Skip to content

নতুন পাঠ্যবইয়ে ধর্ম অবমাননার অপপ্রচার

SR__9254-01.jpeg

বেনার নিউজ

বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যে নতুন বই তুলে দেওয়ার পর থেকে বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে ভুল নিয়ে নানা মহলে শুরু হয় সমালোচনা। এরইমধ্যে পাঠ্যপুস্তকে নেই- এমন ধর্মীয় উসকানিমূলক ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

এই প্রেক্ষাপটে সঠিক তথ্য তুলে ধরতে শিক্ষামন্ত্রী দীপুমনি সাংবাদিকদের প্রতি বারবার আহবান জানিয়েছেন।

পাঠ্যপুস্তকে নেই এমন বিষয়ে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মকে জড়িয়ে চালানো ‘নেতিবাচক প্রচারণা’ ঠেকাতে পাঠ্যপুস্তকে যা রয়েছে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরার কৌশল নেয়া হচ্ছে বলে শুক্রবার বেনারকে জানান শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী।

“দুঃখের বিষয় হলো, নেতিবাচক প্রচারণাটি বেশি আলোচিত হচ্ছে। তবে, আমরা আরও বেশি সুসহংতভাবে প্রচারণা চালাব, যাতে সাধারণ মানুষ এই গোষ্ঠীর অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হয়,” বলেন তিনি।

সম্প্রতি ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে চৌর্যবৃত্তি, ইতিহাস বিকৃতি ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের অনুপ্রবেশ ঘটানোর অভিযোগে ছাত্র অধিকার পরিষদ নামে একটি সংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। তাদের ভাষ্য, পাঠ্যপুস্তকে বিজ্ঞানের নামে অপবিজ্ঞান ও সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতি এবং ধর্মীয় বিদ্বেষ ঢোকানো হয়েছে।

ধর্মভিত্তিক অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত একটি মাদ্রাসার বার্ষিক মাহফিলে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, “আলেম-ওলামাদের গ্রেপ্তার ও পাঠ্যপুস্তকে অনৈসলামিক বিষয়ের প্রবেশ ইসলামের বিরুদ্ধে বড় ষড়যন্ত্রের অংশ।”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—বিশেষত ফেসবুকে এরকম নেতিবাচক প্রচারণার বিভিন্ন পোস্টের নিচে মন্তব্য করেছেন হাজার হাজার মানুষ।

ভুল তথ্যে অপপ্রচার

পাঠ্যপুস্তকে ইসলাম ধর্মকে অবমাননা এবং হিন্দু ধর্মকে উপরে দেখানো হয়েছে—এমন অপ্রচারও চলছে।

ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যাডমিশন টেস্ট নামে একটি ফেসবুক গ্রুপে দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠ্যপুস্তক সম্পর্কে লেখা হয়েছে, “প্রিয় নবীর সংক্ষিপ্ত জীবনী বাদ দেয়া হয়েছে।”

তথ্যের সত্যতা যাচাই করে দেখা যায়, দ্বিতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ে “সবাই মিলে কাজ করি” শিরোনামে মহানবীর সংক্ষিপ্ত জীবনীটি ৭১ পৃষ্ঠায় রয়েছে।

গ্রুপটিতে আরও বলা হয়, পঞ্চম শ্রেণির বই থেকে “নবীজীর বিদায় হজের ভাষণের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা বাদ দিয়েছে। পাশাপাশি সংযুক্ত করেছে বই নামের একটি কবিতা যা কোরআন বিরোধী।”

পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ে দেখা যায়, “বিদায় হজ” গল্পটি ৯৫ পৃষ্ঠায় রয়েছে। বই নামে কোনো কবিতা সেখানে সংযুক্ত করা হয়নি।

ওই গ্রুপে আরও বলা হয়েছে, সপ্তম শ্রেণির বইয়ে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখিত লালো নামে একটি গল্প সংযুক্ত করা হয়েছে যাতে মুসলিমদের কালী পূজা করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে।

যদিও সপ্তম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লালো নামে কোনো গল্প দেখা যায়নি।

গণমাধ্যমে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মহিউদ্দিন রাব্বানীর পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী বলেছেন, “আমরা নাকি একসময় বানর ছিলাম, সেখান থেকে মানুষ হয়েছি—এমন অযৌক্তিক, মিথ্যা কথাবার্তা সরকারি বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে, এমনকি সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার পাঠ্যপুস্তকে ঢুকিয়ে আমাদের মুসলিম বাচ্চাদের শেখানো হচ্ছে।”

