Skip to content

বাংলাদেশের ২৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের উচ্চাভিলাষী জলবায়ু তহবিল পরিকল্পনা

NAP2.jpg

বেনার নিউজ

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ও সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিসহ অন্যান্য নেতিবাচক প্রভাবের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে ২০২৩ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে ২৭ বছরের করণীয় ঠিক করতে ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যান (ন্যাপ) চূড়ান্ত করেছে সরকার। আগামী বছর থেকে এটি শুরু হওয়ার কথা।

২০০৫ সালে শুরু হওয়ার পর বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে প্রথম ন্যাপ প্রণয়ন করল বাংলাদেশ। তবে সরকারি কর্মকর্তাদের অদক্ষতা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অস্বচ্ছতার কারণে আন্তর্জাতিক উৎস থেকে ন্যাপের আওতায় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ পাওয়ার ব্যাপারে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে মিশরের শারম আল শেখ এ অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। তার আগে অক্টোবর মাসেই ন্যাপ মন্ত্রিসভার অনুমোদন পাবে বলে বেনারকে জানান পরিবেশ অধিদপ্তরের জলবায়ু পরিবর্তন শাখার পরিচালক মির্জা শওকত আলী।

তিনি জানান, মন্ত্রিসভায় অনুমোদন লাভ করার পর এই পরিকল্পনাটি জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সংস্থা ইউএনএফসিসিসি এর কাছে পাঠিয়ে দেয়া হবে।

কেন এই ন্যাপ?

বিশ্বের গড় তাপমাত্রা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ চীন, আমেরিকা, ইউরোপসহ উন্নত দেশগুলোতে মাত্রাতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানী, যেমন কয়লা, ডিজেল, পেট্রোলসহ পেট্রোলিয়াম জাতীয় পদার্থের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার।

এই জীবাশ্ম জ্বালানী পোড়ানোর ফলে কার্বন ডাই অক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইড, মিথেনসহ বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং এর ফলে বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়।

বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকলে অ্যান্টার্কটিকা অঞ্চলের জমে থাকা বরফ গলে সমুদ্রের পানি বৃদ্ধি করবে এবং বাংলাদেশের মতো যেসব দেশ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে খুব বেশি উচ্চতায় নেই, সেসব দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের একটি বড়ো অংশ সাগরের পানিতে তলিয়ে যাবে। ফলে কোটি কোটি মানুষ বাস্তচ্যুত হবে।

এ ছাড়া, বন্যা, খরা, সাইক্লোন, বৃষ্টিহীনতাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি পাবে। ফলে কৃষি উৎপাদন ও নদ-নদীর পানি কমে আসবে। লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাবে। মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। মানুষে মানুষে, বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত বৃদ্ধি পাবে।

জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তাদের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সাত নম্বরে।

তবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হলেও জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশ এবং অন্যান্য স্বল্পোন্নত দেশগুলোর তেমন কোনো ভূমিকা নেই। তারা উন্নত দেশের মানুষের উন্নত জীবন-যাত্রার শিকার।

২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত প্যারিস চুক্তির আওতায় উন্নত দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে অর্থ দেবে। তবে উন্নত দেশগুলো সেই অর্থ সময়মতো দিচ্ছে না।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক ও ন্যাপ প্রস্তুত প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত কর্মকর্তা জিয়াউল হক বেনারকে বলেন, “বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ। আমরা দূষণকারী দেশ নই। আমরা উন্নত দেশগুলোর জীবাশ্ম জ্বালানী পোড়ানোর ফলে দূষণের শিকার।”

তিনি বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে আমাদের তেমন কোনো ভূমিকা নেই। উন্নত বিশ্বকে এবং শিল্পোন্নত দেশগুলোকে দূষণ বন্ধ করতে হবে।”

“জলবায়ু পরিবর্তন একটি বাস্তবতা। এটি ঘটবেই। আমরা এটি ঠেকাতে পারব না,” জানিয়ে জিয়াউল হক বলেন, “তাই, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে আমাদের খাপ খাইয়ে নিতে হবে।”

“পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমাদের মানুষকে রক্ষা করতে কী ব্যবস্থা নিতে হবে, কোন ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে সেগুলোর ওপর আমরা ন্যাপ তৈরি করেছি,” বলেন তিনি।

তিনি বলেন, “এই ন্যাপের আওতায় বিভিন্ন প্রয়োজনীয় প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাবনা প্রস্তুত করে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড, অভিযোজন ফান্ডসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করব। কারণ অভিযোজনের জন্য অর্থ প্রয়োজন।”

মুন্সীগঞ্জে পদ্মার ভাঙনের ঝুঁকিপূর্ণ একটি ঘরের বেড়া ও চাল খুলে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয়রা। ২৬ আগস্ট ২০২১। [রয়টার্স]

প্রাধান্য ঠিক করতে হবে

ন্যাপে ২৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সংস্থানের কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে ১৮৫ বিলিয়ন ডলার পানিসম্পদ খাতে ব্যয় করার কথা বলা হয়েছে বলে বেনারকে জানান পরিবেশ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী।

