Skip to content

পুলিশি পাহারায় কি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করা যায়?

পুলিশি পাহারায় কি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করা যায়?

বাংলাদেশে এখন নির্বাচনের উত্তেজনার পাশাপাশি চলছে উৎসব। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা শুরু হচ্ছে। গণমাধ‍্যমে প্রকাশিত তথ‍্য অনুযায়ী এবার  সারা দেশে ৩২ হাজার ৪০৮ মণ্ডপে অনুষ্ঠিত উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। গত বছর ছিল ৩২ হাজার ১৬৮টি। এর মধ‍্যে ঢাকা মহানগরীতে এই পূজা অনুষ্ঠিত হবে ২৪৫টি মন্দিরে। তবে প্রতিবছরের মতো এবারও দুর্গাপূজার আগে আগে মণ্ডপে প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে ১০টি পূজামণ্ডপে প্রতিমা ভাঙচুর এবং গত এক বছরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ৩৫টি সংখ‍্যালঘু ও মন্দির ভাঙচুরের খবর গণমাধ‍্যম সূত্রে জানা গেছে।

সর্বশেষ প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে ফরিদপুর সদরে কৈজুরী ইউনিয়নের তাম্বুলখানা বাজারে। সেখানে রাতের অন্ধকারে প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়েছে। এই এলাকায় এবারই যে এই ধরনের প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে তা নয়, ২০২১ সালেও হয়েছে। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, এ দেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, সংখ্যালঘু নির্যাতন ও পূজার সময় মন্দিরে হামলা এবং প্রতিমা-ভাংচুরের ঘটনা প্রতিবছরই কম-বেশি ঘটছে। এবং এখন পর্যন্ত এগুলোর কোনও বিচার হয়নি।

এবারও আগের মতো এই উৎসব যেন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় সেজন‍্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ সদর দফতরে ট্রাফিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমন্বয়ের সভা শেষে জানানো হয়েছে যে ‘সমসাময়িক পরিস্থিতি মাথায় রেখে নিরাপত্তা ব‍্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রত‍্যেকটি মণ্ডপে পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ ও টহল পুলিশের প্রয়োজনীয় নম্বরসমূহ প্রকাশ‍্যে ঝুলিয়ে  রাখতে হবে, যাতে যেকোনও সময় যোগাযোগ করা যায়।

এখানে একটি বিষয় যে আমাদের নিরাপত্তার বিষয়টি পুলিশি পাহারার মধ‍্যে সীমিত। প্রতিবারের মতো এবারও পুলিশ পাহারা রেখে নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়ে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারেই এত কিছুর মধ‍্যেই প্রতিমা ও মন্দির ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পুলিশি পাহারার পরও কেন এই ধরনের ঘটনায় এখন পযর্ন্ত সরকারি পর্যায়ে কোনও ধরনের অনুসন্ধান কিংবা বিশ্লেষণ পাওয়া যায়নি। দুর্বৃত্তরা এই ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে এই ধরনের বক্তব‍্য দিয়েই আমরা দায়িত্ব শেষ করি। কিংবা এর আগের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি কোনও কোনও ক্ষেত্রে কয়েকজন মন্ত্রী (হিন্দু ধর্মাবলম্বী) দিয়ে বাণীও দেওয়া হয়েছে যে কোথাও কিছু ঘটেনি এবং দেশে সম্প্রীতি বজায় আছে।

অন‍্যদিকে ডিএমপি কমিশনার হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘ডি জে পার্টি করবেন না, ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পূজা করবেন’। এই ধরনের নির্দেশ এবং নিরাপত্তার ধরনটিকে যদি আমরা আমলে নিই, তাহলে কী দেখবো? এর আগে আরও কিছু প্রশ্নের ফয়সালা হওয়া প্রয়োজন।

