Skip to content

পোশাক কারখানার সুরক্ষা প্রশ্নে অসন্তুষ্টি কাটছে না

পোশাক কারখানার সুরক্ষা প্রশ্নে অসন্তুষ্টি কাটছে না

বেনার নিউজ

বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানিযোগ্য পণ্য তৈরি পোশাক কারখানার সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ প্রশ্নে বিদেশি পর্যবেক্ষক ও ক্রেতাদের অসন্তুষ্টি পুরোপুরি কাটছে না। অ্যাকর্ডের উত্তরসূরি প্রতিষ্ঠান আরএমজি সাসটেইনেবিলিটি কাউন্সিল (আরএসসি) ১২৯টি তৈরি পোশাক কারখানাকে আন্তর্জাতিকভাবে কাজের অযোগ্য (ইনএলিজিবল) হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

যদিও তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারীদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান এর আগে দাবি করেছিলেন, ২০১৩ সালে রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর থেকে গত বছরের নভেম্বর মাসের মধ্যে শতভাগ কারখানা সুরক্ষিত হয়েছে। গত বছর মেড ইন বাংলাদেশ সপ্তাহের আগে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা জানান।

কিন্তু আরএসসির পক্ষ থেকে ১২৯টি প্রতিষ্ঠানের তালিকা সম্প্রতি সরকারের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরকে দেওয়া হয়েছে, যা কারিগরিভাবে এসকালেশন নামে পরিচিত। ওই কারখানাগুলোর সুরক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে উন্নয়ন ঘটাতে বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে বেনারের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করে আরএসসির কাছ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। কলকারখানা অধিদপ্তর আরএসসি’র দেওয়া তালিকা প্রাপ্তির তথ্য বেনারকে নিশ্চিত করে বলেছে, আগামী ১৯ জানুয়ারি আরএসসি কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।”

ওই তালিকার একটি অনুলিপি বেনারের হাতে এসেছে।

শতভাগ কারখানা সুরক্ষিত- ‘কথাটা অতিরঞ্জিত’

শুক্রবার শ্রম মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের সুরক্ষা অধিশাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম মহাপরিদর্শক ফরিদ আহাম্মদ বেনারকে বলেন, “আরএসসি থেকে এসকালেশনের একটি তালিকা আমাদের শাখায় এসেছে। তবে এ ব্যাপারে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।”

এ ব্যাপারে জানতে তিনি তাঁর অধিশাখার সহকারী মহাপরিদর্শক মো. আকিদ-উল-হাসানের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

“কিছুদিন আগে আরএসসি থেকে ১২৯টি কারখানা এসকালেশনের একটি তালিকা এসেছে,” জানিয়ে আকিদ বেনারকে বলেন, “ওই কারখানাগুলোর প্রত্যেকটি ধরে ধরে আমরা কমপ্লায়েন্ট করার চেষ্টা করব।”

তবে এ জন্য আরএসসি’র তাঁদের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে বলে জানান তিনি।

“এ লক্ষ্যে আগামী ১৯ জানুয়ারি আরএসসি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমাদের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে,” বলেন আকিদ।

এসকালেশন শব্দটি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “কোনো কারখানাকে এসকালেশনে অন্তর্ভুক্ত করার অর্থ হলো—ওই কারখানাটি সুরক্ষাসহ বিভিন্ন মানদণ্ডে পুরোপুরি মানসম্মত নয়।”

এসকালেশন হলে পুনরায় শর্তপূরণ করা ছাড়া সেই কোম্পানি আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশ পায় না বলে জানান তিনি।

আরএসসিতে ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিনিধি আমিরুল ইসলাম আমিন শুক্রবার বেনারকে বলেন, “কারখানা মালিকরা বলে থাকেন যে, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর শতভাগ কারখানা সুরক্ষিত, কমপ্লায়েন্ট। কথাটা অতিরঞ্জিত। এভাবে তাঁরা নিজেদের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে চান কিন্তু প্রকৃত চিত্র ভিন্ন। ১২৯টি কারখানা এসকালেশন এর একটি বড়ো উদাহরণ।”

“তবে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে বিশাল পরিবর্তন হয়েছে সেটি সত্য,” যোগ করেন তিনি।

আমিন বলেন, “এই উন্নয়নের জন্য ব্র্যান্ডগুলোর আন্তর্জাতিক চাপ অন্যতম কারণ।”

যেভাবে উন্নয়ন হলো

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ঢাকার অদূরে সাভারে রানা প্লাজা নামে একটি বহুতল ভবন ভেঙে পড়ে। ওই ভবনে যেসব তৈরি পোশাক কারখানা ছিল সেগুলো বিশ্বের বিভিন্ন নামি-দামি ব্র্যান্ডের জন্য কাজ করত।

দুর্ঘটনায় কমপক্ষে এক হাজার ১৭৫ শ্রমিক নিহত হন। ওই ট্র্যাজেডির পর সারা বিশ্বে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক কেনার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে ওঠে। বাংলাদেশ থেকে পোশাক কেনা ব্র্যান্ডগুলোর ওপর চাপ বৃদ্ধি পায়।

বাংলাদেশের কারখানাগুলোকে সুরক্ষিত করতে ইউরোপীয় ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা অ্যাকর্ড এবং উত্তর আমেরিকার ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা অ্যালায়েন্স নামে দুটি সুরক্ষা মনিটরিং প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে।

