পরাজিত বিজেপির অন্যরকম বিজয়

পরাজিত বিজেপির অন্যরকম বিজয়

পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন-২০২১

২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। বিধানসভা নির্বাচনে আসন ও ভোট প্রাপ্তির নিরিখে মূলত এটাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত দলটির সবচেয়ে ভালো ফল। এ পর্যন্ত প্রাপ্ত হিসেবে জানা গেছে, গণনাকৃত ভোটের ৪৮ দশমিক ৩ শতাংশ পেয়ে ২১৩টি আসনে জিতেছে তৃণমূল। ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে মোট ৫টি বিধানসভা ভোটের লড়াইয়ে এ পর্যন্ত ৪৪.৯১ শতাংশ ভোট পেয়ে ২০১৬ সালে ২১১টি আসনে জোড়াফুলের বিজয় ছিল সেরা ফলাফল। এই বিজয়ের মধ্যদিয়ে পুরো ভারতজুড়ে বিজেপির প্রধান বিরোধী ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠার বার্তা দিলেন মমতা।

পশ্চিমবঙ্গের ৭৫ শতাংশ বাঙালি হিন্দু ভোটারগণ এ দফায় হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির সাম্প্রদায়িক এবং অসহিষ্ণু প্রচারণায় যে উৎসাহবোধ করেনি তা ভোটের ফলাফলে মোটামুটি নিশ্চিত। নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ জুটির দুর্দান্ত ভোট কৌশল, মেগা-জনসভা আর রোড শো, সূক্ষ্ম হিসেব নিকেশ ও পরিকল্পনার পরেও গেরুয়া শিবির কাঙ্খিত বিজয়ের কাছাকাছিও পৌঁছাতে পারেনি।

এমন ফল বিপর্যয়ের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে প্রাথমিকভাবে কয়েকটি বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন বিজেপির রাজ্য নেতৃবৃন্দ এবং বিশ্লেষকগণ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিপরীতে বাংলায় বিজেপির যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় কেন্দ্রীয় নেতৃবৃেন্দর ব্যর্থতা, অতিমাত্রায় কেন্দ্র নির্ভরতা যাকে তৃণমূল ‘বহিরাগত’ তকমা দিয়ে গেছে বারবার, পশ্চিমবঙ্গে তুলনামূলক অনভিজ্ঞ বিজেপির ক্ষমতায় আরোহনের অবাস্তব লক্ষ্য নির্ধারণ, মুসলিম বিদ্বেষী প্রচারণা কৌশল, রাজ্য বিজেপি পরিচালনায় দলের পুরনো নেতা-কর্মীদের অগ্রাহ্য করে তৃণমূল থেকে আসা নেতা-কর্মীদের প্রার্থীদের প্রাধান্য, বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নে বেশকিছু ভুল সিদ্ধান্ত, ভোটের প্রচারণায় নেতাদের প্রতিহিংসামূলক বক্তব্য ইত্যাদি দলের কর্মী, সমর্থক এবং ভোটাররা ভাল চোখে নেয়নি বলেই মনে করছেন তারা।

তবে এই পরাজয়ের মাঝেও বিজেপির আছে অন্যরকম বিজয়। বিজেপির সাম্প্রপ্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতি আদতে ব্যর্থ হলেও তারা কিন্তু ধীরে ধীরে পশ্চিমবঙ্গে শক্ত খুঁটি গাড়তে সক্ষম হয়েছে। ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ৪ শতাংশ ভোট পেয়ে কোনো আসন না পাওয়া বিজেপি ২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ১০ শতাংশ ভোট পেয়ে ৩টি আসন নিশ্চিত করেছিল। এবারের নির্বাচনে এটুকু স্পষ্ট যে, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একটা বড় ভোটব্যাংক প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। পর্যন্ত প্রাপ্ত সংবাদ অনুয়ায়ী, ৩৮.০৮ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজেপি ৭৭ টি আসন নিশ্চিত করেছে। একইভাবে ২০১৪ সালের লোকসভা থেকে ২০১৯ এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ভোট ২১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৭ শতাংশ হয়েছে। সুতরাং এই পরাজয়েও বিজেপি পেয়েছে অন্যরকম জয়ের ইঙ্গিত, যা পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যত রাজনীতিকে অবশ্যই প্রভাবিত করবে।

অন্যদিকে বাম দল ও কংগ্রেসের ব্যাপক ভরাডুবিতে বিধানসভায় প্রধান বিরোধী দল হতে যাচ্ছে বিজেপি। ১৯৭৭ সাল থেকে একটানা মোট ৩৪ বছর পশ্চিমবঙ্গ শাসন করা বামফ্রন্ট জোট ২০১১ পর্যন্ত কখনো ৪০ শতাংশের কম ভোট পায়নি। ১৯৭৭ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সাতটি নির্বাচনে বামফ্রন্ট বিধানসভায় কমবেশি ২০০ আসন পেয়েছে। ১৯৮৭ সালে তো সর্বোচ্চ ২৫১টি আসন পেয়েছিল। ২০১৬ সালে বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট ২৬.১% ভোটে ৩২টি আসন, কংগ্রেস ১২.৩% ভোটে ৪৪ টি আসন, অন্যান্য দল ৫% ভোটে ৪ টি আসন নিশ্চিত করে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এ পর্যন্ত প্রাপ্ত সংবাদ অনুয়ায়ী কংগ্রেস-বামফ্রন্ট জোট ৮.৬১% ভোটে মাত্র ১ টি আসন নিশ্চিত করেছে। ২০১৪ এবং ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনেও পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের ভোটের হিস্যা ৩০ শতাংশ থেকে নেমেছে ৮ শতাংশে। জনমত বিপর্যয়ে তারা রাজ্যের রাজনীতিতে তাৎপর্যহীন হয়ে পড়েছে। ফলশ্রæতিতে তাদের প্রধান বিরোধী দলের তকমা এখন বিজেপির দখলে।

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর থেকেই পদ্মফুলের প্রভাব বিস্তারের যে লড়াই পশ্চিমবঙ্গে শুরু হয়েছিল, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিরোধী দল হিসেবে বিজেপির স্থান লাভের মধ্যদিয়ে সে যাত্রা আপাতত শেষ হলো। তবে এবার ভোটের ফলাফলে নির্ধারক ভূমিকায় ছিল বিজেপির অভূতপূর্ব রাজনৈতিক কর্মকান্ড। দুইশ’র বেশি আসনের ‘স্বপ্ন’ আর বাংলা বিজেপির নাগালের বাইরে থাকলেও তাদের মাধ্যমে আসা আদি-ধর্মবাদের নয়া-সুনামি বাংলার সামাজিক প্রেক্ষাপটে ধীরে ধীরে তীব্র মেরুকরণ ঘটিয়েছে। হিন্দুপ্রধান একটা সমাজে হিন্দুত্ববাদকে রাজনীতির প্রধান পণ্যে পরিণত করা বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের বাংলার সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে নিজেদের একাত্ম করার সর্বাত্মক চেষ্টা সাম্প্রতিক সময়ে ভিষণভাবে পরিলক্ষিতও হয়েছে। ফলে ক্রমবর্ধমান হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ভোটব্যাংক ও প্রধান বিরোধি দলের সম্মান বিজেপির অন্যরকম বিজয় হিসেবে দেখা দিয়েছে। এমন প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতা এবং সমসাময়িক অর্জন হয়ত তাদের ‘বহিরাগত’ বদনাম ঘুঁচিয়ে একদিন বাংলার মসনদে বসাবে।

লেখক: কলামিস্ট, সাহিত্যিক ও গবেষক



বার্তা সূত্র

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email