Skip to content

ধর্মনিরপেক্ষতার আড়ালে ধর্মীয় রাজনীতির বিকাশ

ধর্মনিরপেক্ষতার আড়ালে ধর্মীয় রাজনীতির বিকাশ

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল অসাম্প্রদায়িকতা। এর ভিত্তি ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। তবে সংবিধানের এই বৈশিষ্ট্য খর্ব হয়েছে বহু আগেই। সংবিধানের প্রস্তাবনায় ধর্মনিরপেক্ষতা বহাল থাকলেও ১৯৮৮ সালে সন্নিবেশিত হয়েছে ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’। একইভাবে উন্মুক্ত করা হয়েছে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে সংবিধান ও রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোতে দিনে দিনে উদ্ভব হচ্ছে নানা বৈপরীত্য।

অভিযোগ উঠেছে, বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলো ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে রাষ্ট্রক্ষমতা টিকিয়ে রাখাই এর উদ্দেশ্য। এতে দেশে ধর্মীয় সহিসংতা, হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতন বেড়ে চলেছে।

দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকারভিত্তিক সংগঠন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ৯ হাজারেরও বেশি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে শুধু ২০০১ সালে বিএনপি জোট সরকারের আমলে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৪ হাজারেরও বেশি। হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত শাহাবুদ্দিন চুপ্‌পু কমিশনের প্রতিবেদনেও একই রকম তথ্য উঠে এসেছে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় তিন দশকে শতাধিক ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটেছে বলে দাবি সংশ্নিষ্টদের।

জানতে চাইলে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত সমকালকে বলেন, ‘সংবিধানকে সাম্প্রদায়িকীকরণ করা হয়েছে। ১৯৮৮ সালে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম যুক্ত করার মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ বাঙালি জাতিসত্তায় বিভাজন টেনে দেওয়া হয়েছে। এই বিভাজন ধর্মীয় সংখ্যালঘুকে রাষ্ট্রীয় সংখ্যালঘুতে পরিণত করেছে। এখন সহিংসতা ও বৈষম্য দুই বিদ্যমান। অন্যদিকে, চলছে দায়মুক্তির সংস্কৃতি। সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় জড়িতদের কোনো বিচার হচ্ছে না। বিদ্যমান সংবিধানের বৈপরীত্যও এ জন্য দায়ী।’

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পাকিস্তানের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। পাকিস্তানের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। এদিন ঢাকার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) বিশাল জনসমুদ্রে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি আদর্শ রাষ্ট্র হবে আর তার ভিত্তি বিশেষ কোনো ধর্মীয়ভিত্তিক হবে না। রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা।’

বঙ্গবন্ধুর এ ঘোষণা সেদিনই প্রথম ছিল না। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন সময় এ ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর ভিত্তিতে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এই নির্বাচনে বিজয়ীদের নিয়েই দেশ স্বাধীন হওয়ার পর গঠিত হয় প্রথম গণপরিষদ। এই গণপরিষদই সংবিধানের খসড়া প্রণয়ন ও গ্রহণ করে। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশের সংবিধান সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। তখন সংবিধানে রাষ্ট্রের চার মূলনীতি সন্নিবেশিত হয়।

এদিন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘ভবিষ্যৎ বংশধররা যদি সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, তাহলে আমার জীবন সার্থক হবে, শহীদের রক্তদান সার্থক হবে।’

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বহুবার বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক পরিচয়ের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেছেন। মুজিবনগর থেকে যেসব পোস্টার বা ইশতেহার যুদ্ধের সময় বিলি করা হয়েছে, সেখানেও অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বহুল আলোচিত একটি পোস্টারে লেখা ছিল- ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার খৃষ্টান, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙালী।’

সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়, জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ সাপেক্ষে সমিতি বা সংঘ গঠন করার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকবে। তবে শর্ত থাকে যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসম্পন্ন বা লক্ষ্যানুসারী ধর্মীয় নামযুক্ত বা ধর্মভিত্তিক অন্য কোনো সমিতি বা সংঘ গঠন করার বা তার সদস্য হওয়ার বা অন্য কোনো প্রকারে তার তৎপরতায় অংশগ্রহণ করার অধিকার কোনো ব্যক্তির থাকবে না।

তবে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ধারাবাহিকতায় সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান সংবিধান সংশোধন করেন। ১৯৭৯ সালে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র স্থলে ‘মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ এবং সংবিধানের প্রস্তাবনার ওপর ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম’ (‘দয়াময়, পরম দয়ালু, আল্লাহর নামে/পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার নামে’) যুক্ত করেন।

