Skip to content

নির্বাণ লাভের আশায় গেরুয়া তৈরি করেন তারা

রাঙামাটি: বৌদ্ধ বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের প্রবারণা পূর্ণিমার পর সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান হচ্ছে কঠিন চীবর দান। প্রবারণা পূর্ণিমা পালনের একমাসের মধ্যে সুবিধাজনক সময়ে এ কঠিন চীবন দানোৎসব করেন বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা।

তারা প্রতি বছর ইহকাল ও পরকালে নির্বাণ তথা মুক্তি লাভের আশায় বৌদ্ধ ভিক্ষুকদের মাঝে চীবরসহ অন্যান্য সামগ্রী বিতরণ করেন।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৌদ্ধ মন্দির রাঙামাটির রাজবন বিহারে ধর্মীয় রীতি-নীতি মেনে পালিত হচ্ছে কঠিন চীবর দানোৎসব। কঠিন চীবর দান শব্দটি গৌতম বুদ্ধের সময় থেকে প্রচলিত হয়ে আসছে। তৎকালীন সময়ে গৌতম বুদ্ধের শীর্ষ বিশাখা গৌতম বুদ্ধের প্রতি সন্মান প্রদর্শন পূর্বক ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বস্ত্র বানিয়ে গৌতম বুদ্ধকে দান করেন। এরপর থেকে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা এ দিনটিকে চির স্মরণীয় করে রাখতে তাদের স্ব-স্ব মন্দিরগুলোলোতে কঠিন পরিশ্রম করে বস্ত্র তৈরি করেন এবং ধর্মীয় রীতি-নীতি মেনে আনুষ্ঠানিকভাবে বৌদ্ধ ভিক্ষুকদের মাঝে বস্ত্র প্রদান করেন।

তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তুলা কেটে, সুতা বানিয়ে, রং করে, নানা রকম আচার মেনে এ চীবর তৈরি করেন। রাজবন বিহারে এবারের উৎসবে শতাধিক বৌদ্ধ ধর্মীয় নারীরা চীবর তৈরিতে অংশ নিয়েছেন। তাদের নির্ঘুম পরিশ্রমের ফলে তৈরি হয় ভিক্ষুকদের পরিহিত গেরুয়া কাপড় বা পরিধেয় বস্ত্র।

তৈরিকৃত এসব বস্ত্রের মধ্যে রয়েছে- দোয়াজিক, অর্ন্তবাস, চীবর ও কটিবন্ধনী। শুক্রবার (০৪ নভেম্বর) বিকেলে তৈরিকৃত এসব বস্ত্র বৌদ্ধ ভিক্ষুদের হাতে তুলে দেওয়া হবে। অনেক কষ্টে এসব বস্ত্র তৈরি করা হয় বলে একে কঠিন চীবর বলা হয়। ইহকাল এবং পরকালে মুক্তির আশায় এসব বস্ত্র বৌদ্ধ ভিক্ষুকদের দেওয়া করা হয়।

অ্যাডভোকেট সুষ্মিতা চাকমা বাংলানিউজকে বলেন, পুণ্য লাভের আশায় আমি এখানে এসেছি। আমাদের গৌতম বৌদ্ধ শিখিয়েছেন-মানুষ-মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ ভুলে, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রেখে আমাদের এ ভূবনে বেঁচে থাকতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বৌদ্ধ ভিক্ষুকদের মধ্যে বস্ত্র বিতরণ শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠিকতা নয়। এটি পার্বত্যাঞ্চলের কোমর তাঁতের চিত্র তুলে ধরে সারাবিশ্বের কাছে।

চীবর তৈরিতে অংশ নেওয়া সাধনা চাকমা বাংলানিউজকে বলেন, ভিক্ষুদের জন্য রাত জেগে গেরুয়া তৈরি করছি ইহকাল এবং পরকালের পুণ্য লাভের আশায়।

নির্মলা চাকমা বাংলানিউজকে বলেন, প্রতি বছর এই দিনে আমার পুণ্য লাভের আশায় রাজবন বিহারে এসে ভিক্ষুকদের জন্য কাপর বুনি। মনে আলাদা শান্তি  লাগে।

ভারতের মহারাষ্ট্র প্রদেশ থেকে আসা বৌদ্ধধর্মাবলম্বী প্রেম জানমাণ্ডু বলেন, আমরা ভারত থেকে এসেছি গৌতম বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে। এখানে এসে খুব ভালো লাগছে।

তার সফর সঙ্গী আরেক বিদেশী বৌদ্ধধর্মাবলম্বী সঞ্জু পাঠারে বলেন, ধর্ম আত্মাকে শান্তি দান করে। মনকে প্রশান্তি দান করে। শান্তি পেতেই এখানে এসেছি।

রাঙামাটি রাজবন বিহার শাখার উপাসক-উপসিকা পরিষদের সহ-দপ্তর সম্পাদক বিজয়গিরী চাকমা বলেন, পুণ্য লাভের আশায় আমরা সকল বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা দানোত্তম কঠিন চীবর দানোৎসব করে থাকি। এবার রাজবন বিহারে কঠিন চীবর দানোৎসবের মধ্যে দিয়ে পাহাড়ে মাসব্যাপী অনুষ্ঠিত হওয়া এ উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে।

তিনি আরও বলেন, গেরুয়া দানের মধ্যে দিয়ে মানব জাতির কল্যাণ কামনায় এবারের উৎসবের পরিসমাপ্তি ঘটবে।

দানোত্তম কঠিন চীবর শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি পার্বত্যঞ্চলের জনপদের মানুষের মিলন মেলায় একটি মহা উৎসবে পরিণত হয়। দুইদিনব্যাপী অনুষ্ঠিত চীবর দানে বিদেশী বৌদ্ধ ধর্মীয় নাগরিকরাও অংশ নিয়ে থাকেন। এ অনুষ্ঠানটিকে ঘিরে পুরো শহর জুড়ে অত্যন্ত উৎসব আমেজের সৃষ্টি হয়।

উল্লেখ্য, নির্বাণ হলো বৌদ্ধ ধর্ম মতানুসারে সাধনার চরম পরিণতি বা পরম প্রাপ্তি। দীর্ঘ সময় সাধণার পরেই কেবল এমন স্তরে পৌঁছানো যায়। বৌদ্ধমতানুসারে নির্বাণ হলো মোক্ষলাভের শর্ত।

বাংলাদেশ সময়: ১৪৪১ ঘণ্টা, নভেম্বর ০৪, ২০২২
এফআর



বার্তা সূত্র