনো অপরাধ করছে, সাইবার ক্রাইম এর মতো অপরাধ করছে।

আজকাল বাংলাদেশে একটা ঘটনা প্রায়ই খুব দেখি, অনেক মেয়ের বা নারীদের ফেসবুক বা অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম কে হ্যাক করে বা অন্যভাবে বড় ধরনের অপরাধ করা হয়। এর মাধ্যমে নারীদের ক্ষতি হয়, পুরুষদের ক্ষতি হয়, অনেক মানুষের ক্ষতি হয়। সেই সব ক্ষেত্রেই এই ডিজিটাল সিকিউরিটি এ্যাক্ট-এর ব্যবহার আমরা খুব একটা দেখি না। এছাড়া ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মানুষকে খুব হেয় করা হয়, অসম্মান করা হয়, অপদস্ত করা হয়, সেসব ক্ষেত্রেও ডিজিটাল সিকিউরিটি এ্যাক্ট এর ব্যবহার দেখি না। আমরা দেখি শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণে যখন কোন ভিন্নমতের ব্যাপারে কেউ লেখেন বা বলেন তখন এই আইন প্রয়োগ করা হয়, তার উপরে । ধর্মীয় কারণে অনেক সময় প্রয়োগ করা হয়। ধর্মীয় কারণ বলতে আমি বুঝাচ্ছি যে, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার অজুহাত দিয়ে এই আইনের প্রয়োগ করা হয়। যেটি একদমই ঠিক না।

আমার কাছে যেটি মনে হয় যে ডিজিটাল সিকিউরিটি এ্যাক্ট-এর মতো কোনো একটা আইন বাংলাদেশে দরকার আছে এ কারণে, যখন কোথাও কোন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কোন একটা অপরাধ করা হবে, সেই ধরনের অপরাধ দমনের জন্য। কিন্তু মুক্তমত, স্বাধীন চিন্তা দমন করার জন্য এই আইন কোনভাবেই প্রয়োগ করা উচিত না। এবং আমি আরেকটা জিনিস বলতে চাই, যখন এই আইন প্রয়োগ করা হয় তখন এটি নিয়ে অনেক কথা হয়েছে, সরকারের সঙ্গে, সাংবাদিকদের সঙ্গে, নেতৃস্থানীয় সম্পাদকরা এগুলো নিয়ে প্রতিবাদ করেছে, আপত্তি করেছে। আমিও দু-একবার সেরকম মিটিংয়ে ছিলাম। তখন সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় আমাদেরকে স্পষ্টভাবে কথা দিয়েছে যে এই আইন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হবে না। অথচ আমরা দেখতে পাচ্ছি যে সবচেয়ে বেশি প্রয়োগ করা হয়েছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে। এটি আমি মনে করি খুবই অন্যায় কাজ এবং এরকম কাজের কারণে কিন্তু মানুষের ভেতরে সেলফ সেন্সরশিপ তৈরি হয়। মানুষরা, সাংবাদিকরা অনেক কথা বলতে চান কিন্তু বলতে পারেন না। মনের ভিতরে একটা ভয় যে, আমি এটা বললে, আমি এটা লিখলে যদি আমার বিরুদ্ধে এরকম একটি মামলা হয়, হেনস্থা হয়, আমাকে জেলে পচে মরতে হবে, জামিনের অযোগ্য অপরাধ হিসেবে।

কিন্তু এই আইন, গণমাধ্যম বা মুক্তচিন্তার মানুষের উপরে যেন প্রয়োগ করা না হয়।

অবশ্যই মুক্ত গণমাধ্যমের চর্চার ক্ষেত্রে এটি একটি নেতিবাচক আইন এবং আমি বলছিনা আইনটি বাতিল করা হোক, আমি বলছি এই আইন থাকুক। কিন্তু এই আইন, গণমাধ্যম বা মুক্তচিন্তার মানুষের উপরে যেন প্রয়োগ করা না হয়।

সূত্র: ভয়েজ অব আমেরিকা

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email