Skip to content

ছয় লেনের মধুমতি সেতু উদ্বোধন

ছয় লেনের মধুমতি সেতু উদ্বোধন

বেনার নিউজ

খুলে দেয়া হয়েছে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নির্মিত ছয় লেনের কালনা সেতু, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হলো।

একইসঙ্গে বাংলাদেশের ১০ জেলার মানুষের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন ছাড়াও বেনাপোল স্থলবন্দর, মংলা সমূদ্রবন্দর ও নোয়াপাড়া নদীবন্দরের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করেছে এই সেতু। 

গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানি ও নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলাকে বিচ্ছিন্ন করা মধুমতি নদীর ওপর নির্মিত এই সেতু সোমবার ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সেতু বিভাগ জানিয়েছে, প্রথমে কালনা সেতু হিসেবে ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করা হলেও এটা যেহেতু মধুমতি নদীর ওপর নির্মিত এবং মধুমতি নামটি অনেক মিষ্টি, তাই এটার নাম মধুমতি সেতু রাখার সিদ্ধান্ত নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 

মধুমতি সেতু নির্মাণের ফলে ভারতের পেট্রোপোল থেকে বাংলাদেশের বেনাপোল স্থলবন্দর হয়ে যানবাহন কোন প্রকার ফেরি ছাড়াই পদ্মা সেতু অতিক্রম করে সিলেটের তামাবিল সীমান্ত হয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহণ করতে পারবে। তা ছাড়া এই সড়ক এশিয়ান হাইওয়ে-১ হিসাবে ভারতের মধ্যে দিয়ে ভূটান, মিয়ানমার ও চীনের সাথে সংযুক্ত হবে।

জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার অর্থায়নে ২০১৫ সালে শুরু হওয়া কালনা সেতুতে রয়েছে ছয় লেন, যেগুলোর মধ্যে দুটি লেন রয়েছে ধীরে চলা যানবাহন তথা ইজিবাইক, রিক্সা ও সাইকেলের জন্য। জাপানের টেককেন করপোরেশন ও ওয়াইবিসি এবং বাংলাদেশের আবদুল মোনেম লিমিটেড যৌথভাবে কালনা সেতু নির্মাণ করেছে।

মোট ৬৯০ মিটার লম্বা ও ২৭ দশমিক ১০ মিটার চওড়া সেতুটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯৯০ কোটি টাকা। ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কালনা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন।

কেন গুরুত্বপূর্ণ মধুমতি সেতু?

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে রাজধানী ঢাকার সাথে সরাসরি যুক্ত করতে পদ্মাসেতু নির্মাণ করেছে সরকার। তবে গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানি উপজেলা এবং নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত মধুমতি নদীর ওপর কোন সেতু না থাকায় ওই সড়ক দিয়ে চলাচল করা যানবাহনগুলোকে কমপক্ষে ফেরির জন্য লম্বা সময় অপেক্ষা করতে হয়।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের খুলনা জোনের দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ আসলাম আলী সোমবার বেনারকে বলেন, ঢাকা থেকে বেনাপোল যেতে মূলত যানবাহনগুলো দুটি রুট ব্যবহার করে। একটি হলো; মানিকগঞ্জ জেলার পাটুরিয়া ফেরিঘাট, ফরিদপুর, মাগুরা, ঝিনাইদহ, যশোর হয়ে বেনাপোল। এই রুটের দূরত্ব ২৭৪ কিলোমিটার।

আরেকটি রুট হলো; পদ্মা সেতু পার হয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলা, ফরিদপুর সদর, মাগুরা, যশোর হয়ে বেনাপোল। এই রুটের দূরত্ব ২১৫ কিলোমিটার।

সৈয়দ আসলাম বলেন, “কালনা সেতু উদ্বোধন হওয়ার ফলে এখন ঢাকা থেকে বেনাপোল যাওয়া যানবাহন পদ্মা সেতু পার হয়ে ভাঙ্গা, গোপালগঞ্জ, কাশিয়ানি, লোহাগড়া, নড়াইল বাইপাস ও যশোর হয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে।”

কালনা সেতু হয়ে ঢাকা থেকে বেনাপোলের দূরত্ব ১৫৫ কিলোমিটার। অর্থাৎ এই সেতু চালুর ফলে কমপক্ষে ৬০ কিলোমিটার পথ কমবে।

সৈয়দ আসলাম বলেন, “বেনাপোলে থেকে তামাবিল সীমান্ত পর্যন্ত সরাসরি রাস্তার ক্ষেত্রে মধুমতি সেতু ছিল মূল মিসিং লিঙ্ক। এই সেতু চালু হওয়ার ফলে সেটি আর থাকলো না।”

তিনি বলেন, “এই সড়ক মূলত বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে এশিয়ান হাইওয়ে-১ হিসাবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্য, ভূটান, মিয়ানমার ও চীন চলে যাবে।

