Skip to content

পরিবারের অন্য সদস্যদের হয়রানির প্রবণতা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না- মাহফুজ আনাম | প্রসঙ্গঃ ভিন্নমতালম্বী প্রবাসী সাংবাদিক

পরিবারের অন্য সদস্যদের হয়রানির প্রবণতা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না- মাহফুজ আনাম | প্রসঙ্গঃ ভিন্নমতালম্বী প্রবাসী সাংবাদিক

ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে সরকারের অবস্থানকে সরকারের ভুল পদক্ষেপ বলে মনে করেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি মাহফুজ আনাম। ভয়েস অফ আমেরিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, “সরকার কোন আইনি প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করে না, আমার বাস্তব অভিজ্ঞতায় এটা আমি একদম সমর্থন করতে পারি না। আমি একাধিক জায়গায় দেখেছি যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আইন যে দ্রুততার সঙ্গে এগোয় আর অন্যান্য ক্ষেত্রে আইন যে স্থবির হয়ে যায়, এসব কিছুর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকে, এবং আমি মনে করি যে শ্রম আইনের অধীনে আমাদের নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ইউনূসের মত ব্যক্তিত্বকে, এভাবে তাঁকে একটা অপমানকর পরিবেশে নিয়ে যাওয়া, এটার কোন যুক্তি নেই।”

বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে, বাক স্বাধীনতার ওপর আক্রমণ, মিডিয়া ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তার ওপর হুমকি , সরকারের তরফ থেকে বিদ্যমান কালো আইন ও নতুন মোড়কে পুরোনো আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীসহ সরকার বিরোধীদের ওপর আইনি প্রক্রিয়ার অপপ্রয়োগ ইত্যাদির কারণে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া যে চ্যালেঞ্জ গুলোর মুখোমুখি হচ্ছে, এসব প্রসঙ্গ নিয়ে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি, বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ইংরেজি দৈনিক দি ডেইলি ষ্টার এর সম্পাদক মাহফুজ আনাম ভয়েস অফ আমেরিকাকে গত ২৫ অক্টোবর বুধবার সাক্ষাৎকার দেন।

সাক্ষাৎকারে, একটি সুষ্ঠু, অবাধ এবং শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নীতির ভূমিকা রাখা সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও প্রধান বিরোধীদল, উভয়েই এই ভিসা নীতিকে ওয়েলকাম করেছে…”কিন্তু এটা আসলে সুষ্ঠু নির্বাচনকে সাহায্য করবে কি করবে না এটা আমি এই মুহূর্তে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বলতে পারছি না।”

সদ্য চালু হওয়া সাইবার সিকিউরিটি একট প্রসঙ্গে জনাব আনাম বলেন, “আমার জানা মতে, সাইবার সিকিউরিটির এই ড্রাফ্টটা করার সময়ও সাংবাদিকদের কোন প্রতিনিধি বা সম্পাদকদের কোন প্রতিনিধির সাথে এটা নিয়ে আলোচনা তারা করেননি। ………… সাইবার সিকিউরিটি এ্যাক্ট যেটা পাস হয়েছে— আমাদের মতে শুধু খোলস পরিবর্তন ছাড়া সাইবার সিকিউরিটি আইন-এর সাথে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের, গুণগত বা উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন নেই। বাকস্বাধীনতা, মত প্রকাশের অধিকার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা— এই বিষয়গুলো খর্ব করার মতো অনেক উপাদান এই আইনে রয়ে গেছে।”

