চাষী নজরুল ইসলাম: কিছু স্মৃতি কিছু কথা

জাফর ফিরোজ: সদা হাস্যোজ্জ্বল, প্রাণবন্ত উচ্চাঙ্গ কথার স্বর থেকে যার গলা কখনো নিচে নামেনি তিনি চাষী  নজরুল ইসলাম। চাচা বলেই ডাকতাম; আমাকে দেখতেন নিজের ছেলের মত। যখন চলচ্চিত্র নিয়ে উচ্চতর পড়া লিখার কথা চাচাকে বললাম তিনি তখন মুম্বাই যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। কারণ তিনিও একবার নায়ক হওয়ার আশায় বাড়ি থেকে পালিয়ে মুম্বাই গিয়েছিলেন। প্রায় সময় আমাকে বাসায় ডেকে নিয়ে শুনাতেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে কি কি পরিকল্পনা তিনি করছেন।

তরুণদেরকে কোন কোন সেক্টর গুলোতে অগ্রাধিকার দিতে হবে সেই সব নিয়েও ছিল তার সুন্দর পরিকল্পনা। সেই সব সুন্দর পরকল্পনা বাস্তবায়ন করার আগেই আমাদের সবাইকে কাঁদিয়ে ২০১৫ সালের ১১ জানুয়ারি রোববার ভোর পাঁচটা ৫৫ মিনিটে মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে চলে গেলেন ।

সদা হাস্যোজ্জ্বল প্রাণবন্ত মানুষটি এভাবে দ্রুত চলে যাওয়ার ঘটনায় বারবার মনে পড়ছে কথা সাহিত্যিক তারা শঙ্করের সেই অমর উক্তি, “জীবন এত ছোট কেন?”

জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে বাংলাদেশের প্রথম শিশুতোষ ডিজিটাল চলচ্চিত্র ‘দূরবীন’এর ডিভিডি প্রকাশনা অনুষ্ঠানে তিনি এসে ছোটদের চলচ্চিত্র নিয়ে যা বলেছিলেন তা আমাদেরকে আশান্বিত করেছিল সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। তিনি ছোটদের জন্য চলচ্চিত্র বানাবেন আমার সাথে সেই চলচ্চিত্রের গল্প নিয়েও কথা বলেছিলেন। তাঁর আশা আশাই থেকে গেল। মানুষের সব আশা কি পূরণ হবার নয়?

১৯৫৭ সালের দিকে পিতা মুসলেহ উদ্দিনের মৃত্যুর পর সংসারে বড় ছেলে হিসেবে সব দায়িত্ব তাঁর কাঁধে এসে পড়ে। এ সময় তিনি এজি অফিসে অফিসের পোস্ট-সর্টার হিসেবে ১৯৬৯ পর্যন্ত চাকরি করেন। এফডিসি মাত্র তখন গড়ে উঠছে। আউয়াল সাহেব বিখ্যাত সিনেমা করিয়ে ফতেহ্ লোহানীর প্রধান সহকারী। চাষী চাকরির ফাঁকে ফাঁকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন, একই সঙ্গে শুরু করলেন নাটক। আলী মনসুরের কৃষ্টি সংঘের সঙ্গে কাজ করেন মঞ্চে অভিনয় করেন। এদিকে চাষীর সিনেমা প্রীতিটা জানতেন তার খালাতো বোনের স্বামী সৈয়দ আওয়াল। একদিন সুযোগ মতো চাষীকে তিনি পরিচয় করিয়ে দিলেন পরিচালক অভিনেতা ফতেহ লোহানীর সঙ্গে। ফতেহ লোহানী তখন আছিয়া করছিলেন। চাষীকে ছোট্ট একটা রোল করার জন্য নিয়েছিলেন। কিন্তু ফতেহর নির্দেশে পরদিন সহকারী পরিচালকের দায়িত্ব দেয়া হয়। ১৯৬১`র জুন মাসে চাষী কাজ শুরু করলেন। এরপর ১৯৬৩-তে কাজ করেছেন প্রখ্যাত সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রাকার ওবায়েদ-উল-হকের সহকারী হিসাবে দুইদিগন্ত ছবিতে। এভাবে কাজ করতে করতে এলো ১৯৭১। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলেন আর সবার মতো। তারপর যুদ্ধশেষে বাংলাদেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিক্তিক চলচ্চিত্র ওরা ১১ জন নির্মাণ করলেন। ১৯৭২-এ এই ছবির মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে চাষী নজরুলের আত্ম প্রকাশ ঘটলো।

