নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া কোনো নির্বাচন নয়

নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া কোনো নির্বাচন নয়

নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনে না যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা। একই সঙ্গে সরকার পতনের এক দফার আন্দোলনে যেতে এবং নির্বাচনের আগে সরকারের সঙ্গে ‘পর্দার আড়ালে’ কোনো সমঝোতায় না যাওয়ার পক্ষে নিজেদের অবস্থানের কথা জানিয়েছেন তারা। আন্দোলনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দ্রুত দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করা এবং ভোটাধিকার আদায়ের জাতীয় ইস্যুতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও শ্রেণি-পেশার সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ করারও পরামর্শ দেন তারা।
গতকাল মঙ্গলবার দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির ধারাবাহিক বৈঠকের প্রথম দিনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টারা এ মত দেন বলে বৈঠক সূত্র জানায়। তারা জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে দূরত্ব তৈরির পক্ষেও মত দিয়েছেন। পাশাপাশি গত নির্বাচনে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের সমালোচনা ও বিএনপির নেতৃত্ব নিয়ে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বক্তব্যেরও নিন্দা জানিয়েছেন।
নেতারা বলেছেন, আগের মতো এবারও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার বিএনপিকে নির্বাচনে নেওয়ার নানা ফন্দি আঁটবে, কৌশল করবে। কিন্তু দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। দলকে এক দফার আন্দোলনে নিয়ে যেতে হবে। এর পাশাপাশি দল পুনর্গঠন, চেয়ারপারসনের মুক্তি, জোটের রাজনীতি, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা-হামলাসহ সাম্প্র্রতিক নানা ইস্যুও উঠে আসে বৈঠকে।
রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ভাইস চেয়ারম্যান ও উপদেষ্টামণ্ডলীর সঙ্গে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এ বৈঠক করেন। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক কর্মকৌশল ঠিক করার জন্য মতামত জানতে রুদ্ধদ্বার এ বৈঠকে বসেন তারেক রহমান। বিকেল ৪রটা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত বৈঠক চলে। বৈঠকে দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্যদের মধ্যে ৬২ জন উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ২৮ জন বক্তব্য দেন। তারেক রহমান সিনিয়র নেতাদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং তাদেরকে আশ্বস্ত করেন।
ধারাবাহিক এ বৈঠকের দ্বিতীয় দিনে আজ বুধবার জাতীয় নির্বাহী কমিটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদক, সম্পাদক ও সহসম্পাদক এবং শেষ দিন আগামী কাল বৃহস্পতিবার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা অংশ নেবেন। এসব বৈঠকের পর দলের নির্বাহী কমিটির বৈঠক আহ্বান করা হবে। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের সঙ্গেও বৈঠকের সিদ্ধান্ত রয়েছে। সবার মতামতের পরই চূড়ান্ত করা হবে আন্দোলনের কৌশল।
সূত্র জানায়, বৈঠকে আফগানিস্তানে পট পরিবর্তনের কারণে বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনে নামলে তা ধর্মীয় উগ্রপন্থিদের আন্দোলন হিসেবে সরকার প্রচার চালাবে বলে মত দেন কয়েকজন নেতা। বিশেষ করে তালেবানের উত্থানে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর নজর এখন ধর্মীয় দলগুলোর দিকে। এ পরিস্থিতিতে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি হয়ে পড়েছে বলে তারা মত দেন। এ বিষয়ে দলের হাইকমান্ডকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন কয়েকজন নেতা। বৈঠকে ভোটাধিকারের দাবি আদায়ে মাঠে থাকা ডান-বাম দলগুলোকে নিয়ে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গঠনের জন্য সিনিয়র নেতাদের বিভিন্ন দলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দায়িত্ব দেওয়ারও পরামর্শ দেন নেতারা।
বৈঠক শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দলের করণীয় সম্পর্কে জ্যেষ্ঠ নেতাদের মতামত নিয়েছেন তারেক রহমান। সভায় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দলের সাংগঠনিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
মহাসচিব জানান, দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে দলের করণীয় সম্পর্কে নেতাদের মতামত নিতে এই বৈঠক ডাকা হয়েছে। বুধ ও বৃহস্পতিবার বৈঠকের পর তিন দিনের বৈঠক সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হবে গণমাধ্যমকে।
সূত্র জানায়, বৈঠকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ডান-বাম সব বিরোধী দলের সঙ্গে কথা বলা উচিত। দেশের মানুষ নির্বাচন-পাগল; কিন্তু আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচনে যাওয়া যাবে না। তিনি বলেন, জোটের দরকার নেই। আমরা রাজপথে দাঁড়াতে পারলে সবাই আমাদের সঙ্গে আসবে। যুগপৎ আন্দোলন করাই ভালো। শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার আগে রাজপথে জিততে হবে। আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই।
