পাঁচ দশকে বাংলাদেশ : ‘প্রকৃত স্বাধীনতা’র নিরন্তর চেষ্টা

 

* ড. আতিউর রহমান  *

বহু সংগ্রাম ও প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। কিন্তু সদ্য স্বাধীন দেশের সামনে ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। যে সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা থেকে জনগণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে অংশ নিয়ে এ দেশ থেকে দখলদারদের বিতাড়িত করেছিলেন, স্বাধীন দেশের জনগণকে সাথে নিয়ে দ্রæততম সময়ে সে স্বপ্ন পূরণই ছিল তখন তাঁর প্রধানতম লক্ষ্য। তাই ১৯৭৩ সালে বিজয় দিবসের প্রাক্কালে তিনি বলেছিলেন, ‘এ স্বাধীনতা তখনই আমার কাছে প্রকৃত স্বাধীনতা হয়ে উঠবে, যেদিন বাংলার কৃষক-মজুর ও দুঃখী মানুষের সকল দুঃখের অবসান হবে।’ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এই ‘প্রকৃত স্বাধীনতা’র জন্যই বাংলাদেশের মানুষ নিরন্তর প্রচেষ্টা শুরু করে স্বাধীনতার পর থেকেই। যুদ্ধ-পরবর্তী ছাই-ভস্মের মধ্যে একেবারে শূন্য থেকেই যাত্রা শুরু করতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। ভাবতে অবাক লাগে যে, বঙ্গবন্ধু যখন দেশের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিলেন তখন অর্থনীতির আকার ছিল মাত্র আট বিলিয়ন ডলার, রিজার্ভ ছিল শূন্য। জিডিপির তুলনায় সঞ্চয়ের অনুপাত আট শতাংশ আর বিনিয়োগের অনুপাত নয় শতাংশ। শুধু তাই নয়, আমাদের নিজস্ব উদ্যোক্তা শ্রেণি বলতে গেলে ছিলই না। অন্যদিকে উপর্যুপরি আঘাত হানছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগ। আন্তর্জাতিক রাজনীতিও আমাদের অনুক‚লে ছিল না। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য ওঠা-নামা, অন্যদিকে খাদ্য সহায়তা নিয়ে পরাশক্তিগুলোর রাজনীতি এসবের ফলে বাংলাদেশ সত্যিই ভীষণ নাজুক অবস্থায় ছিল।

এমন প্রতিকূলতার মধ্যেও জাতিকে দিশা দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে করেই কীভাবে এগিয়ে যাওয়া যায় সে উদাহরণ তিনি দেশবাসীর সামনে স্থাপন করে চলেছিলেন তাঁর স্বল্পকালীন শাসনামলে। জাতীয় আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাখাকেই তিনি দিয়েছিলেন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। দ্রুততম সময়ে প্রণয়ন করেছিলেন জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং অসাম্প্রদায়িকতা এই চার মূল স্তম্ভের ভিত্তিতে সংবিধান। ১৯৭২-এর ওই সংবিধানে মানবাধিকার, বিকেন্দ্রীকরণ, সবার জন্য শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবা, নারীর ক্ষমতায়ন, কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন এবং সর্বোপরি সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার সমুন্নত রাখার মাধ্যমে ‘সকলের জন্য সমান সুযোগে’র প্রতিশ্রæতি দেয়া হয়। পাশাপাশি যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, এক কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসন, ২০ লাখ ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢেলে সাজানোর মতো কাজগুলো বঙ্গবন্ধুকে সম্পদের প্রবল সীমাবদ্ধতা সত্তে¡ও করতে হয়েছে দ্রæততম সময়ের মধ্যেই। একই সঙ্গে দেশের সেরা অর্থনীতিবিদ ও কারিগরি বিশেষজ্ঞদের সমবেত করেছিলেন পরিকল্পনা কমিশনে। সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে পরিকল্পিত উপায়ে দেশেকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি দু’পায়েই হাঁটছিলেন। কৃষি ও শিল্পের ওপর সমান গুরুত্ব দিয়ে তিনি ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করেছিলেন।
