চতুর্থ স্তম্ভ: পেগাসাস ডেঞ্জারাস

চতুর্থ স্তম্ভ: পেগাসাস ডেঞ্জারাস

চতুর্থ স্তম্ভ: পেগাসাস ডেঞ্জারাস

১২ জানুয়ারি, ২০১৮। দিল্লিতে চারজন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এক সাংবাদিক বৈঠকে বসে, সাংবাদিকদের বললেন, ভারতবর্ষের গণতন্ত্র বিপন্ন। তাঁরা চারজনে মিলে একটা চিঠি দিয়েছেন, দেশের মুখ্য বিচারপতিকে, সেই চিঠি পড়ে শোনালেন। বিচারবিভাগের থেকে কিভাবে মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে, তার কথা বললেন। বললেন জাস্টিস লোয়ার অস্বাভাবিক মৃত্যুর কথা, যাঁর কাছে ছিল শোহরাবুদ্দিন মামলা, যে মামলাতে অভিযুক্ত ছিলেন অমিত শাহ। চিঠিতে লিখলেন,  ‘Unless this institution is preserved and it maintains its equanimity, the democracy will not survive in this country, or any country.’ মানে সুপ্রিম কোর্ট যদি নিরপেক্ষ না থাকে, তাহলে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে বাঁচানো যাবে না, গণতন্ত্র বিপন্ন। কে বললেন? জাস্টিস চেলামেশ্বর, জাস্টিস কুরিয়ান জোসেফ, জাস্টিস মদন বি লোকুর, এবং জাস্টিস রঞ্জন গগৈ। কবে বললেন? আবার দিনটা মাথায় রাখুন, ১২ জানুয়ারি, ২০১৮। এর প্রায় ন মাস পরে জাস্টিস রঞ্জন গগৈ দেশের মুখ্য বিচারপতি, চিফ জাস্টিস হিসেবে শপথ নিলেন, যদিও সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী তিনি সেই সময়ে সবথেকে সিনিয়র ছিলেন না, যাইহোক তিনি চিফ জাস্টিস হলেন। হবার কিছুদিনের মধ্যেই, এপ্রিল ২০১৯ এ রঞ্জন গগৈের বিরুদ্ধে এক মহিলা ল ক্লার্ক সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট, যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আনলেন। জানালেন, ১০–১১ অক্টোবর, ২০১৮, তাঁকে নিজের বাসভবনে ডেকে, জাস্টিস রঞ্জন গগৈ যৌন নিপীড়ন করেন। গগৈ প্রতিক্রিয়ায় জানালেন, এসবই স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার ওপর আঘাত হানার ষড়যন্ত্র মাত্র। অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে, একমাসের মধ্যে রঞ্জন গগৈ নিজেই, এক তিন সদস্যের

অভ্যন্তরীণ কমিটি তৈরি করে দিলেন, যে কমিটি ঘটনার বিচার করবে। মানে, অভিযুক্ত নিজেই নিজের বিচারের জন্য কমিটি তৈরি করলো, বিচার শুরু হল। মহিলার স্বামী এবং জামাইবাবু, পুলিশে চাকরি করতেন, তাদের চাকরি চলে গেলো। মহিলা নিজে, তাঁর ওপর, তাঁর পরিবারের ওপর চাপ দেওয়া হচ্ছে, হ্যারাস করা হচ্ছে ইত্যাদি বললেন। খুব শিগগিরই কমিটির রায় চলে এলো, অভিযোগ খারিজ করা হল, মহিলাও আর কোনও উচ্চবাচ্য করলেন না, তাঁর স্বামী এবং জামাইবাবু চাকরি ফিরে পেয়েছেন। ওই কমিটির মাথায় কে ছিল? জাস্টিস বোবদে, যিনি জাস্টিস গগৈয়ের পরেই চিফ জাস্টিস হয়েছেন, তাহলে কী দাঁড়ালো? জাস্টিস গগৈয়ের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এল, গগৈ সাহেব নিজেই তাঁর বিচারের জন্য কমিটি তৈরি করলেন, মাথায় বসালেন জাস্টিস বোবদেকে, যিনি তাঁর পরেই চিফ জাস্টিস হবেন, মহিলার অভিযোগ খারিজ করা হল, মহিলা এ নিয়ে আর কোনও কথা বলেননি। যে যার মত করে বুঝে নিন, কারণ কিছুই যে বোঝা যাচ্ছে না তা তো নয়। এবার জাস্টিস গগৈ চেয়ারে বসেই দারুণ গুরুত্বপূর্ণ কিছু মামলার রায় দিলেন, আর কিছু মামলা খুলেই দেখলেন না, মানে সেই মামলার শুনানি পর্যন্ত হল না, আসুন সেগুলো কী কী একটু দেখে নিই।

