নয়া দামান গানে ভাইরাল ভাবনা-সুমাইতার গল্প

নয়া দামান গানে ভাইরাল ভাবনা-সুমাইতার গল্প

‘আইলারে নয়া দামান আসমানেরও তেরা, বিছানা বিছাইয়া দেও শাইল ধানের নেড়া, দামান বও দামান বও’ সিলেট অঞ্চলের এই গানটি সম্প্রতি ভাইরাল হয়েছে। ভাইরাল হওয়ার কারণ হচ্ছে বহু বছর পর গানটির রিমেক ভার্সন তৈরি করেছেন প্রবাসী সংগীতশিল্পী মুজাহিদ আব্দুল্লাহ। যিনি মুজা নামে পরিচিত। তার সঙ্গে গেয়েছেন সিলেটের শিল্পী তোসিবা। গানটির গীতিকার নিয়ে বিতর্ক থাকলেও নানাজনে নানাভাবে রিমেক হওয়া গানটির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স উপহার দিচ্ছেন। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, লাইকিসহ সব সোশ্যাল মিডিয়ায় গানটি এখন বাংলাদেশের ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে।

এই গানের সঙ্গে নেচে ভাইরাল হয়েছেন রুখসার আহমেদ ভাবনা ও সুমাইতা মারজিয়া নামের দুজন ভিডিও ব্লগার। বাসার ছাদে শাড়ি পরে গানটির সঙ্গে পারফরম্যান্স করেছেন তারা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ‘আরে ভাবনা’ নামের ফেইসবুক পেইজ ও ইউটিউব চ্যানেলে গানের পারফরম্যান্সটি প্রকাশিত হয়। ইতিমধ্যেই কয়েক মিলিয়ন ভিউ হয়েছে তাদের ভিডিওটির।

ভাইরাল হওয়ার অনুভূতি জানতে চাইলে দেশ রূপান্তরকে রুখসার আহমেদ ভাবনা বলেন, ‘আমি নরমালি আমার পেইজ ও চ্যানেলে নানা ধরনের ভিডিও তৈরি করে আপ দিই। এই গানটি যখন করি তখন বুঝতে পারছিলাম এটার জন্য ভালো সাড়া পাবো। কিন্তু এটা যে এভাবে ভাইরাল হয়ে যাবে তা ভাবিনি। এ জন্য আমি খুবই খুশি। একটা কাভার করা গান ভাইরাল হওয়া কিন্তু সহজ ব্যাপার না। আমি খুব খুশি যে নাচটাকে ভালোবেসে ভিডিওটাকে ভাইরাল করেছে।’

ঠিক কী কারণে গানটি কভার করেছেন সে বিষয়ে জানতে চাইলে ভাবনা বলেন, ‘আমি আমার ইনস্টাগ্রামে পোস্ট দিয়েছিলাম যে এরপরে কোন গান কাভার করা যেতে পারে। সবাই আমাকে সাজেস্ট করছিল ‘নয়া দামান’ গানটা কাভার করার জন্য। তো সেভাবেই আমরা গানটা করি। আর আমরা এমন বাংলা গান সচরাচর পাই না। এ জন্য বেশির ভাগ সময় হিন্দি গানের কাভার করতে হয়।’

ভাইরাল হওয়ার ব্যাপারে সুমাইতা বলেন, ‘আমরা নরমালি কোনো ভিডিও করার আগে ভাবি যে ভিডিওটা যেন ভালো হয়, মানুষ পছন্দ করে। কিন্তু গানের এই ভিডিওটায় এতো সাড়া পাবো তা ভাবিনি। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন চ্যানেলে, পত্রিকার নিউজেও আমাদের ভিডিওটা এসেছে। আমরা তো অনেক ভিডিওই করি কিন্তু এভাবে এতো মানুষের টাইমলাইনে কখনো এর আগে এমনভাবে আসেনি। এটাতে খুব বেশি ভোলো লেগেছে।’