এ দেশের অর্থনীতি শুরুর সময় প্রধানত কৃষিনির্ভর ছিল। তাই বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন দর্শন ও পরিকল্পনাতেও কৃষি উন্নয়ন একটি কেন্দ্রীয় বিবেচনার জায়গায় ছিল। কৃষি অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, উচ্চ ফলনশীল বীজ সরবরাহ, ভর্তুকি বা বিনামূল্যে কৃষি উপকরণ সরবরাহ, কৃষকদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান আমলে করা ১ লাখ সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার, এবং কৃষকদের জন্য ন্যায্যমূল্য এবং রেশন সুবিধা চালুর মতো উদ্যোগগুলো বাংলাদেশে শুরু করেছিলেন বঙ্গবন্ধুই। পরবর্তীতে কৃষিকে দেয়া এই পৃষ্ঠপোষকতার সুফল পেয়েছে পুরো সামষ্টিক অর্থনীতিই। তবে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় কাক্সিক্ষত গতি আনতে যে কৃষির পাশাপাশি শিল্পকেও দ্রæত ও কার্যকরভাবে বিকশিত করতে হবে সে বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর ছিল সজাগ দৃষ্টি। প্রথম পর্যায়ে বৃহৎ শিল্প পরিচালনার জন্য উদ্যোক্তা শ্রেণির অনুপস্থিতির কারণে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে শিল্প খাতের বিকাশের পথ বেছে নেন। এর ফলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে শিল্পোৎপাদনও বেড়েছিল। তবে ধীরে ধীরে এই ‘স্টেইট-লেড মডেল অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট’ থেকে ব্যক্তি খাতে শিল্প বিকাশের দিকে যাচ্ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি শুরুতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে শিল্পের বিকাশ ঘটিয়ে ব্যক্তি খাতের জন্য পরিবেশ সৃষ্টি করার পক্ষপাতি ছিলেন। তাই ১৯৭৪-৭৫-এ এসে দেখতে পাই তিনি ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের সীমা ২৫ লাখ থেকে ৩ কোটি টাকায় উন্নীত করেছেন, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প ব্যক্তি খাতে হস্তান্তর করেছেন।
তাৎক্ষণিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু ভেবেছেন দীর্ঘমেয়াদি বিষয়গুলো নিয়েও। কারণ উন্নয়নের সুফলগুলোকে একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দেয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই। বঙ্গবন্ধু প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছিলেন স্বনির্ভর দেশ গড়ে তোলার জন্য পরিকল্পনা মাফিক এগিয়ে যাওয়ার একটি ধারাবাহিকতা তৈরি করার জন্য। একই সঙ্গে ছোট অর্থনীতির দেশের জন্য মানব সম্পদই যে সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে সেটিও স্পষ্ট ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতির কাছে। তাই কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন করেছিলেন বাংলাদেশ নিয়ে আশাবাদী শিক্ষিত তরুণদের প্রস্তুত করতে যারা পরবর্তীতে সকলের জন্য সমান সুযোগ তৈরিকে ভ‚মিকা রাখবে। এর আগে ১৯৭০ সালের প্রাক-নির্বাচনী ভাষণেও তিনি শিক্ষা খাতে জিডিপির অন্তত চার শতাংশ বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন।
মাত্র চার বছরেরও কম সময়ে বহু বিশেষজ্ঞের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে বঙ্গবন্ধু তাঁর বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ‘এক্সপ্রেস ওয়ে’তে তুলে দিয়েছিলেন। এত অল্প সময়ে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত ক্ষুদ্র অর্থনীতির এমন করে ঘুরে দাঁড়ানোর ঘটনা ইতিহাসে নিতান্ত বিরল। ওই অল্প সময়েই তিনি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে একটি শক্ত ভিত্তিই শুধু দিয়েছিলেন তাই নয়, বরং দ্রুতগতির এবং জনগণ-কেন্দ্রিক উন্নয়নের আগামীর পথনকশা জনগণের সামনে হাজির করে তিনি সকলকে আশাবাদীও করে তুলেছিলেন। এই অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় প্রায় তিন গুণ বেড়ে ২৭৩ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছিল। ওই অভিযাত্রায় ষড়যন্ত্রকারীদের কারণে যদি ছেদ না পড়ত, যদি ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে শারীরিকভাবে আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া না হতো তাহলে আজকে আমরা কোথায় থাকতাম তা ভাবতেই অবাক লাগে!