ওই প্রতিষ্ঠান দুটি বিভিন্ন কারখানা পরিদর্শন করে সেখানকার অবকাঠামোগত দিক, অগ্নি নির্বাপণ ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিবেচনায় নিয়ে উন্নয়নের শর্ত জুড়ে দেয়। অ্যাকর্ড এবং অ্যালায়েন্সের সুরক্ষা সনদ ছাড়া কোনো ক্রয়াদেশ দেওয়া হতো না।

পাঁচ বছর পর অ্যালায়েন্স বাংলাদেশে কাজ শেষ করে চলে গেলেও অ্যাকর্ড তার কাজ চালিয়ে যেতে চায়। যদিও কারখানার মালিকরা এর বিরোধিতা করতে থাকেন।

২০১৮ সালের পর অ্যাকর্ড বাংলাদেশে থাকবে কি না সেটি আদালত পর্যন্ত গড়ায় এবং আদালতের আদেশে অ্যাকর্ড চলে যায় এবং গঠিত হয় আরএমজি সাসটেইনেবিলিটি কাউন্সিল (আরএসসি), যারা অ্যাকর্ডের কাজকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব পায়। তবে তদারকির এখতিয়ার চলে যায় মালিকদের হাতে।

বর্তমানে আরএসসি বিভিন্ন কারখানা পরিদর্শন করে অবকাঠামোসহ অন্যান্য সুরক্ষার দিকগুলো পর্যালোচনা করে কোনো ত্রুটি পেলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বিষয়গুলোকে সংশোধনের জন্য তাগাদা দেয়। বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠান সংশোধন না করলে দ্বিতীয় ধাপে বিভিন্ন অংশীজনকে বিষয়টি অবহিত করা হয়। এরপরও সুরাহা না হলে তৃতীয় ধাপে এসকালেশন করা হয়।

যা বলছে বিজিএমইএ

স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএ’র মিডিয়া ফোকাল পারসন শোভন ইসলাম শাওন শুক্রবার বেনারকে জানান, বর্তমানে সাব-কনট্রাকটিং মিলিয়ে বাংলাদেশে দুই হাজার ৮০০ কারখানা চালু আছে।

তিনি বলেন, “আমাদের কারখানার সংখ্যা বিবেচনায় নিলে ১২৯টি কারখানার সংখ্যা খুব বেশি নয়। তবুও আমরা আরএসসি’র এই বিষয়টি বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে সাংঘাতিক রকমের গুরুত্ব দিয়ে থাকি।”

শাওন বলেন, “এর কারণ হলো, আরএসসি যখন এসকালেশন করে তখন বিষয়টি সারা বিশ্বের সব ব্র্যান্ডসহ বিভিন্ন অংশীজনের কাছে চলে যায় এবং সেই কোম্পানি থেকে তারা আর পণ্য ক্রয় করে না।”

“আরএসসি যে কাজ করছে সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তারা বাংলাদেশের কারখানাগুলোকে নিরাপদ করতে কাজ করছে। আমরাও কারখানাগুলোর কাঠামোগত, অগ্নি ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তার বিষয়টিকে সাংঘাতিক গুরুত্ব প্রদান করি,” বলেন তিনি।

তিনি বলেন, “আশা করি, আরএসসি’র তালিকা অনুযায়ী ওই সব কারখানাগুলোকে নিরাপদ করতে সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাবে বিজিএমইএ।”

মূলত ১৯৮৩-৮৪ সাল থেকে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক রপ্তানি শুরু করে। সেই অর্থবছরে মাত্র সাড়ে ৩১ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়, যা বাংলাদেশের মোট রপ্তানির শতকরা চার ভাগেরও কম।

বর্তমানে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮২ শতাংশই তৈরি পোশাক। বিজিএমএইএ’র হিসাবে ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে।

আমরা আশা ছাড়িনি’

গত বছরের ২৮ জুন নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লায় অবস্থিত জাস অ্যাপারেলকে নন-কমপ্লায়েন্ট ঘোষণা করেছে আরএসসি।

প্রতিষ্ঠানটি মহাব্যবস্থাপক আবুল কালাম আজাদ শুক্রবার বেনারকে বলেন, “আমাদের কোম্পানিকে এসকালেট করেছে আরএসসি। তারা আমাদের কিছু উন্নয়ন করার পরামর্শ দিয়েছিল, সেটি আমরা করতে পারিনি। তাদের দেওয়া কাজের শতকরা ৮৫ শতাংশ শেষ করেছি। কিন্তু এর মধ্যেই আমাদের এসকালেট করেছে।”

তিনি বলেন, “হয়তো তাদের দিক থেকে তারা ঠিক আছে কিন্তু আমাদেরও কিছু কথা আছে। আরএসসি আমাদের অবস্থা বিবেচনায় নিতে পারত।”

আজাদ বলেন, “আমরা নন-ব্র্যান্ড ছিলাম। আরএসসির পূর্ববর্তী প্রতিষ্ঠান অ্যাকর্ড আমাদের কোম্পানিকে ব্র্যান্ডের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি এবং ব্র্যান্ডের কাছ থেকে অর্থ দিয়ে কারখানার উন্নয়নের আশ্বাস দিয়েছিল।”

“এরপর অ্যাকর্ড বাংলাদেশ থেকে চলে গেল, গঠিত হলো আরএসসি। ২০২০-২১ সালে শুরু হলো কোভিড-১৯ মহামারি। আমরা এতো কাজ করলাম কিন্তু কোনো লাভ হলো না,” বলেন তিনি।

আবুল কালাম আজাদ বলেন, “এই এসকালেশনের কারণে ১৮ মাস আমরা আর কোনো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের কাজ পাব না। তবে আমরা আশা ছাড়িনি, কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের কারখানা চালু আছে। আমরা কমপ্লায়েন্ট হব।”