তালিকা করেই যাচ্ছে ঢাকা মুখে কুলুপ ইয়াঙ্গুনের

তালিকা করেই যাচ্ছে ঢাকা মুখে কুলুপ ইয়াঙ্গুনের
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

উম্মুল ওয়ারা সুইটি: রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ-মিয়ানমার গঠিত যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ তালিকা করেই যাচ্ছে গত তিন বছর ধরে। এ পর্যন্ত ছয় দফায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৮ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে তালিকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মিয়ানমার সমঝোতা চুক্তির ব্যাপারে একেবারেই নিশ্চুপ। নিজ দেশের নাগরিকদের ফেরত নেওয়ার পরিবর্তে মিয়ানমার কৌশল নিয়েছে কীভাবে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের নাগরিক বানানো যায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, চুক্তি অনুযায়ী ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু মিয়ানমার এ ব্যাপারে চুক্তির ধার তো ধারছেই না বরং রোহিঙ্গাদের তাদের নাগরিক হিসেবেই স্বীকার করতে চাচ্ছে না দেশটি। এ নিয়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও কয়েকটি দেশ ছাড়া বেশিরভাগ দেশ ও কূটনৈতিক জোট থেকে চাপ দেওয়া হলেও মিয়ানমার রাখাইনে অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন চালায়। যাতে নির্যাতনের ভয়ে রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফেরত যেতে অস্বীকৃতি জানায়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, নতুন ২ লাখ ৩০ হাজার মিলিয়ে ছয় দফায় মিয়ানমারের কাছে ৮ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা হস্তান্তর করা হয়েছে। এদের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৪২ হাজার জনের তালিকা যাচাই করেছে মিয়ানমার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আরেক কর্মকর্তা বলেন, সর্বশেষ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে গত বছর অক্টোবরে আন্তর্জাতিক চাপ শুরু হলে মিয়ানমার থেকে বলা হয়, তাদের জাতীয় নির্বাচনের পর (২০২০ সালের ডিসেম্বর) যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কিন্তু নির্বাচনের পর এখনো কোনো সাড়াশব্দ নেই দেশটির। মিয়ানমারের জাতীয় নির্বাচন শেষ হওয়ার পর চীনের উদ্যোগে গত বছর ডিসেম্বর মাসেই প্রত্যাবাসন ইস্যুতে একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় জাপানও সহযোগিতা করতে আগ্রহ দেখিয়েছে। কিন্তু কোনো কিছুই এগোয়নি।

এদিকে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে কোনো আগ্রহ না থাকলেও সর্বশেষ গত সোমবার ঢাকায় দেশটির রাষ্ট্রদূতের কাছে ২ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা তুলে দেওয়া হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিয়ানমার উইংয়ের মহাপরিচালক দেলওয়ার হোসেন গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গতকাল (সোমবার) আমি ঢাকার মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতের কাছে ২ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা তুলে দিয়েছি।’

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে সেনা অভিযান শুরুর পর কয়েক মাসের মধ্যে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। আগে থেকে বাংলাদেশে ছিল আরও চার লাখ রোহিঙ্গা। সবমিলিয়ে সরকারি হিসাবেই সাড়ে ১১ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে রয়েছে। এ বিশাল জনগোষ্ঠীর থাকা-খাওয়া ও নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশ সংকটে পড়তে পারে বলে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে ২০১৭ সালের শেষদিকে আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে পড়ে। সেই চাপের মুখে বাংলাদেশের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে একটি সমঝোতা চুক্তি করে মিয়ানমার সরকার। চুক্তি করলেও সেই প্রত্যাবাসন এখনো শুরু হয়নি। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর। চুক্তি অনুযায়ী তিন মাসের মধ্যে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসন শুরুর কথা। কিন্তু গত তিন বছরেও শুরু হয়নি। এ পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত নেয়নি মিয়ানমার সরকার।

২০১৯ সালে দুই দফা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও রাখাইন রাজ্যের পরিবেশ নিয়ে শঙ্কার কথা তুলে ধরে ফিরতে রাজি হয়নি রোহিঙ্গারা। তারা যেন নিরাপত্তা, মর্যাদা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে নিজ ভূমিতে ফিরতে পারে সেই বন্দোবস্ত করতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে। এর মধ্যে গত বছর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর জন্য মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে আহ্বান জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনী নতুন করে অভিযান শুরুর পর এখন পর্যন্ত সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘ রাখাইনের ওই সেনা অভিযানকে চিহ্নিত করেছে ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ হিসেবে। গত কয়েক দশক ধরে আরও প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসে। ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ১৩ বছরে ২ লাখ ৩৬ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফেরত যায়। এরপর থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বন্ধ রয়েছে।

জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ : ২০১৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সরকারের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রথম বৈঠক হয়। সেই বৈঠকে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থো মিয়ানমারের ছয় সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। এর আগে একই বছরের ২৩ নভেম্বর মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোতে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সম্পর্কিত মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়। সেই চুক্তিতে বলা হয়, তিন সপ্তাহের মধ্যে যৌথ ওয়ার্কিং কমিটি গঠন এবং দুই মাসের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়া শুরু করবে মিয়ানমার। ওই চুক্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক এবং মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব বৈঠকে বসে কমিটি এবং টার্মস অব রেফারেন্স চূড়ান্ত করবেন। ওয়ার্কিং গ্রুপে দুই দেশ থেকেই সচিব পদমর্যাদার একজন করে কর্মকর্তা নেতৃত্বে থাকবেন। কিন্তু কাগজে-কলমে করা চুক্তির বাস্তব কার্যকারিতা আসেনি এখনো। চুক্তি অনুযায়ী তিন মাসের মধ্যে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসন শুরুর কথা। এ নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে, তালিকাও প্রস্তুত করে দিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ফল শূন্য।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আবদুল মোমেন বলেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক। তাদের ফেরত নিতে বাংলাদেশ কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে। কিন্তু মিয়ানমার তাদের চুক্তি অনুযায়ী সহযোগিতা করছে না।

এদিকে ডিসেম্বরে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে আনা প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে চীন ও রাশিয়া। ভোটদানে বিরত থেকেছে ভারত, জাপানের মতো দেশ। এ ঘটনায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কিছুটা হতাশা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘এ ধরনের বিষয় যখন ঘটে তখন দ্বিপক্ষীয় বিষয় আর থাকে না। সে ক্ষেত্রে আমার মনে হয়, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিষয়ে যে ধীরগতি দেখছি, সেটা ঠিক হচ্ছে না।’

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘চীন, ভারত তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এটা খুবই দুঃখজনক। মিয়ানমার প্রথমেই জানে যে চীন-ভারত তাদের পাশে থাকবে। তারপর আছে পশ্চিমা বিশ্বে বেশকিছু বাণিজ্যিক কোম্পানি, যাদের মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্যিক স্বার্থ রয়েছে। চীন ও ভারত রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে থাকলে প্রত্যাবাসন অবশ্যই সহজ হবে।’

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ওয়ালি উর রহমান বলেন, ‘মিয়ানমারের কৌশলের পাল্টা কূটনৈতিক কৌশল আমাদের নিতে হবে। রোহিঙ্গাদের দ্রুত তাদের দেশে ফেরত পাঠাতে শক্তিশালী কূটনৈতিক তৎপরতা দরকার।’

সূত্র: দেশ রুপান্তর 


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।