আমাদেরই দুর্ভাগ্য যে, বঙ্গবন্ধুকে হারিয়ে দেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের অভিযাত্রা পরের দুই দশকে মন্থর হতে হতে প্রায় থেমে গিয়েছিল। গত শতাব্দীর শেষ দশকের শুরুতে উদারিকরণের ফলে অর্থনীতিতে কিছুটা গতি এলেও তা প্রত্যাশা ও আমাদের প্রকৃত সম্ভাবনার তুলনায় নিতান্ত নগণ্যই বলতে হবে। তবে বঙ্গবন্ধু আমাদের মননে ও চিন্তায় সব সময়ই ছিলেন, আছেন। তাই বহু বাধা ডিঙিয়ে এগুনোর যে মানসিকতা তিনি এ জাতির মধ্যে তৈরি করেছিলেন তার কল্যাণেই আমাদের সংগ্রাম অব্যাহত ছিল। আর তার ফলে ১৯৯৬-এ দেশ আবার সঠিক পথে ফেরে তাঁরই সুযোগ্য কন্যা আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে। দেশের শাসনভার হাতে নিয়েই বঙ্গবন্ধুকন্যা তাঁর পিতার দেখানো পথে দেশকে এগিয়ে নিতে শুরু করেন। তাঁরও একই উদ্দেশ্য ছিল দেশের প্রান্তিক মানুষের কাছে উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দিয়ে ‘প্রকৃত স্বাধীনতা’ নিশ্চিত করা। ‘প্রকৃত স্বাধীনতা’ বলতে তিনিও বঙ্গবন্ধুর মতোই ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সুশিক্ষিত এক সমাজ গঠনের কথাই বুঝিয়ে থাকেন।
২০০১-এ ষড়যন্ত্রকারীদের তৎপরতায় আবারও এ অভিযাত্রায় ছেদ পড়েছিল। কিন্তু আবারও জীবনবাজি রেখে সংগ্রাম করে ক্ষমতায় ফিরে আসেন বঙ্গবন্ধুকন্যা আজ থেকে ১২ বছর আগে। আর তারপর থেকে আমাদের উন্নয়ন অভিযাত্রার গতি তো যেন কল্পনাকেও হার মানিয়েছে! সামষ্টিক-অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সকল সূচকে আমরা যেমন অভাবনীয় মাত্রায় এগিয়ে গিয়ে সকলের জন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছি, তেমনি শক্তিশালী সামষ্টিক-অর্থনৈতিক ভিত্তির জোরে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা ও করোনা মহামারি মোকাবিলার ক্ষেত্রেও নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ রেখে চলেছি।
বঙ্গবন্ধু যে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের অভিযাত্রা শুরু করেছিলেন এবং তাঁর সুযোগ্যকন্যা যে ধারাকে আরও বেগবান করেছেন তাঁর সামষ্টিক-অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবগুলো যেমন আমাদের আলোচনা করা দরকার তেমনি দরকার এই সাফল্যের পেছনে যে বিষয়গুলো কাজ করেছে সেগুলোর এক ধরনের নির্মোহ মূল্যায়নও। কারণ সময়ের সাথে সাথে আমাদের উন্নয়নের চ্যালেঞ্জগুলোও পরিবর্তিত হয়েছে। আর এ ধরনের মূল্যায়ন আমাদের সেসব পরিবর্তিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগিয়ে যাওয়ার পথনকশা তৈরিতে সহায়তা করবে।
১৯৭৫-এর পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ৭ গুণেরও বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২,০০০ মার্কিন ডলারে। ১৯৯০-পরবর্তীকালে মাথাপিছু আয় আগের চেয়ে তুলনামূলক দ্রæত বেড়েছে ঠিকই, তবে বিশেষ করে বিগত ১০-১২ বছরে এক্ষেত্রে নাটকীয় গতি এসেছে। তাই ১৯৭৫ থেকে এখন পর্যন্ত মাথাপিছু আয়ে যে বৃদ্ধি হয়েছে তার ৭৩ শতাংশই হয়েছে গত এক দশকে। একই কথা প্রযোজ্য প্রবৃদ্ধির হারের ক্ষেত্রেও। গত এক দশকে জিডিপি গড়ে ৭ শতাংশ হারে বেড়েছে। অথচ আগের দুই দশকের গড় প্রবৃদ্ধির হার ৫ শতাংশ। স্বাধীনতার পাঁচ দশকে রপ্তানি আয় ৯৮ গুণ বেড়ে ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এই প্রবৃদ্ধিরও দুই-তৃতীয়াংশ হয়েছে বিগত দশকে। বিগত এক দশকে রেমিট্যান্স দ্বিগুণ হয়েছে, আর রিজার্ভ বেড়েছে চার গুণ।
অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মে জিডিপিতে কৃষির অবদান কমেছে। কৃষির অবদান ১৯৯০ সালে ২৬ শতাংশ থেকে ২০১৯-এ ১৪ শতাংশে নেমে এসেছে। এই জায়গা দখল করেছে শিল্প খাত (১৮ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশ)। মোট খাদ্য উৎপাদন কিন্তু বেড়েছে। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালের তুলনায় বর্তমানে আমরা ৪ গুণ বেশি খাদ্যশস্য উৎপাদন করছি। তাই খাদ্য উৎপাদন সূচকে পেছনে ফেলেছি চীন, ভারত ও ভিয়েতনামের মতো বড় কৃষির দেশগুলোকেও। আর গ্রামাঞ্চলে অ-কৃষি আয়ের সুযোগ বাড়ায়, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও কৃষি মজুরি কমেনি, বরং বেড়েছে। উল্লেখ্য, এ দেশের গ্রামাঞ্চলেও এখন মোট আয়ের বড় অংশ আসছে অ-কৃষি খাত থেকে। সর্বোপরি ধারাবাহিকভাবে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হওয়ায় সকল আয়-শ্রেণির নাগরিকদের চাপমুক্ত রাখা সক্ষম হয়েছে। মোট কথা, আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা একই সঙ্গে দ্রুতগামী এবং ভারসাম্যপূর্ণ রাখা সম্ভব হয়েছে।
সামাজিক উন্নয়ন সূচকগুলোতেও এই ধারাবাহিকতার ছাপ পড়েছে। তাই শেষ তিন দশকে দারিদ্র্য ও অতিদারিদ্র্যের হার অর্ধেকেরও নিচে নামিয়ে আনা গেছে যথাক্রমে ২০ ও ১০ শতাংশের আশপাশে। পাশাপাশি মানব উন্নয়ন ও জেন্ডার সম্পর্কিত সূচকেও বাংলাদেশ অনেক নন-এলডিসি দেশকে ছাড়িয়ে গেছে। তবে এত সব সাফল্যের পরও আয়বৈষম্য কিছুটা বেড়েছে। তবে ভোগবৈষম্য অতটা না বাড়ায় জনগণ স্বস্তিতেই থেকেছেন। সত্যি বলতে দ্রæত প্রবৃদ্ধির সাথে সাথে বৈষম্য যে হারে বাড়ার কথা বাংলাদেশে তা হয়নি। তাই নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ পল রোমার বলেছেন, ‘বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে এ কথা স্পষ্ট হয়েছে যে, একই সঙ্গে আরও প্রবৃদ্ধি ও সাম্য অর্জন করা সম্ভব। আমি নিশ্চিত যে, মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়াতেও বাংলাদেশ প্রবৃদ্ধি ও সাম্যের যুগপৎ ধারা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হবে।’
বাংলাদেশের এমন অভাবনীয় অর্জনের পেছনে প্রধানতম শক্তি হিসেবে কাজ করেছে যে বিষয়গুলো সেগুলোও আলাদা মনোযোগের দাবি রাখে। প্রথমত, সরকারের যথাযথ নীতি ও কর্মসূচিগুলোর পাশাপাশি দেশের এনজিওগুলো যেন একটি কার্যকর সম্পূরক ভ‚মিকা রাখাতে পারে সে পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলত প্রত্যন্ত অঞ্চলে আর্থিক সেবা থেকে শুরু করে প্রান্তিক মানুষকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ইত্যাদি সেবা দেয়ার ক্ষেত্রেও সফলতা এসেছে দ্রæত। দ্বিতীয়ত সাম্প্রতিক দশকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির যে নীরব বিপ্লব এ দেশে সংগঠিত হয়েছে তাও পুরো অর্থনীতিকে এমনভাবে চাঙ্গা করেছে যার সুফল পেয়েছেন সামাজিক পিরামিডের পাটাতনে থাকা