এ ছাড়া সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিও উন্মুক্ত করেন জিয়াউর রহমান। একইভাবে আরেক সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮৮ সালে অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ২ (ক) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম যুক্ত করেন। ফলে প্রায় ২ কোটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিকের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা হয় বলে বিশিষ্টজন মনে করেন। জিয়াউর রহমান ও এরশাদ উভয়ই রাষ্ট্রক্ষমতা সুসংহত করতে এসব সংশোধনী আনেন বলে বিশ্নেষকদের মত।

আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৫ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর সময় ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় রাজনীতি প্রসঙ্গে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধান পুনর্বহালের সুযোগ পেলেও তারা সেটা করেনি। এ নিয়ে প্রগতিশীলরা দলটির সমালোচনা করছেন। তবে তৎকালীন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সমকালকে বলেন, ‘জনগণের ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সংবিধান সংশোধন করে ধর্মীয় রাজনীতি উন্মুক্ত করেছেন, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম যুক্ত করেছেন। তখন হুট করে এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল দুরূহ। জনগণকেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে হবে।’

বর্তমানে দেশে সব মিলিয়ে প্রায় ৭০টি ইসলামী দল রয়েছে। এর মধ্যে ১০টি নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে নিবন্ধিত। কয়েকটি দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং বিরোধী জোট বিএনপির সঙ্গেও যুক্ত রয়েছে। ফলে দেশের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে। ধর্মীয় রাজনীতি ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের পরিপন্থি। দেশে বর্তমানে ৪৫টি সংখ্যালঘু জাতিসত্তার অস্তিত্ব রয়েছে। সংবিধানে তাদেরও স্বীকৃতি মেলেনি।

এ প্রসঙ্গে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘১৯৭২ সালের মূল সংবিধান কার্যকর থাকলে দেশে ধর্মের নামে এত নির্যাতন, হানাহানি, সন্ত্রাস, বোমাবাজি, রক্তপাত হতো না, জঙ্গি-মৌলবাদীদের স্বর্গরাজ্য বলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ নিন্দিত হতো না। বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, যাবতীয় গণহত্যা, নির্যাতন ও ধ্বংসের জন্য দায়ী প্রধানত জামায়াতে ইসলামী, যা তারা করেছে ইসলামের দোহাই দিয়ে।’

তাঁর মতে, বাংলাদেশ আধুনিক ও সভ্য রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে, আর্থসামাজিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে এবং যুদ্ধ-জিহাদ বিধ্বস্ত বিশ্বে শান্তির আলোকবর্তিকা জ্বালাতে চাইলে ১৯৭২ সালের সংবিধানে পুনঃপ্রবর্তন ছাড়া কোনো পথ খোলা নেই।

১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধান প্রণয়ন কমিটির আহ্বায়ক বিশিষ্ট আইনজীবী ড. কামাল হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, স্বাধীনতার জন্য রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও দেশের মাটি থেকে উঠে আসা যে মূল্যবোধ, লক্ষ্য, আদর্শ তা গ্রহণ করেই আমাদের সংবিধান প্রণীত হয়েছিল। কিন্তু পরে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে একই সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রধর্মের মতো অনেক গোঁজামিল তৈরি করা হয়েছে। এসব গোঁজামিল দূর করতে অবিলম্বে একটি কমিশন গঠন করা প্রয়োজন।

সংবিধানের এসব গোঁজামিল দূর করার বিষয়ে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সমকালকে বলেন, ‘পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধান আমরা বহুলাংশে পুনর্বহাল করেছি। কিছু কিছু জিনিস আছে যেগুলো এখনও বহাল হয়নি। এগুলো পুনর্বহালের প্রয়োজন থাকলেও বাস্তবতার নিরিখে তা হয়নি। ইনশাআল্লাহ সেখানেও যাওয়ার একটা সম্ভাবনা আছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সংবিধান এই জাতিকে উপহার দিয়েছিলেন। ৫০ বছর পরও এটি আধুনিক সংবিধান হিসেবে মর্যাদা পেয়ে আসছে। এটি এখনও যথেষ্ট কার্যকর। তাই এটি সংস্কারের জন্য আপাতত কোনো কমিটি গঠনের প্রয়োজন দেখছি না।’



বার্তা সূত্র