দুস্থ শব্দটা থেকে মুক্তি চাই | কালের কণ্ঠ

দুস্থ শব্দটা থেকে মুক্তি চাই

কুমার বিশ্বজিৎ -ছবি : মোহসীন আহমেদ কাওছার

সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদের সঙ্গে বৈঠকে সেদিন কী নিয়ে কথা হয়েছিল আপনাদের?

১৭টি দাবি জানিয়েছি আমরা। আমাদের এই চাওয়াগুলো ৫০ বছরেও পূরণ হয়নি। এত দিন আমরা সংগঠিত হতে পারিনি বলে কখনোই এই প্রস্তাবগুলোও উঠে আসেনি। গীতিকবি সংঘ, সিংগারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ও মিউজিক কম্পোজার্স সোসাইটি অব বাংলাদেশ—তিনটি সংগঠন এবার এক হয়ে সরকারের উচ্চমহলে গানসংশ্লিষ্ট মানুষের দাবি তুলে ধরার চেষ্টা চালিয়েছি।

 

কত দিন ধরে এই প্রস্তাবগুলো উত্থাপনের পরিকল্পনা করেছেন?

বছরখানেক ধরে আমরা নিজেরা অনেকবার বসেছি। তিনটি সংগঠনই বারবার পর্যালোচনা করেছি, আসলে আমাদের প্রধান দাবিগুলো কী হতে পারে। দাবির তো শেষ নেই। কিন্তু ১৭টা দাবি মনে হয়েছে একেবারে কংক্রিট। সংগীতকে বাঁচিয়ে রাখতে এগুলোর বিকল্প নেই এই মুহূর্তে। আমাদের এই দাবিগুলো ন্যায্য দাবি।

 

তিন সংগঠনের বাইরে সংগীতের অন্যরা কি এই দাবিগুলোর সঙ্গে একমত?

এখানে দ্বিমত হওয়ার কিছু নেই। প্রতিটা চাওয়ার মধ্যেই ন্যায্যতা আছে, আমাদের সম্মানের জায়গাটা আছে। দাবিগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক তেমন কোনো বিষয়ই নেই। আমরা যেভাবে অবহেলিত হচ্ছি বা যা আমাদের প্রাপ্য, তা নিয়ে কথা বলেছি।

 

বৈঠকের ফলাফল কী?

কিছু কিছু বিষয় প্রতিমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাৎক্ষণিকভাবেই মেনে নিয়েছেন। যেমন—আমাদের একটা ঠিকানা, তিন সংগঠনের তিনটা অফিস দরকার। আগারগাঁওয়ে কপিরাইট অফিসের নতুন বিল্ডিংয়ে সেটা আমাদের দেওয়া হচ্ছে। এটা আমাদের বড় একটা প্রাপ্তি। আমাদের একটা নির্দিষ্ট ঠিকানা তো হলো, যেখানে সবাই মিলে বসতে পারি। এই ৫০ বছরে আমরা কত কিছু করেছি, কিন্তু একটা ঠিকানাই গড়তে পারিনি। প্রতিমন্ত্রী মহোদয় সব দাবিতেই একমত হয়েছেন। তিনিও বলেছেন, এখানে অযৌক্তিক কোনো দাবি নেই। এখান থেকে পর্যায়ক্রমে এগোতে হবে আমাদের। এক বৈঠকে তো সব পাস করা সম্ভব নয়। তিনটা ধাপ করে দিয়েছেন, যেভাবে পূরণ হতে পারে আমাদের দাবি। একটা হলো স্বল্পমেয়াদি কেস, যা খুব দ্রুতই পূরণ হবে। আছে মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কেস। এখানে তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে অর্থ মন্ত্রণালয়, এমনকি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপেরও বিষয় আছে।

 