কেন আমাদের পুলিশি নিরাপত্তার কথা ভাবতে হয়? কেন প্রতিবছর আমরা একই ধরনের ভাঙচুর এবং হামলা প্রত‍্যক্ষ করি? কেন এগুলোর কোনও বিচার হয় না? কেন প্রতিবছরই উৎসবের সময় সংখ্যালঘুরা ভয়ের মধ‍্যে থাকেন? কেন প্রায়ই সংখ‍্যালঘু মানুষদের ওপর সহিংসতা হয়? কেন উৎসবে বিভিন্ন ধরনের শর্ত যুক্ত হচ্ছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের খুঁজতেই হবে সবার আগে। তাহলেই আমরা নিরাপত্তার রাজনীতি বিষয়ে আরও গভীরে পৌঁছাতে পারবো। নিরাপত্তার বিষয়টি কি পুলিশি পাহারার বিষয়? যখন একটি রাষ্ট্র পুলিশি নিরাপত্তা দিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিশ্চিত করতে চায় তখন এটি একভাবে জানান দেয় যে দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নেই। তার মানে হলো উৎসবে যেকোনও কিছু ঘটতে পারে। তাহলে আমাদের আরও জানা প্রয়োজন যে কেন এই ভয়ের জায়গা? যদি ভয়ের জায়গা রাষ্ট্র চিহ্নিত করতে পারেই, তাহলে সেই ভয় দূর করতে রাষ্ট্র কী ব‍্যবস্থা নিয়েছে?

না, পুলিশি পাহারা ছাড়া তেমন কোনও ব‍্যবস্থা নেয়নি। আর কেন এসব ভয়? কারণ, আমরা জানি দেশে কীভাবে প্রতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে সাম্প্রদায়িকতার চাষাবাস হয় এবং সেটি কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে? কীভাবে কিছু ধর্মীয় ওয়াজ থেকে সাম্প্রদায়িকতার বীজ ছড়ানো হয়, সেই বিষয়ে কি আমরা কখনও মাথাব‍্যথা করি? আর সেই ওয়াজ তো বাসে এবং বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদহীনভাবেই বাজানো হয়।

আমাদের মনোযোগ সেদিকে নেই, যতটা আমরা পুলিশ পাহারার আওয়াজ তুলি। কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ‍্যমেও সাম্প্রদায়িক হামলা, মন্দির এবং প্রতিমা ভাঙচুরকে বৈধতা দেওয়ার মধ‍্য দিয়ে আমরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আওয়াজ তুলি সেই বিষয়ে আমাদের বিশ্লেষণ অতি সামান‍্য।

তাই বলে রাখতে চাই, কোনও উৎসব একমাত্র পুলিশি পাহারার ম‍ধ‍্য দিয়ে ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি’ হয় না। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কোনও নির্দিষ্ট সময়ের বিষয় নয়। এই সম্প্রীতি সবসময়ের বিষয়ে। সব সময়ে উদাস থেকে, সাম্প্রদায়িকতার কলাকৌশল তৈরি এবং সেটি প্রয়োগের সুযোগ দিয়ে শুধু উৎসব এলেই ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির’ ঘোষণা আদতে একটি রাষ্ট্রে সংখ‍্যালঘু -সংখ‍্যাগুরুর সম্পকর্কে পাঠ করতে সাহায‍্য করে না।

তাই করণীয় অনেক। প্রথমেই আমাদের বন্ধ করতে হবে সাম্প্রদায়িকতা তৈরি এবং ছড়ানোর কারখানাগুলো। সেগুলো জারি রেখে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আওয়াজ কোনোভাবেই কোনও অর্থ বহন করে না, সেটি আমরা জেনে গেছি। মানুষের সাথে মানুষের অসাম্প্রদায়িক সম্পর্কই তো হবে সম্প্রীতির বড় জায়গা। সেই জায়গাতেই আমরা কাজ করতে পারছি না। কারণ, আমরা নানাভাবে সংখ‍্যাগুরুর ধর্মীয় বিশ্বাসকে ব‍্যবহার করতে চাই। আর আমাদের সেই চাওয়াটাই মূলত জিইয়ে রাখছে সাম্প্রদায়িকতা উৎপাদনের কারখানাগুলো। সেগুলো বন্ধ করতে না পারলে পুলিশ পাহারা কোনও কাজে আসবে না। কারণ, মানুষের ওপরই আমাদের বিশ্বাস করতে হবে, আস্থা রাখতে হবে। সেই জায়গাটা ফিরিয়ে আনা খুব জরুরি।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ‍্যালয়। ইমেইল: [email protected]



বার্তা সূত্র