বেনাপোল বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য খুবই ‍গুরুত্বেপূর্ণ। বাংলাদেশের ২৪টি স্থলবন্দরের মধ্যে সবচেয়ে বড় যশোরের এই বন্দর।

বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের হিসাবে ২০২১-২২ অর্থ বছরে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে প্রায় সাড়ে ২৬ লাখ মেট্রিকটন বিভিন্ন পণ্য ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে রপ্তানি মাত্র চার লাখ মেট্রিকটনের কিছু বেশি।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ যাতায়াত করেন বেনাপোল বন্দর দিয়ে। ২০২১-২২ অর্থ বছরে প্রায় পাঁচ লাখ ৫৯ হাজার মানুষ এই বন্দর দিয়ে চলাচল করেছেন বলে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

ঢাকা থেকে নিয়মিত যশোর যাতায়াত করা মধুসুদন মন্ডল সোমবার বেনারকে বলেন, কালনা সেতু হয়েছে ভালো। এই সেতুর পূর্ণ সুবিধা পেতে আরও অপেক্ষা করতে হবে।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, কালনা সেতু ছয় লেনের। কিন্তু সেতু থেকে নামার পর কালনা থেকে নড়াইল শহর বাইপাস পর্যন্ত সড়কটি এক লেনের। ছয় লেন রাস্তা অথবা কমপক্ষে চার লেনের রাস্তা নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত কালনা সেতুর পুরোপুরি সুবিধা মিলবে না।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এশিয়ান হাইওয়ে

বাংলাদেশ তিন দিক থেকে ভারতবেষ্টিত। ভারতের আট উত্তর-পূরাঞ্চলীয় রাজ্যকে মূল ভূখন্ড থেকে আলাদা করে রেখেছে বাংলাদেশ।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে ওই আট রাজ্যে পণ্য পরিবহনের খরচ, সময় ও ঝুঁকি সবই বেশি। সেকারণেই বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যে পণ্য ও অন্যান্য সামগ্রী পাঠাতে চায় ভারত।

আবার চীন সরকারও বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে চলে যাওয়া এশিয়ান হাইওয়ে-১ ব্যবহার করতে চায়। সিলেট থেকে তামাবিল পর্যন্ত দুই লেনের রাস্তাকে চার লেন করতে একটি প্রকল্পে অর্থায়ন করছে চীনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এশিয়ান ইনফাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক। এটি বাংলাদেশে ব্যাংকটির প্রথম অর্থায়ন।

বাংলাদেশভারত লাভবান হবে

যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ব্যাপারে বাংলাদেশ ও ভারত উভয়েই কাজ করে চলেছে জানিয়ে নয়াদিল্লির মনোহর পানিক্কর ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড এনালিসিসের রিসার্চ ফেলো ড. পুষ্পিতা দাস বেনারকে বলেন, সব ধরনের অগ্রগতি মূলত যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।

তিনি বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্প্রসারণের ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন হওয়া সম্ভব।

বাংলাদেশে নতুন নতুন সেতু নির্মান এবং হাইওয়েগুলো সম্প্রসারণের ফলে দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি মানুষের যাতায়াতও বাড়বে।এর ফলে আর্থিকভাবে বাংলাদেশ উপকৃত হবে,” মনে করেন ড. দাস।

আমদানি ও রপ্তানি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ী রণজিৎ রায় বেনারকে বলেন, “নতুন সেতু ও হাইওয়ে সম্প্রসারণে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে পণ্য চলাচল দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়ক হবে। বাংলাদেশও ভুটান, নেপালসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ করতে পারবে।”

রাস্তা ব্যবহার করতে টোল দিতে হবে

তবে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের অনেকে মনে করেন, বেনাপোল হয়ে বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যে পণ্য চলাচল শুরু হলে ওই আট রাজ্যে বাংলাদেশের বাজার অনেকটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ওই সকল রাজ্য বাংলাদেশি পণ্যের অন্যতম বাজার।

লিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ. মনসুর সোমবার বেনারকে বলেন, “ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে ভারতীয় পণ্যবাহী ট্রাক বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে উত্তর-পূ্বাঞ্চলীয় রাজ্যে গেলে সেখানে আমাদের পণ্য রপ্তানিতে কিছুটা প্রভাব পড়বে। তবে দূরত্ব কম হওয়ার কারণে আমরা কিছুটা সুবিধা পাবো।”

তিনি বলেন, “তবে একটি কথা, বাংলাদেশের রাস্তা ব্যবহারের ওপর ওজন ও আকারভেদে ভারতীয় যানবাহনের ওপর চার্জ আরোপ করতে হবে। শুধু পদ্মাসেতু বা অন্যান্য সেতুর টোল নিলেই হবে না। বাংলাদেশের রাস্তা জনগণের টাকায় নির্মাণ করা। সুতরাং, ভারতীয়রা ব্যবহার করতে হলে তাদের আনুপাতিক হারে টোল দিতে হবে।”

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন কলকাতা থেকে পরিতোষ পাল