সূত্র জানায়, বৈঠকে শওকত মাহমুদ বলেন, আমাদের জন্য আন্দোলনই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা। এক দফা, এক দাবিতে রাজপথে নামতে হবে- শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাব না। যে নির্বাচনে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান অংশগ্রহণ করবেন না, সে নির্বাচনে কেন যাব? আগে আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতন, তারপর নির্বাচন।
আরেকজন ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী বৈঠকে সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। এটা অবশ্যই সন্দেহজনক। এটা আগাম নির্বাচনের আভাসও হতে পারে। তাই এ দিকটি বিবেচনা করে বিএনপির কর্মপদ্ধতি ঠিক করতে হবে। চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান বলেন, আওয়ামী লীগ তাদের অধীনে আগের নির্বাচনে যে আসন দিয়েছে, এবার তাও দেবে না। তাই তাদের অধীনে নির্বাচনে যাওয়া ঠিক হবে না।
সূত্র জানায়, নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার এবং নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন এবং দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আন্দোলন জোরদার করার পক্ষে অধিকাংশ নেতা মতামত ব্যক্ত করেন। কেউ কেউ দলের অঙ্গ সংগঠনগুলো বিশেষ করে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলে আন্দোলনমুখী নেতৃত্ব নিয়ে আসার কথা বলেন বলে জানা গেছে।
বৈঠকে জামায়াত বিষয়ে একজন ভাইস চেয়ারম্যান ও দু’জন উপদেষ্টা বক্তব্য দেন। তারা বলেন, জামায়াত বিষয়ে বিএনপির দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। কারণ, এ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রায়ই সংবাদ প্রকাশিত হয়। এ কারণে দল হিসেবে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিএনপি চেয়ারপারসনের এক উপদেষ্টা বলেন, সবকিছু ঠিক করে আন্দোলনে নামা যায় না। আন্দোলন শুরু হলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। দল পুনর্গঠন শেষ করে আন্দোলনে নামতে হবে- এটার কোনো মানে নেই। আন্দোলনের পাশাপাশি পুনর্গঠনও চলবে। আন্দোলনের ক্ষেত্র প্রস্তুত হলে জনগণও আমাদের সঙ্গে রাজপথে আসবে বলে বিশ্বাস করি। তাই আন্দোলনের সূত্রপাতটা বিএনপিকেই করতে হবে। সরকারের কর্মকাণ্ডে অনেকেই ক্ষুব্ধ। আমরা নামলে অন্যরা যার যার অবস্থান থেকে রাজপথে নামবে। সবার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনেই এ সরকারকে বিদায় করা সম্ভব।
আরেকজন নেতা বলেন, আগামী নির্বাচন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হতে হবে- এটাই তাদের মূল লক্ষ্য। দেশের বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এমনকি সাধারণ ভোটারদের প্রত্যাশাও তাই। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না- এটাই সবাই বিশ্বাস করে। জনগণ ভোটের মাধ্যমে পছন্দের প্রার্থীকে জনপ্রতিনিধি করতে উন্মুখ হয়ে আছে। গণতান্ত্রিক দল হিসেবে জনগণের সে প্রত্যাশা পূরণ করা বিএনপির দায়িত্ব।
প্রথম দিনের বৈঠকে ভাইস চেয়ারম্যানদের মধ্যে ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর বীরউত্তম, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম, এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, বরকত উল্লাহ বুলু, মীর নাসির উদ্দিন, মে. জে. (অব.) মাহমুদুল হাসান, আবদুল আউয়াল মিন্টু, শামসুজ্জামান দুদু, জয়নাল আবেদীন, অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী, শওকত মাহমুদ অংশ নেন।
উপদেষ্টাদের মধ্যে ছিলেন মনিরুল হক চৌধুরী, মশিউর রহমান, আমান উল্লাহ আমান, মিজানুর রহমান মিনু, হাবিবুর রহমান হাবিব, লুতফর রহমান খান আজাদ, আবদুস সালাম, আবুল খায়ের ভুঁঁইয়া, ফজলুর রহমান, শাহজাহান মিয়া, অধ্যাপক সুকোমল বড়ুয়া, খন্দকার মুক্তাদির আহমেদ, এসএম ফজলুল হক, আবদুল হাই, ভিপি জয়নাল আবেদীন, গোলাম আকবর খন্দকার, অধ্যাপক শাহেদা রফিক, আফরোজা খানম রীতা, তাহসিনা রুশদীর লুনা, অধ্যাপক তাজমেরী এস ইসলাম, ইসমাইল জবিউল্লাহ, এসএম একরামুজ্জামান, তৈমূর আলম খন্দকার, মইনুল ইসলাম শান্ত, মাহবুবুর রহমান, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু, আবদুল হাই শিকদার, আতাউর রহমান ঢালী, বোরহান উদ্দিন, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম, অধ্যাপক আবদুল কুদ্দুস, নাজমুল হক নান্নু প্রমুখ।
বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুও উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তরের সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, তাইফুল ইসলাম টিপু, মুনির হোসেন, বেলাল আহমেদ ও চেয়ারপারসন কার্যালয়ের এবিএম আবদুস সাত্তার ও রিয়াজ উদ্দিন নসু।
২০১৬ সালের মার্চে ষষ্ঠ কাউন্সিলের পর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত হয় ৫০২ সদস্যের নির্বাহী কমিটি। এতে ৩৫ জন ভাইস চেয়ারম্যান রয়েছেন। চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ৮২ জন। এর আগে সর্বশেষ জাতীয় নির্বাহী কমিটির বৈঠক হয়েছিল ২০১৮ সালে ফেব্রুয়ারিতে; বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারারুদ্ধ হওয়ার আগে।



বার্তা সূত্র

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

সর্বাধিক পঠিত

সর্বশেষ সংবাদ