যদিও বেনারনিউজের পক্ষ থেকে পাঠ্যপুস্তকগুলো বিশ্লেষণ করে “বানর থেকে মানুষ” হওয়ার মতো কোনো তথ্যের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

দেশের সাধারণ পাঠ্যক্রম ও আলিয়া মাদ্রাসার নতুন পুস্তক থেকে ইসলামি আদর্শকে বাদ দেয়ার অভিযোগে শুক্রবার বাদ জুমা ঢাকার বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ চত্বরে সমাবেশের পর ইসলামী রাজনৈতিক দল খেলাফত মজলিস বিক্ষোভ মিছিল। ২৭ জানুয়ারি ২০২৩। [বেনারনিউজ]

পেছনে ‘রাজনৈতিক অর্থনীতি’

এই অপপ্রচারের পেছনে একটি “রাজনৈতিক অর্থনীতি রয়েছে,” বলে মন্তব্য করেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী।

তিনি বলেন, “আমরা মুখস্থ বিদ্যাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তে অ্যাক্টিভিটি বেজড (কর্মমুখী) একটি শিক্ষা ব্যবস্থা চালুর চেষ্টা করছি। এই ব্যবস্থা চালু হলে অনেকেরই স্বার্থ বিঘ্নিত হবে। সে কারণেই একটি মহল পুরো পাঠ্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছে।”

“পাঠ্যপুস্তকের কোনো স্থানেই ইসলামকে অবমাননা অথবা খাটো করা হয়নি। অথবা অন্য কোনো ধর্মকে প্রাধান্য দেওয়া হয়নি। দেশের প্রতিষ্ঠিত আলেম-ওলামাদের সঙ্গে বিষয়গুলো আলোচনা করা হয়েছে,” বলেন উপমন্ত্রী।

পাঠ্যবই নিয়ে চলা নেতিবাচক প্রচারণাকে “ফালতু বিষয়,” হিসেবে উল্লেখ করে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধুরী বেনারকে বলেন, পাঠ্যপুস্তকের ক্ষেত্রে “সরকার ঠিক পথেই আছে।”

তিনি বলেন, “দুনিয়া বদলে গেছে, আমাদেরও বদলে যেতে হবে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা গোলাকার চেয়ারে বসবে। আইসিটিভিত্তিক শ্রেণিকক্ষ হবে। সরকারের এই পদক্ষেপ বাস্তবায়ন হলে অনেকের অর্থনৈতিক স্বার্থ বিঘ্নিত হবে। সে কারণে তারা সবাই এর বিরুদ্ধে উঠে-পড়ে লেগেছে।”

“এই অপপ্রচারের মধ্যে ধর্মীয় উগ্রবাদীরা তো রয়েছেই, পাশাপাশি রয়েছে কোচিং সেন্টার ব্যবসায়ী ও গাইড বই বিক্রেতারা,” বলেন রাশেদা কে. চৌধুরী।

তাঁর মতে, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইসলাম ধর্মকে জড়িয়ে পাঠ্যপুস্তক নিয়ে যে অপপ্রচার চলছে সেটি কেবলমাত্র ধর্মীয় কারণে করা হচ্ছে না, এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক অর্থনীতি। ব্যবহার করা হচ্ছে ধর্মকে।”

এ বছর তিন শ্রেণিতে নতুন কারিকুলাম শুরু হওয়ায় দুই ধরনের পাঠ্যবই পেয়েছে শিক্ষার্থীরা। প্রথম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা পেয়েছে নতুন কারিকুলাম অনুযায়ী ছাপা বই। বাকি শিক্ষার্থীরা পেয়েছে পুরোনো কারিকুলামের বই।

পুরনো কারিকুলামের নবম ও দশম শ্রেণির তিনটি বইয়ে কিছু ভুল ইতোমধ্যে সংশোধন করেছে জাতীয় শিক্ষা শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং পৌরনীতি ও নাগরিকতা বইয়ে ছিল কিছু ভুল।

নতুন কারিকুলামের বইয়ে ভুলের বিষয় ও দায়-দায়িত্ব খতিয়ে দেখতে বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে আলাদা দু’টি কমিটি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

সর্বাধিক পঠিত

সর্বশেষ সংবাদ