নাগরিকরা। বিশেষ করে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে আর্থিক সেবা ছড়িয়ে দেয়ার সুফল তো এই করোনাকালেও দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে প্রধানতম ভ‚মিকা রেখেছে। সর্বোপরি আমাদের জনশক্তির বড় অংশটি তরুণ হওয়াটাও সরকারের সুবিবেচনাপ্রসূত নীতি বাস্তবায়নে সহায়ক হয়েছে। তাই মানবসম্পদ উন্নয়নকে বিশেষ অগ্রাধিকারে রাখার ধারা অব্যাহত রাখা হয়েছে। এর বাইরে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণেও বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে সাফল্য দেখিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ব্যবসার পরিবেশ সূচকে সম্প্রতি আট ধাপ অগ্রগতি তাই প্রমাণ করে। আমার বিশ্বাস, পদ্মা সেতু ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ মেগাপ্রকল্পগুলোর কাজ যে গতিতে এগুচ্ছে তা ধরে রাখা গেলে অচিরেই আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও আমরা নাটকীয় উল্লম্ফন দেখতে পাবো।
আগেই বলেছি, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা গেছে বলেই এই করোনাকালেও বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে মহামারি মোকাবিলায় ভালো করেছে বাংলাদেশ। এ কথাও মানতে হবে যে, মহামারির কারণে আমাদের অগ্রযাত্রায় কিছুটা ছেদ পড়েছে। তবে বঙ্গবন্ধুকন্যা সম্প্রতি যে অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন তাতে প্রতিফলিত হয়েছে আমাদের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের রূপরেখা। বঙ্গবন্ধুর মতোই তাঁর কন্যাও আমাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার আত্মবিশ্বাস দিয়ে চলেছেন। সেই আত্মবিশ্বাস আর সকলের জন্য সমান সুযোগ তৈরির ‘প্রকৃত স্বাধীনতা’র প্রতি আমাদের প্রতিশ্রুতি অটুট রেখে সকলে মিলে এগিয়ে যাওয়াটাই এখন কাম্য।
এরই মধ্যে করোনা প্রতিরোধ সংগ্রাম আরও জোরদার করার জন্য টিকা প্রদান শুরু হয়ে গেছে। বাংলাদেশ টিকার দেশ। এক্ষেত্রে তার রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য। তাই নানা অপপ্রচার সত্তে¡ও মানুষ আগ্রহ নিয়েই টিকা দিচ্ছেন। আমার বিশ্বাস, এই টিকা-অভিযান আরো সচল হবে সামনের দিনগুলোতে। আর তা হওয়ার সাথে সাথে আমাদের সমাজ ও অর্থনীতিতে আস্থার পরিবেশের উন্নতি হবে। ফলে ‘বিজনেস কনফিডেন্স’ও বাড়বে। উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে উৎসাহী হবেন। আর প্রণোদনা কর্মসূচির মাধ্যমে পুরনো ও নতুন উদ্যোক্তাদের অনক‚লে যেভাবে তারল্যের জোগান দেয়া হচ্ছে তাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পালে আরও জোর হাওয়া লাগবে। মানুষের আয়-রোজগারও বাড়বে। ভোগ ও চাহিদা দুই-ই বাড়বে। দেশীয় বাজার সম্প্রসারিত হবে। আর বাংলাদেশ তার গতিময়তা মুজিববর্ষ ও সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে আরো বেগবান করতে সক্ষম হবে। আর তাতেই আমাদের ‘প্রকৃত স্বাধীনতা’র স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার সফল হবে।

*লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর। ভোরের কাগজ থেকে সংগৃহীত

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।