গানটিতে পারফর্ম করার জন্য বাসার ছাদ কেন বেছে নিলেন? এমন প্রশ্নের জবাবে সুমাইতা বলেন, ‘এটা আউটডোর, ইনডোরে বা অনেক জায়গাতেই করতে পারতাম। কিন্তু আমরা যারা কনটেন্ট বানাই তাদের সুযোগ-সুবিধা অনেক সীমিত। ফলে ছাদটাই পারফেক্ট ছিল। আর তখন লকডাউন চলছিল। ফলে অন্য কোনো উপায়ও ছিল না।’

গানের পার্টনার সুমাইতার প্রসঙ্গে ভাবনা বলেন, ‘আমি আগে একা একাই ভিডিও করতাম। পরে ভাবলাম যে একটা টিম করা যায় কিনা। সে চিন্তা থেকেই একটা পোস্ট দিই ফেসবুকে, যে আমি ড্যান্সার খুঁজছি। সেই পোস্টে অনেকেই কমেন্ট করেছে যে আপু আপনার সঙ্গে নাচব। তো সেখানেই সুমাইতাও কমেন্ট করে। ওর সঙ্গে কথা বলার পর দেখলাম, ওর সঙ্গে আমার মানাবে ভালো। পরে ওকে আমার টিমে অন্তর্ভুক্ত করি। আমার টিমে ভিডিওগ্রাফার, এডিটরসহ প্রায় ৮ জনের একটা টিম আছে। সবাই ফ্রিল্যান্সার। সবাই শখের বশেই কাজটা করছি। সুমাইতার সঙ্গে এটা আমার দ্বিতীয় গান। প্রথম গানটি অতটা জনপ্রিয়তা না পেলেও এই কাজটা সবাই পছন্দ করেছে।’

রুখসার আহমেদ ভাবনা

জুটি গড়ার ব্যাপারে সুমাইতা জানালেন, ‘ভাবনা আপু অনেক ভিডিও বানান, আমিও ছোটবেলা থেকেই নাচ করি। তো লকডাউনে আপু যখন ড্যান্সার খুঁজছিলেন তখন আপুকে নক করি। অনেকগুলো নাচ দেখাই, তারপর আপু পছন্দ করেন।’

ভাবনা আছেন ফেইসবুক, ইউটিউবে এবং ইনস্টাগ্রামে। গত বছর লকডাউনের সময় নিজের চ্যানেল তৈরি করেন ভাবনা। তিনি বলেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকেই নাচি। এ রকম একটা চ্যানেল করার ইচ্ছে অনেক আগে থেকে থাকলেও লকডাউনের সময় এটি বাস্তবায়ন করতে পারি। এরপর ‘আরে ভাবনা’ পেইজ ও ইউটিউব চ্যানেল থেকে নানা ধরনের কনটেন্ট আপলোড করতে থাকি। আগের ভিডিওগুলো মানুষ পছন্দ করলেও ‘নয়া দামান’ দিয়ে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি।’

সুমাইতা মারজিয়া

ভাবনার পেইজ থাকলেও সুমাইতার নিজস্ব কোনো প্ল্যাটফর্ম নেই। তিনি বলেন, ‘আমি আলাদাভাবে কিছু করিনি। আমার আলাদা কিছু করার ইচ্ছেও নেই। আমার ভালোলাগা থেকেই ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটকে ভিডিও আপলোড দিই।’

ভাবনা জানালেন মূলত শখের বশেই চ্যানেলটা তৈরি করেন তিনি। অর্থ উপার্জন নয় বরং নিজেদের ভালোলাগা থেকেই কাজ করেন তারা। অন্য সদস্যরাও একইভাবে যুক্ত হয়েছেন। নিজেদের অবসর সময়ে ভিডিও ব্লগ তৈরি করেন। ভাবনা মনে করেন, বাংলাদেশে ড্যান্সারদের তেমন কোনো প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়নি। তার ইচ্ছে নাচের একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা।

একই চিন্তা সুমাইতারও। তিনি বলেন, ‘এটা থেকে টাকা ইনকাম করতে হবে এমন কোনো চিন্তা কখনোই ছিল না। ভবিষ্যতেও এমন চিন্তা করি না। মানুষের ভালোবাসাই আমার মূল টার্গেট।’