ওরা ১১ জন সিনেমাটি অনেক দিক থেকেই মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য সিনেমা থেকে আলাদা। কীভাবে? এই সিনেমাতে যে ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা অভিনয় করছেন তারা প্রত্যেকেই প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই এগারোজন হলেন: খসরু, মুরাদ, নান্টু, আলতাফ, আবু, হেলাল, আতা, বেবি, অলিন, ফিরোজ ও মঞ্জু। চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত অস্ত্র-গোলা-বারুদ সবই ছিল সত্যিকারের- জয়দেবপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে আর্মস ও অ্যামুনেশন সরবরাহ করা হয়। জয়দেবপুর সেনানিবাসের সেনা সদস্যরাও অভিনয় করেছেন সিনেমাতে। সাহস করে সত্যিকারের অস্ত্র তো ব্যবহার করলেন, কিন্তু এর জন্য ঝামেলা কম পোহাতে হয়নি।

একটি দৃশ্য ছিল এমন- একটি মেয়েকে পাকিস্তানী হানাদাররা তাড়া করবে এবং গুলি ছুঁড়তে থাকবে কিন্তু মেয়েটির গায়ে কোন গুলি লাগবেনা। যেহেতু গুলি ছিল আসল, তাই গুলি গায়ে লেগে আহত বা নিহত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল অনেক বেশি। চিত্রগ্রাহক আব্দুস সামাদ “আমি সিনেমার অংশ হতে এসেছি, মানুষের মৃত্যুর অংশ হতে আসিনি” বলে বেঁকে বসলেন। শেষ পর্যন্ত খসরু গুলি ছোড়ার দায়িত্ব নিলেন। দৃশ্যটি ধারণ শুরু হল। মেয়েটি দৌড়াচ্ছে আর খসরু একে একে ৩০টি গুলি ছুঁড়লেন। গুলি মেয়েটির খুব কাছ দিয়ে চলে গেল, কয়েকটা জামাও স্পর্শ করল কিন্তু একটাও শরীরে লাগলনা। সফলভাবে এই কঠিন দৃশ্য ধারণ শেষে সবাই আনন্দে খসরুকে জড়িয়ে ধরলেন! সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং একটা তথ্য দেই, এই সিনেমাতে সত্যিকারের পাকিস্তানি সৈন্যরাও অভিনয় করেছেন। দৃশ্যটি ছিলো ধরা পড়ে যাওয়া পাকিস্তানি সৈন্যকে মেরে ফেলার। মুক্তিযুদ্ধের সময় আটকে পড়া দুই পাকিস্তানি সৈন্য তখন চলচ্চিত্রটির ইউনিটের কাছে বন্দী ছিল। তাদেরকে তখনও বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। এই দুই সৈন্যকে দিয়েই দৃ্শ্যটিতে অভিনয় করানো হয়। এরপর তাদেরকে সেনানিবাস কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এই হল চাষি নজরুল ইসলাম যিনি এত সব ঝক্কি ঝামেলা করে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সিনেমা বানালেন। বাংলাদেশের অন্যতম মেধাবি একজন পরিচালক। শুধু মুক্তিযুদ্ধ নয়, সাহিত্য থেকে সিনেমা নির্মাণেও ছিল তার জুড়ি মেলা ভার। শরৎচন্দ্রের ক্লাসিক “দেবদাস” নিয়ে নিয়ে দুই সময়ে দুইটি সিনেমা বানিয়েছেন, একটিতে ছিলেন প্রয়াত বুলবুল আহমেদ, একটিতে শাকিব খান। সাকিব খানকে নিয়ে যে দেবদাস বানিয়েছিলেন সেটার প্রিমিয়ারে চাচার সাথে আমিও ছিলাম। ছবি শেষ হওয়ার পর চাচা আমার দিকে ফিরে বললেন- ক্যামন দেখলি?