সাইবার সিকিউরিটি একট এর ৪২ ধারাতে পুলিশকে ওয়ারেন্ট ছাড়া সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে তল্লাশি, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, সার্ভারসহ সবকিছু জব্দ ও গ্রেফতারের যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মাহফুজ আনাম বলেন, “ধরেন একজন পুলিশ অফিসার, তার সন্দেহ হলো এবং যেটাকে ওরা বলে আর কি, ‘in good faith’, তার কিন্তু কোন প্রমাণ দেয়ার প্রয়োজন নাই, ইন গুড ফেইথ সে ভাবছে যে আমার সার্ভারের মধ্যে হয়তো রাষ্ট্রীয় কিছু গোপনীয় তথ্য থাকতে পারে যেটা দেশের জন্য খারাপ, তো উনি আমার সার্ভারটা সিজ করে নিয়ে গেলেন। ইন এফেক্ট, উইথ মাই সার্ভার বিং সিজড, ওই রাত্রে তো আমি খবরের কাগজটা বের করতে পারবো না! তো এই ধরনের সম্ভাবনার জায়গা আছে এবং আমরা মনে করি যে এই সাইবার সিকিউরিটি আইনটা, যে কারণে তারা একটা নতুন আইন করলেন ডিজিটাল সিকিউরিটির বদলে সাইবার সিকিউরিটি, এই যে পুরো একটা এক্সারসাইজ, এই এক্সারসাইজের ফল হিসেবে আমরা সম্পাদক পরিষদ থেকে বিবৃতি দিয়ে বলেছি যে এটার ফলে খোলসের পরিবর্তন হয়েছে, সাবসটেনটিভ আইনের কোন পরিবর্তন হয়নি।”

মাহফুজ আনাম আরও বলেন, ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন করার পেছনে সরকারের যুক্তি ছিল যে এটা সাইবার অপরাধ কমিয়ে আনার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। কিন্তু, সেদিকে না গিয়ে এটা ব্যবহার হলো স্বাধীন সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে এবং অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধেও এটা ব্যবহার হয়েছে।
“আপনি যদি দেখেন, যেসব রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন ব্যবহার হয়েছে, তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপজিশনের নেতা,” বলেন মাহফুজ আনাম।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণ ও নিবর্তনের জন্য নানারকম আইন থাকলেও সাংবাদিকদের সুরক্ষা দেয়া অথবা সোর্স বা হুইসেল ব্লোয়ারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মত তেমন কোনো আইন নেই। এই বিষয়গুলো নিয়ে সম্পাদক পরিষদের পক্ষ থেকে সরকারকে চাপ দেয়ার কোন উদ্যোগ বা পরিকল্পনা কি তাদের আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে মাহফুজ আনাম বলেন, “সোজা ভাষায় বললে সরকারকে চাপ দেয়াতে আমাদের মূল যে অবস্থানটা ছিল ডিজিটাল সিকিউরিটি এ্যাক্ট-এর বিরুদ্ধে, সেখানে সত্যিকার অর্থে সাংবাদিক কমিউনিটির সবাই আমরা একযোগে এটার প্রতিবাদ করেছি। কিন্তু সেখানে তো কোনরকম প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছি বলে আমি মনে করি না। এবং এই যে হুইসেল ব্লোয়ার প্রটেকশন, সোর্স প্রটেকশন, অর্থাৎ আইন করে স্বাধীন সাংবাদিকতাকে আরো বেশি পেশাগতভাবে শক্তিশালী করার কোন প্রয়াসই আমি সরকারের তরফ থেকে দেখি নাই। “

গত সেপ্টেম্বর মাসে (২০২৩) বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের একটি বেসরকারি চ্যানেলকে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। ঐ সাক্ষাৎকার তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের জন্য ঘোষণা করা ভিসা নীতির আওতায় সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও অবাধ নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্থ করা যেকোনো ব্যক্তি বা entity, যে ভিসা নিষেধাজ্ঞায় পড়বেন, তার মধ্যে মিডিয়াও পড়তে পারে। এর প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের কাছে তাঁর এই মন্তব্যের ব্যাপারে উদ্বেগ জানিয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে মাহফুজ আনাম একটা চিঠি দিয়েছিলেন। এর জবাবে অ্যাম্বাসেডর হাস একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন যাতে তিনি বলেছেন যে, ভিসা নীতি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ক্ষুন্ন করার জন্য দায়ী বা জড়িত বলে প্রতীয়মান হয় এমন যেকোন বাংলাদেশির জন্য প্রযোজ্য হবে এবং গণমাধ্যমকে মতামত প্রকাশ করা থেকে বিরত রাখার পদক্ষেপ নিলে তার ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য হবে।