সবক্ষেত্রে যে রায় দিতেই হবে এমনও তো নয়, অনেক ক্ষেত্রে চুপ করে থাকলেই কাজ হয়ে যায়। সে থাক, প্রথমেই আসবে কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা তুলে নেওয়ার ঘটনা, ক’দিনের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করা হল। যাতে বলা হল এই সিদ্ধান্ত দেশের ইউনিয়ন গভর্নমেন্ট নিতে পারে না। তার এক্তিয়ারই নেই, মামলা দায়ের করা হল কিন্তু তার শুনানি হল না, হয়নি। ঠাণ্ডা ঘরে মামলা ঝুলছে, একটা গোটা রাজ্য, এত বড় সিদ্ধান্ত, অত মানুষের প্রতিবাদ, মামলার শুনানিও হল না। এনআরসি নিয়ে দেশ উত্তাল, কেবলমাত্র অসমেই, হ্যাঁ অসম, মাথায় রাখুন রঞ্জন গগৈ অসমের মানুষ, কেবলমাত্র অসমেই ২০ লক্ষ মানুষের লিস্ট তৈরি, যাঁরা নাকি নাগরিক নয়। সরকার প্রমাদ গুনছে, মামলা গেলো আদালতে, যে আদালতের রায় অনুযায়ী এই তালিকা তৈরি হয়েছে, আদালত রিপোর্ট দেবে, সুপ্রিম কোর্ট রিপোর্ট দেবে। দিল, সিলড কভারে রিপোর্ট, মানে গোপন রিপোর্ট, সে রিপোর্ট খোলা হল না, সরকার হাঁফ ছেড়ে বাঁচল, সর্বোচ্চ আদালতের মাথায় কে? রঞ্জন গগৈ। অবশ্য সিলড কভারের ব্যাপারে রঞ্জন গগৈয়ের পারদর্শিতা নিয়ে, কোনও প্রশ্নই করা উচিত নয়, কারণ ওই সময়েই রাফাল মামলা ওঠে, সেই মামলাতেও সরকার সিলড কভার ডকুমেন্ট দিয়েছিল, সেই তথ্য কারোর দেখার অনুমতি ছিল না, রায় সরকারের পক্ষে গিয়েছিল। সিবিআইয়ের মাথায় কে বসবে, তাই নিয়ে যথেচ্ছ জলঘোলা হয়, এর আগে কখনোই যা হয়নি, মামলাও হয়, মামলার রায় নরেন্দ্র মোদি সরকারের পক্ষেই যায়, তখন সুপ্রিম কোর্টের মাথায় কে? রঞ্জন গগৈ। এরপর আযোধ্যা – বাবরি মসজিদ মামলা, রায়ে বলা হল, অন্যায় ভাবে রামলালার মূর্তি মসজিদের মধ্যে রাখা হয়েছিল। বলা হল যে সেরকম প্রমাণও পাওয়া যাচ্ছে না যাতে করে বলা যায় যে বাবরি মসজিদ, এক মন্দির ভেঙেই তৈরি হয়েছিল, রামের জন্মস্থানও বিশ্বাস বলেই আদালতের রায় কিন্তু ওই জমিতে মন্দিরই হবে, মসজিদের জন্য মন্দির চত্ত্বরের বাইরে জমি দেওয়া হবে, রায় গেলো আরএসএস – বিজেপির পক্ষে, রামজন্মভূমির পক্ষে, আদালতের রায় যেতেই পারে, কিন্তু আমরা সেই রায়ের কোনও ব্যাখ্যা পেলাম না, অনেক আইনজীবী সেই কথা বললেন, আইনজীবী প্রশান্তভূষণ বললেন, জাস্টিস গগৈয়ের মত খারাপ বিচারপতি এর আগে দেখা যায়নি, ওনার মত, কিন্তু প্রকাশ্যেই বললেন। যিনি ২০১৮ জানুয়ারিতে বলেছিলেন, দেশের গণতন্ত্রকে বাঁচানোর জন্য দরকার, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম এবং সোজা কথা বলতে পারে এমন বিচারপতি, সেই তিনিই ১৭ নভেম্বর ২০১৯ অবসর গ্রহণ করলেন, এবং ঠিক চার মাস পরে ১৯ মার্চ ২০২০ তে রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে মনোনীত হলেন, কিরিটি রায় বা ব্যোমকেশের মার্ডার মিস্ট্রিতেও এত কো ইনসিডেন্ট, এত সমাপতন দেখা যায় না। আর এত কিছুর পরে, আবার জাস্টিস গগৈয়ের নাম ভেসে উঠেছে পেগাসাসের বাজারে, জানা গেলো, ওই যে মহিলা, যিনি জাস্টিস গগৈয়ের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এনেছিলেন, তাঁর ফোনে ওই পেগাসাস সফটওয়ার দিয়ে নজরদারি রাখা হচ্ছিল, অবাক হচ্ছেন? একজন পাতি ল ক্লার্ক সাকুল্যে মাইনে হাজার ৫০ টাকা, তাঁর ফোন পেগাসাস দিয়ে ট্যাপ করা হচ্ছিল? আরও অবাক হবেন শুনলে যে কেবল ওই মহিলা নয়, সেই মহিলার স্বামী, জামাইবাবু, আত্মীয় স্বজন মিলিয়ে আরও ১০ জনের ফোন ট্যাপ করা হয়েছে, ঠিক ওই সময়ে যে সময়ে ওই মহিলার বিষয় নিয়ে, সুপ্রিম কোর্টের এক উচ্চপর্যায়ের কমিটি বিচার চালাচ্ছেন, জাস্টিস বোবদের নেতৃত্বে। কী জানার চেষ্টা হচ্ছিল? কেন আড়ি পাতা হচ্ছিল? সরকার জবাব দেবে না? জবাব চাইছে যারা তাঁদেরকে দেশের উন্নয়ন বিরোধী বলা হবে, কারণ তাঁরা নাকি, সংসদের কাজ থামিয়ে দিয়েছেন? সেই সংসদের দরকারটাই বা কি? যারা এক সামান্য ল ক্লার্কের ফোনে পেগাসাসের মত সফটওয়ার দিয়ে নজরদারী কারা করছে, কেন করছে তার উত্তর না দিতে পারে? পাকিস্তান করছে? ইজরায়েল করছে? আমাদের দেশের এক ল ক্লার্কের ফোন ট্যাপ করছে বিদেশী শক্তি? যতবার বিরোধীরা প্রশ্ন করছেন যে, বলুন কেন নজরদারী চলছে? সরকার ভাঙা রেকর্ডের মত বলে যাচ্ছে, সরকার কোনও বে আইনী নজরদারি চালাচ্ছিল না, মানে আইনীভাবে চালাচ্ছিল।