নাচের বিষয়টি পরিবার কীভাবে দেখে? এমন প্রশ্নের জবাবে ভাবনা বলেন, ‘পরিবার থেকে কোনো বাধা-বিপত্তির মুখোমুখি হইনি। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা বিরূপ মন্তব্যের শিকার হতে হয়। তো এসব মন্তব্য দেখে অনেক সময় পরিবারের সদস্যরা কিছুটা মন খারাপ করেন। তারা বলার চেষ্টা করেন এসব মন্তব্য কেন আসে। কিন্তু জোরালো কোনো বাধার মুখোমুখি হতে হয়নি। বরং সাপোর্টই পেয়েছি। তবে পারিবারিক সাপোর্ট পেলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা বাইরের নেতিবাচক মন্তব্যের কারণে মাঝে মাঝে কিছুটা বাধাগ্রস্ত হতে হয়।’

সুমাইতা বলেন, ‘আমার পরিবারের সবাই সাপোর্টিভ। কোনো বাধা নেই। আমার পরিবার বা আত্মীয়স্বজনরাও আমার এসব ওয়ার্ক দেখে খুশি। কোনো কাজ ভালো হলে তারা অনুপ্রাণিত করেন। ’

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতিক্রিয়া নিয়ে সুমাইতা বলেন, পজিটিভ মন্তব্যের পাশাপাশি অনেক নেতিবাচক মন্তব্যও আসে। এটাকে আমরা স্বাভাবিকই মনে করি। কারণ কে কী মন্তব্য করবে সেটা আমাদের হাতে এটা নেই। আমি মনে করি ২০ ভাগ মানুষও যদি পছন্দ করে সেটাতেই আমরা খুশি।

শোবিজে ক্যারিয়ার গড়ার পরিকল্পনা না থাকলেও ভাবনার সুপ্ত বাসনা আছে নুসরাত ইমরোজ তিশার সঙ্গে অভিনয় করার। তিনি বলেন, ‘নুসরাত ইমরোজ তিশাকে আমার খুব ভালোলাগে, ওনার সঙ্গে একটা পাসিং শটে অংশ নিতে পারলেও নিজেকে ধন্য মনে করব।’

সুমাইতাও জানালেন শোবিজে ক্যারিয়ার গড়ার কোনো পরিকল্পনা তার নেই। তবে কখনো যদি ভালো কনটেন্টে কাজ করার কোনো সুযোগ পান তাহলে অভিনয়ে যুক্ত হতে পারেন তিনি।

এদিকে বাংলা গানের চেয়ে বিদেশি গান বেশি কাভার করার প্রসঙ্গে ভাবনা বলেন, ‘আমরা বেশির ভাগ বলিউড সং কাভার করি। তবে ঢালিউডের পুরোনো গানগুলো নিয়েও কাজ করতে চাই। অনেক হিট গান রয়েছে। সেগুলো কাভার করতে চাই। অনেকে বাংলা সিনেমার গান নিয়ে নাক সিটকান, কিন্তু নাক না সিটকিয়ে আমাদের সিনেমার অনেক জনপ্রিয় গানই রয়েছে যেগুলো নিয়ে কাজ করা যেতে পারে।’

ছোটবেলা থেকেই নাচ শিখেছেন তারা দুজন। বগুড়া ও ঢাকার বেশকিছু নৃত্য একাডেমিতে নাচ শিখেছেন ভাবনা আর সুমাইতা জানালেন, ছোটবেলায় মহল্লার নৃত্য একাডেমিতেই তার নাচে হাতেখড়ি। বেশ কিছু রিয়্যালিটি শো’র অডিশনে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে সুমাইতার।

উল্লেখ্য বগুড়ার মেয়ে রুখসার আহমেদ ভাবনা বাবার চাকরি সূত্রে নানা জায়গায় বসবাস করেছেন। সর্বশেষ থিতু হয়েছেন ঢাকায়। স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী ভাবনা যুক্ত রয়েছেন শিক্ষকতা পেশার সঙ্গেও। অপরদিকে ঢাকাতেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা সুমাইতা মাস্টার্স করছেন বিইউপিতে। দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে সুমাইতার।



বার্তা সূত্র

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email