রাষ্ট্রদূত হাসের এই ব্যাখ্যায় সম্পাদক পরিষদ আশ্বস্ত বোধ করছেন কিনা জানতে চাইলে মাহফুজ আনাম বলেন, ” হ্যাঁ আমরা এই ব্যাখ্যাতে আশ্বস্ত বোধ করেছি। কেননা উনি স্পষ্টভাবে বলেছেন যে গণমাধ্যমে মতামত প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকার পদক্ষেপ নিলে— এটা খুবই স্পষ্ট এবং তাঁর এই ব্যাখ্যাটা আমরা গ্রহণ করেছি। “

বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়রানি প্রসঙ্গে একটি প্রশ্নের উত্তরে মাহফুজ আনাম বলেন, “আমরা পরপর দুটো রিপোর্ট করেছি যে হঠাৎ করে অপজিশনের নেতাদের বিরুদ্ধে যে সব মামলা আছে— ৫/৬ বছর, ৭ বছর, ৪/৫ বছর, ২ বছর— এই ধরনের পুরনো মামলা হঠাৎ দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে। এবং যেটা আমাদের কোর্টে আগে কখনোই দেখা যায়নি…যে কোর্টের টাইম, যেটা সন্ধ্যার দিকে কোর্ট তাদের কার্যক্রম বন্ধ করতেন, সেটা এখন বেশ রাত পর্যন্ত চলছে to dispose of the cases এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব কেসগুলো হচ্ছে অপজিশন নেতাদের কেইস। তো এই যে প্রবণতাটা, যে আপনি দ্রুত কেস করবেন এবং সেখানে তাদের সাজা হবে, এগুলো সব কিছুই আমি মনে করি করা হচ্ছে to harass the opposition।”

তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা কোন প্রকার নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীনে বাংলাদেশ একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক, শান্তিপূর্ণ এবং অবাধ নির্বাচন হওয়া সম্ভব কিনা এ প্রসঙ্গে জনাব আনাম বাংলাদেশের ১৯৯৬ সাল থেকে তিনটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতার উদাহরণ দিয়ে বলেন, “আমি মনে করে এই অভিজ্ঞতা থেকে প্রতীয়মান, যে দলীয় সরকারের আওতায় সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না এটা তো আওয়ামীলীগই বলে এসেছে অতীতে।”

প্রবাসে যে ভিন্ন মতাবলম্বী বাংলাদেশী সাংবাদিকরা আছেন বা এক্টিভিস্টরা আছেন বা সোশ্যাল মিডিয়াতে যারা পোস্ট দিচ্ছেন, সেরকম ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের উপরে হামলা হওয়া, তাদের বিরুদ্ধে মামলা, হয়রানি এবং ভীতি প্রদর্শনের যে ট্রেন্ড আমরা বাংলাদেশের লক্ষ্য করছি, সেটা প্রতিরোধে সম্পাদক পরিষদের পক্ষ থেকে কি কোন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে কিনা সে প্রশ্নের উত্তরে মাহফুজ আনাম জানান, সম্পাদক পরিষদ থেকে একটা সংগঠন হিসেবে তারা কোনো উদ্যোগ না নিলেও তিনি ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন it is a very very bad example.

তাসনিম খলিল, কনক সরওয়ার, জুলকারনাইন সায়ের খান কিংবা এক্টিভিস্ট পিনাকী ভট্টাচার্যের পরিবারের সদস্যদের নানা সময় হয়রানি করা হয়েছে বা নজরদারিতে রাখা হয়েছে, আটক করা হয়েছে এবং কারো কারো পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলাও হয়েছে— তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সম্পাদক পরিষদ কি আগামীতে কোন উদ্যোগ নেবে কিনা এ প্রসঙ্গে জনাব আনাম বলেন,
“আমাদের মূলত ম্যান্ডেট হচ্ছে “to fight for press freedom in Bangladesh”। আর বিদেশে যারা করেন তারা ঠিক আমাদের এই গঠনতন্ত্রের আওতায় আসেন না এবং এটা নিয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনা এখনো হয়নি, তবে ভবিষ্যতে হতে পারে। “

ভয়েস অফ আমেরিকা বাংলার পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকারটি নেন শতরূপা বড়ুয়া।

সূত্র: ভয়েজ অব আমেরিকা