“তবে সত্যি কথা বলতে গেলে, ১৮ বিলিয়ন ডলার অর্থের সংস্থান কঠিন হবে,” বলেন তিনি।

তিনি বলেন, “সেকারণে আমাদের সেই সকল প্রকল্প হাতে নিতে হবে যেগুলো একাধিক ক্ষেত্রে সুবিধা দেবে। আমাদের প্রকল্পগুলো থেকে প্রাধান্য ঠিক করতে হবে।”

ন্যাপের চূড়ান্ত একটি কপি বেনারের হাতে এসেছে। ন্যাপ অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে বৃহৎ আটটি ক্ষেত্রে মোট ২৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৮৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হবে পানিসম্পদ খাতে।

ন্যাপের আলোকে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে ১১ লাখ হেক্টর জমি বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করা হবে, যার ফলে এক কোটি টন চাল উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এছাড়া মৎস্য চাষের ওপর নির্ভরশীল চার কোটি পরিবারকে রক্ষা করা হবে ও শহরাঞ্চলে তিন কোটি মানুষকে উন্নত নিষ্কাশন সুবিধা দেয়া সম্ভব হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রস্তাবনায়।

ন্যাপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে গত ৪০ বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (জিডিপি) শতকরা দুই ভাগ কমে যাবে।

ন্যাপে বলা হয়েছে, দেশের ১১টি ক্ষেত্রে ১৪ ধরনের দুর্যোগ দেখা দেবে। সেগুলো হলো মৌসুমি বন্যা, পাহাড়ি ঢল, শহরাঞ্চলীয় বন্যা, সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, খরা, লবণাক্ততা, জলোচ্ছ্বাস, নদী ভাঙন, বজ্রপাত, মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও শৈত্য প্রবাহ।

বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে খরার মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতি বছর তিন থেকে ছয় মিলিমিটার হারে সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে ন্যাপে।

NAP3.jpg
পদ্মানদী পাড় ভাঙতে ভাঙতে চলে এসেছে ঘরের পেছনে, নিজের ঝুঁকিপূর্ণ ভিটায় দাঁড়িয়ে তা দেখছেন শরীয়তপুরের এক নারী। ২৩ জুন ২০০৮। [রয়টার্স]

স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে

তবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পরিস্থিতি মোকাবেলা খুব সহজ হবে না বলে মন্তব্য করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ হাফিজুর রহমান।

তিনি বেনারকে বলেন, “দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের অনেক এলাকা ডুবে যাবে। অন্যদিকে কক্সবাজার ও নোয়াখালী অঞ্চলে হয়তো ভূমি জেগে উঠতে দেখা যেতে পারে। এর কারণ নদীবাহিত পলি।”

আবার অন্যদিকে “উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পাহাড়ি ঢল দেখা দেবে,” মন্তব্য করে তিনি বলেন, “সুতরাং, সকল সমস্যা সমাধানে আমরা একটি সমাধান পাব না।”

ন্যাপের অর্থ সংস্থানে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হলো দুর্নীতির আশঙ্কা ও স্বচ্ছতার অভাব, বেনারের কাছে এমন মন্তব্য করেছেন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের উপপরিচালক মিজান আর. খান।

তিনি বলেন, “আমি যে কথা বার বার বলি সেটি হচ্ছে, আমরা ক্ষতিগ্রস্ত বলে চিৎকার করলে টাকা আসবে না। আমরা প্রকল্প বাস্তবায়নে একটি জবাবদিহিমূলক ও স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে তবেই অর্থ আসবে। উন্নত দেশগুলো তখনই অর্থ দেবে যখন তারা দেখবে যে তাদের দেয়া অর্থ অপচয় হচ্ছে না।”

উদাহরণ হিসাবে তিনি বলেন, ভুটানের জনসংখ্যা ১০ লাখের কম, ছোট দেশ। তবে তারা অনেক বেশি অর্থ পেয়ে থাকে। এর প্রধান কারণ হলো, তাদের আর্থিক ব্যবস্থায় দুর্নীতি নেই।

“আমাদের দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় দুর্নীতি রয়েছে, অস্বচ্ছতা রয়েছে। এটি অর্থ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা,” বলেন ড. মিজান।

তিনি বলেন, “যদি আমরা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক আর্থিক ব্যবস্থাপনাসহ প্রকল্প প্রণয়ন করতে পারি সেক্ষেত্রে অর্থ কোনো সমস্যা নয় বলে আমি মনে করি।”

প্রকল্পগুলোর সময় এবং খরচ বৃদ্ধি বাংলাদেশে প্রকল্প বাস্তবায়নের অন্যতম সমস্যা বলে স্বীকার করেন সাবের হোসেন চৌধুরী।

তিনি বলেন, “সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় আমরা ন্যাপ নিয়ে আলোচনা করে সুপারিশ করেছি যে, প্রকল্প সঠিক সময়ে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে মধ্য মেয়াদী পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকতে হবে। একইসাথে একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কিছু বিষয়ের আলোকে গুণগত ফলাফল যাচাই করতে হবে।”

“প্রকল্প বাস্তবায়নে আমাদের কিছু সফলতার উদাহরণও রয়েছে,” মন্তব্য করে তিনি বলেন, “সেকারণে আমাদের সুপারিশ হলো, যেসব পরিচালক অতীতে ভালোভাবে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন তাদের একটি তালিকা তৈরি করে সেখান থেকে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ করতে হবে।”