কোন আইনে এক জন মহিলা ল ক্লার্ক, যিনি তাঁর ওপরে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এনেছেন, তাঁর ফোন, তাঁর পরিবারের আরও ১০ জনের ফোনের ওপর নজরদারি চালানো হয়? কেন? ওদিকে জানা যাচ্ছে পেগাসাস এক অত্যন্ত শক্তিশালী উচ্চ মানের সামরিক অস্ত্র হিসেবেই বিক্রি হয়েছে, এনএসও, ইজরায়েলি সংস্থা, যারা এটা বিক্রি করেছে বিভিন্ন দেশকে, তারাই জানিয়েছে, এই মারাত্মক অস্ত্র কেবলমাত্র উগ্রপন্থী বা সংগঠিত অপরাধী, অর্গানাইজড ক্রিমিনালদের নজরদারির জন্যই ব্যবহার করা যাবে, এটাই নাকি পেগাসাস লাইসেন্সের শর্ত। এবার ভাবুন, সুপ্রিম কোর্টের একজন ল ক্লার্ক, তাঁর স্বামী পুলিশের কনস্টেবল, জামাইবাবু পুলিশের কনস্টেবল, তাঁর বোন, ভাই আত্মীয়স্বজনদের ওপর নজরদারি চলছিল কেন? তাঁরা টেররিস্ট না অর্গানাইজড ক্রিমিনাল? কোনও জবাব আছে? সরকারের কাছে কোনও জবাব নেই, কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়, এবার এই সত্যকে চাপা দেওয়ার জন্য যতই চেষ্টা হোক, সত্যিটা এবার বেরোবেই, কারণ মরক্কো, একদা ফ্রান্সের কলোনি এই ছোট্ট দেশের সরকার এই পেগাসাস কেবল কেনেইনি, তাই দিয়ে ফ্রান্সের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সমেত বেশ কিছু ব্যবসায়ী, ফ্রান্সের গুরুত্বপূর্ণ কিছু মানুষের ফোন ট্যাপ করা হয়েছে, ট্যাপ করা হয়েছে বেশ কিছু মার্কিন নাগরিকের ফোন, এইখানেই সমস্যা। আমাদের সরকার এবং মোদিজি মৌনিবাবা হয়ে থাকার চেষ্টা চালাচ্ছেন, কিন্তু আমেরিকা আর ফ্রান্স উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু করে দিয়েছে, ইজরায়েলের ওপর চাপ বাড়ছে, ওখানকার পত্রিকার হ্যারেটের খবর অনুযায়ী ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা দফতরের আধিকারিকরা পৌঁছে গেছেন এনএসও দফতরে, পেগাসাসের তথ্য লুকোনো যাবে না, সে সব তথ্য বের হবে, কাঠগড়ায় তোলা হবে মোদি সরকারকে, এবং মাথায় রাখুন জাস্টিস গগৈ কিন্তু অবসর নিয়েছেন ২০১৯ সালে। এখন কেবল মনোনীত রাজ্যসভার সদস্য, তার বেশি কিছু নয়।



বার্তা সূত্র

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

সর্বাধিক পঠিত

সর্বশেষ সংবাদ