দাবিগুলো নিয়ে অল্প করে যদি কিছু বলেন…

সব দাবিই গুরুত্বপূর্ণ। যেমন—আমাদের জন্য একটা ইনস্যুরেন্সের বিষয় আছে। একটা অডিটরিয়মের বিষয়। বাংলাদেশে এখনো কিন্তু সেভাবে প্রফেশনাল অডিটরিয়াম নেই। আরো কিছু বিষয় আছে, যেমন—আমাদের গানের লভ্যাংশ। গীতিকার, সুরকারের যে অংশ নিয়ে নিচ্ছে তৃতীয় শক্তি। সেগুলো সমভাবে বণ্টনের ব্যবস্থা করা। কর্মের বিপরীতে যা প্রাপ্য সেটা সিস্টেমেটিক করে দিলে আমরা ‘দুস্থ’ শব্দটা থেকে অন্তত মুক্তি পাব। আমরা এই ‘দুস্থ’ শব্দটা থেকে মুক্তি চাই। শেষ জীবনে আমরা হয়ে পড়ি ‘দুস্থ শিল্পী’, কারণ শিল্পীরা হিসেবি হন না। তাঁদের মনটা বাউল। সৃষ্টির পেছনে সময় দিতে গিয়ে ভবিষ্যতের চিন্তাটা আর করা হয় না। একজন শিল্পীর সৃষ্টি তাঁর গান, সেটা তাঁর একটা প্রপার্টি। সেটা যদি অন্য কেউ নিয়ে নেয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই শেষ জীবনে গিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন।

 

সংগীতবীমার ব্যাপারটি কী?

শিল্পীর ভবিষ্যতের জন্য এটা খুবই জরুরি। এখানে সরকারের যে ইনস্যুরেন্স কম্পানিগুলো আছে, সেগুলোতে শিল্পীদের জন্য আলাদা পলিসি করা হলে আমাদের জন্য প্রিমিয়ামের বিষয়টা অনেক সহজ হবে। দ্রুততম সময়ে এটার বাস্তবায়ন হবে।

 

সংগীতে ‘জাতীয় পুরস্কার’ও তো দাবি করেছেন…

পৃথিবীর অনেক দেশেই আছে এই পুরস্কার। আমাদের এখানে যে পদকগুলো আছে, সেখানে অবশ্যই সংগীতের স্থান আছে। কিন্তু সেগুলো যথেষ্ট নয়। যেমন—জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। সেখানে সংগীতের কয়েকজন পুরস্কৃত হন। কিন্তু একজন ধ্রুপদী গানের শিল্পী, যিনি সংগীতে অনেক অবদান রেখেছেন, দেখা গেল তিনি চলচ্চিত্রে সুযোগ পাননি বলে পুরস্কৃতও হননি। তাই বলে তাঁর অবদান কোনো অংশে কম নয়। শিল্পকলার ক্ষেত্রে শিল্পকলা পুরস্কার দেওয়া হয়। বাংলা একাডেমি পুরস্কার দেওয়া হয় সাহিত্যের জন্য। সংগীতে একটা জাতীয় পর্যায়ের পুরস্কার অপরিহার্য।

 

জাতীয় পুরস্কার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী কী বললেন?

তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, যেহেতু একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কার আছে, সেখানে আলাদা করে সংগীত পুরস্কারের কী প্রয়োজন? তখন অনেক বিষয়ই উঠে এসেছে। সবচেয়ে বড় কথা, সরকার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এই দাবির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে পেরেছেন। আশা করি আমাদের অনেক দিনের এই চাওয়া পূরণ হবে।

 

করোনার এই সময়ে সংগীতের কী অবস্থা? আপনার গানের নতুন খবরই বা কী?

মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর পরেই কিন্তু বিনোদনের জায়গা। সব কিছু ঠিক থাকলেই তো বিনোদন। পুরো পৃথিবীটাই এখন সমস্যায় নিমজ্জিত। আমার জন্য দুঃখজনক এই অবস্থাটা বোঝানো। এই যেমন আমার গান তৈরি আছে কয়েকটা, কিন্তু প্রকাশ করছি না। এই অবস্থায় গান প্রকাশ করতে মন সায় দেয় না। গেল ঈদেও চেষ্টা করেছিলাম। মানুষ তো সামাজিক জীব, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আমাদের অসামাজিক হতে হবে। সেই অভ্যাস করা তো এত সোজা না।



বার্তা সূত্র

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email