নায়ক ফারুক তার প্রযোজনায় সিনেমা বানালেন, পরিচালক হিসেবে নিলেন চাষি কে। সিনেমার নাম “মিয়াভাই”। সাতটি ট্রলার নিয়ে ১০০ জনের বিরাট দল রওনা দিল আউটডরে, শুটিং এর জন্য। যেই আনন্দ করে ফারুক গিয়েছিলেন, সেই আনন্দ তার থাকল না, তিনি জানতে পারলেন, সিনেমার স্ক্রিপ্ট হারিয়ে গেছে, এও জানতে পারলেন এই কারণে পরিচালক ভয়ে তার কাছে আসেননি তিনদিন। মেজাজ খারাপ না করে চাষিকে কাছে ডেকে বললেন- টেনশনের কিছু নাই, গল্প আপনি জানেন, আমিও জানি, জাস্ট লিঙ্ক ধরে শুটিং করে ফেলব, তবে একটা শর্ত- আর কেও যেন না জানে! স্ক্রিপ্ট ছাড়া একটা সিনেমার শুটিং এত ভালভাবে শেষ হয়ে গেল কেউ জানতেও পারলনা।

একজন চলচ্চিত্রকার হিসেবে চাষী নজরুল ইসলাম যেমন ছিলেন বহুমাত্রিক, তেমনি একজন মানুষ হিসেবে সর্বজনীন। সবার সঙ্গে থেকে কথা বলাছিল তার বড় গুণ। কারও প্রতি রাগ করলেও কিছুক্ষণ পরই দেখা যেত সব ভুলে ঘাড়ে হাত দিয়ে হাসি মুখে কথা বলছেন। মনের মধ্যে কোন কিছু রাখতেন না। যা থাকতো তা সঙ্গে সঙ্গে বলে ফেলতেন। সাহস ছিল তার প্রধান সম্পদ। সত্য কথা প্রকাশ্যে এবং উচ্চস্বরে বলতেন বলেই চাষী নজরুল ইসলাম সবার শ্রদ্ধার, ভালবাসার মানুষ হিসেবে অন্তরে ঠাঁই করে নিয়েছিলেন। প্রখর ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ হিসেবে তার উপস্থিতি যেকোন অনুষ্ঠানকে করত আলোকিত, আন্দোলনকে করত উজ্জীবিত। চলচ্চিত্র সম্পর্কে প্রচুর জ্ঞান রাখতেন তিনি। যখন কথা বলতেন, তখন সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতেন। অকাতরে নিজের জানা সবকিছু বিলিয়ে দিতেন। এক্ষেত্রে আমি কোন কার্পণ্য করতে দেখিনি। মানুষকে ভালবাসতেন।

ভালবাসতেন চলচ্চিত্রকে। সিনেমার নায়ক হওয়ার জন্য বাড়ি থেকে মুম্বাইও পালিয়ে গিয়েছিলেন কিশোর বয়সে। স্বপ্নকন্যা মিনাকুমারীর সঙ্গে দেখা করে অভিনয়ের ইচ্ছাও প্রকাশ করেছিলেন। বয়স কম থাকায় মিনাকুমারী কিছুদিন অপেক্ষা করতে বলেছিলেন। নায়ক হওয়ার জন্যই তার চলচ্চিত্রে আসা। তবে শখের বশে অভিনয়ও করেছেন। চলচ্চিত্রের একজন হয়ে মানুষের ভালবাসা পেয়েছেন সীমাহীন।

চাষী নজরুল ইসলাম চারবার বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। পরিচালনার স্বীকৃতি হিসেবে অর্জন করেন একুশেপদক সহ অসংখ্য পুরস্কার।

স্বাধীন বাংলায় চলচ্চিত্র জগতের পাশাপাশি তিনি ছিলেন আমাদের সমাজের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র ও অভিভাবক। তিনি ছিলেন সৃজনশীল প্রাণপুরুষ। সেই সৃজনশীল কর্মের মাধ্যমেই তিনি মানুষের মাঝে চিরঞ্জীব থাকবেন। যত দিন বাংলাদেশ থাকবে তত দিন চাষী নজরুলকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।

বার্তা সূত্র

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email